তানিয়া আক্তার
সবুজ অর্থনীতি বা গ্রিন ইকোনমি বিশ্বজুড়ে মানুষের কাছে এক নতুন আলোচনার বিষয়বস্তু। সবুজ অর্থনীতি এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে উৎপাদন, ভোগ ও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিবেশের ক্ষতি না করে বরং প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করে। এই অর্থনীতিতে কার্বন নিঃসরণ কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব শিল্প, টেকসই কৃষি,বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি-এসব বিষয়গুলোই গুরুত্ব পেয়ে থাকে। এই ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সামাজিক ন্যায্যতা এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) অনুযায়ী, সবুজ অর্থনীতি এমন এক ব্যবস্থা যা মানুষের কল্যাণ ও সামাজিক সমতা বৃদ্ধি করে একই সঙ্গে পরিবেশগত ঝুঁকি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ঘাটতি কমিয়ে আনে।
একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের একটি হলো পরিবেশ রক্ষা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। শিল্পায়ন, নগরায়ন ও ভোগবাদী জীবনযাপনের ফলে পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদ দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে,জলবায়ু পরিবর্তন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। শিল্পায়ন ও নগরায়নের অন্ধ প্রতিযোগিতা উন্নয়নকে দীর্ঘদিন ধরে শুধুমাত্র জিডিপি প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে বিচার করা হয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়েছে যে এই উন্নয়ন মডেল প্রকৃতি ও মানুষের জীবনের ওপর গভীর চাপ সৃষ্টি করেছে।এই বাস্তবতায় একটু হলেও স্বস্তির বার্তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনায় এসেছে সবুজ অর্থনীতি। যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে পরিবেশ বান্ধব, টেকসই ও সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসাবে বাংলাদেশের জন্য এই ধারণা শুধু বিকল্প নয়;বরং সময়ের দাবি। প্রশ্ন হলো-বাংলাদেশ কি সত্যিই সবুজ অর্থনীতির জন্য প্রস্তুত?
বাংলাদেশে সবুজ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হতে পারে নবায়নযোগ্য জ্বালানি। বাংলাদেশে বর্তমানে বিদুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ এখনো জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর। বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ এখনো প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানি ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে কার্বন নিঃসরণ বাড়ছে, পরিবেশে চাপ পড়ছে এবং বিদেশ থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর দেশের নির্ভরশীলতা বেড়ে যাচ্ছে। ফলে সবুজ অর্থনীতির পথে উত্তরণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে।
তবে সৌরশক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে কিছু সাফল্য দেখিয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় সৌর হোম সিস্টেম বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে দিয়েছে লাখো পরিবারে।এছাড়াও সৌর সেচ,বায়োগ্যাস ও বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের মতো উদ্যোগ সবুজ অর্থনীতির পথকে সুগম করতে পারে। কিন্তু বড় পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে এখনো নীতিগত ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
বিশ্বের সকল মানুষের পরিচিত একটি বাক্য হলো বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হলো কৃষি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই খাত সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত হয়। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার মাটির উর্বরতা কমাচ্ছে,পানি দূষণ বৃদ্ধি করছে এবং মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
সবুজ অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কৃষি খাতকে টেকসই পথে রূপান্তর করা জরুরি। জৈব কৃষি,জলবায়ু সহনশীল ফসল, সাশ্রয়ী সেচ ব্যবস্থা এবং কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির একদিকে পরিবেশ রক্ষা করবে অন্যদিকে কৃষকের আয় ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এভাবে কৃষিখাত হবে পরিবেশবান্ধব, লাভজনক ও টেকসই।
দেশের অর্থনীতির চালিকার শক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হলো বাংলাদেশের পোশাকশিল্প। যা দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও ব্যাপক পরিচিত এবং বাংলাদশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি। তবে শিল্পায়নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নদী ও বায়ু দূষণ, পাশাপাশি শ্রমিকের স্বাস্থ্যঝুঁকি। এই ক্ষেত্রে সবুজ অর্থনীতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এসেছে।
শিল্পখাতে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, বর্জ্য শোধনাগার, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সবুজ কারখানা গড়ে তোলা শিল্পায়ন ও পরিবেশের মধ্যে সমন্বয় সম্ভব করে। ইতিমধ্যে কিছু কারখানা সবুজ কারখানার স্বীকৃতি পেয়েছে যেমন ব্র্যাক টেক্সটাইলস, প্যানটেক্স লিমিটেড এবং এপারেলস গ্রুপের কিছু কারখানাড;যা আশার আলো দেখায়। কিন্তু এই ধরনের উদ্যোগ এখনো সীমিত পরিসরে এবং দেশের সমগ্র শিল্পখাত কে সবুজ পথে রূপান্তর করতে আরো দৃঢ় নীতি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়নের ফলে একদিকে যেমন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ছে অন্যদিকে বাসযোগ্যতা সংকটও তৈরি হচ্ছে। যানজট, বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা এবং খোলা জায়গার অভাব এতসব অসুবিধা ও কারণ মিলিয়ে বাংলাদেশের শহর জীবন এখন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে যাচ্ছে।
সবুজ অর্থনীতির দৃষ্টিতে দেখতে গেলে এর সমাধান অবশ্যই রয়েছে। সমস্যা সমাধান হলো পরিকল্পিত নগরায়ন যা অন্তত জরুরি। পার্ক ও খোলা সবুজ স্থান সংরক্ষণ,গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন,সাইকেল বন্ধু রাস্তা, পরিবেশবান্ধব আবাসন-এসব উদ্যোগ শহরকে টেকসই ও বাসযোগ্য করে তুলতে পারে। এমন সবুজ শহর গড়ে তুলতে পারলে নগরজীবনের মান বৃদ্ধি পাবে, পরিবেশগত চাপও কমবে।
সবুজ অর্থনীতি শুধুমাত্র পরিবেশ সংরক্ষণ নয় বরং নতুন ধরনের কর্মসংস্থান ও সৃষ্টি করবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব কৃষি সবুজ নির্মাণ ও প্রযুক্তি এসব খাতে বিপুল সংখ্যক চাকরির সম্ভাবনা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন, বায়ু শক্তি প্রকল্প, জৈব কৃষি উৎপাদন বা ইকো টেকনোলজি খাতে নতুন পেশা ও উদ্যোক্তা তৈরি করা সম্ভব।
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী এই সবুজ রূপান্তরের মূল শক্তি। তবে আমাদের সকল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন যথাযথ ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ। শিক্ষাব্যবস্থার সাথে সবুজ অর্থনীতির সংযোগ,ভোক্তা প্রবণতা ও উদ্ভাবন ধর্মী পাঠ্যক্রম এবং সরকার নির্দেশিত প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে। এছাড়াও বেসরকারি খাত ও স্টার্টআপ গুলোকে উৎসাহিত করতে হবে হবে তবেই তরুণরা সবুজ উদ্যোক্তা হিসাবে সক্রিয় হতে পারবে।
সবুজ কর্মসংস্থানের বিস্তার শুধুমাত্র অর্থনৈতিক মুনাফা নয়,সামাজিক ও পরিবেশগত সুবিধাও বয়ে আনবে। এটি বেকারত্ব কমাবে, তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে এবং দেশের অর্থনীতিকে টেকসই ভাবে শক্তিশালী করবে। এক কথায়,সবুজ অর্থনীতি ও তরুণ সমাজের সংযোগই বাংলাদেশকে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে পারে।
বাংলাদেশ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে একটি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং খরার মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রাকে বারবার বিপর্যস্ত করছে। অথচ এই বাংলাদেশই আবার সবুজ অর্থনীতির জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার ক্ষেত্র। একদিকে দেশের বিপুল জনসংখ্যার, সীমিত ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়ছে। অন্যদিকে তরুণ জনগোষ্ঠী, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা বাংলাদেশকে সবুজ অর্থনীতির পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলার জন্য বেশ কিছু নীতিমালা গ্রহণ করেছে। কিন্তু তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বহু দুর্বলতা চোখে পড়ে। দুর্নীতি, বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি এবং জনসচেতনতার অভাব - এসব কারণে সবুজ অর্থনীতির বাস্তবায়ন যথাযথভাবে হচ্ছে না।
সবুজ অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন সরকারের সঙ্গে বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ। শুধু কাগজে কলমে নীতি প্রণয়ন যথেষ্ট নয়;কার্যকর বাস্তবায়ন, মনিটরিং, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং জনগণের অংশগ্রহণই মূল চাবিকাঠি। যেমন নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বা পরিবেশবান্ধব শিল্প উদ্যোগ সরকারি প্রণোদনা, নিয়মিত মনিটরিং এবং স্থানীয় জনগণের সচেতনতা নিশ্চিত করা গেলে এই বাধাগুলো দূর করা সম্ভব।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ কি সবুজ অর্থনীতির জন্য প্রস্তুত কি না? বলতে গেলে বাংলাদেশ সবুজ অর্থনীতির পথে আংশিকভাবে কিছুটা প্রস্তুত রয়েছে। আমাদের দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব শিল্প উদ্যোগ, টেকসই কৃষি প্রক্রিয়া এবং কিছু সীমিত নগরায়নের প্রকল্প ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। তবে এই উদ্যোগগুলো এখনো জাতীয়ভাবে ব্যাপক নয়। পূর্ণাঙ্গরূপে প্রস্তুত করতে হলে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে ‘পরিবেশ ও মানুষের কল্যাণ’ কে আনতে হবে। শিল্পায়ন, কৃষি ও নগরায়ন সবখাতেই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও টেকসই নীতি প্রয়োগ করতে হবে। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। উন্নয়নের মানে ভিন্ন অর্থ বহন করে।উন্নয়ন আমরা তখনই বলতে পারব যখন মানুষের জীবন মানে পরিবর্তন বা উন্নয়ন আসবে। উন্নয়ন মনে হলো টেকসই জীবন,নিরাপদ ভবিষ্যত এবং প্রকৃতিতে সঙ্গে সহাবস্থান নিশ্চিত করা।
এছাড়াও সচেতনতা ও শিক্ষা-প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সবুজ উদ্যোগ সম্পর্কে জানানো ও তাদের সম্পৃক্ত করতে হবে। সরকারি, বেসরকারি খাত,নাগরিক সমাজ,তরুণ সমাজ সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশ ধাপে ধাপে সবুজ অর্থনীতির পথে এগোতে পারবে। যত দ্রুত এই উপলব্ধি দেশে গভীরভাবে প্রোথিত হবে, ততই দেশের ‘সবুজ রূপান্তরের যাত্রা শক্তিশালী ও স্থায়ী’ হবে।
সবুজ অর্থনীতি বাংলাদেশের জন্য কোনো বিলাসিতা নয়;বরং অবশ্য প্রয়োজনীয় একটা উদ্যোগ।জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, জনসংখ্যার চাপ এবং সীমিত সম্পদের বাস্তবতায় পুরোনো উন্নয়ন মডেল এখন আর কার্যকর হচ্ছে না।
আজকের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর বাংলাদেশ। তাই সর্বশেষ প্রশ্ন শুধু এটা নয় যে “বাংলাদেশ কি প্রস্তুত?” বরং প্রশ্ন হলো “আমরা কি প্রস্তুত হতে চাই কি না?”
লেখক- শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।