মোঃ ফাহিম মৃধা

জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান আমাদের সামনে একটি নতুন, বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন উন্মোচন করেছে। একটি স্বার্থান্বেষী মহল ধর্মীয় অনুশাসন নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তি ও ভয় ছড়াচ্ছে।

বিশেষ করে ইসলামি মূল্যবোধসম্পন্ন কোনো ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে দেশে ‘হাত কাটার আইন’ চালু হবে, নারীরা ঘর থেকে বের হতে পারবে না, পর্দা না করলে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বন্ধ হয়ে যাবে, চলাফেরার স্বাধীনতা হারাবে এবং দেশে তথাকথিত ‘তালেবানি শাসন’ কায়েম হবে-এমন নানা আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে। প্রশ্ন হলো-কেন এসব ভুল ধারণা ছড়ানো হচ্ছে?

এর পেছনে কয়েকটি কারণ স্পষ্ট- ১. রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার

২. কিছু বিচ্ছিন্ন উগ্র গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ইসলামি রাজনীতিকে এক করে দেখা

৩. “ইসলাম” শব্দটি এলেই ভয় দেখানোর প্রবণতা

৪. মিডিয়ায় একপাক্ষিক ও অতিরঞ্জিত উপস্থাপন

বাস্তবতা হলো, ইসলামি বিধিবিধানের মূল লক্ষ্য ভীতি সৃষ্টি নয়; বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষা করা। পর্দার বিধান নারীর সম্মান ও সুরক্ষার প্রতীক এটি কাউকে জোরপূর্বক অবরুদ্ধ করার নির্দেশনা নয়। পর্দা কখনোই শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা সামাজিক অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।

দণ্ডবিধি নিয়েও যে ভয় দেখানো হয়, তা মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল করে দেয়। শাস্তির আতঙ্ক নয়, বরং অপরাধমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। কোনো আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেই ন্যায়বিচার, সাক্ষ্যপ্রমাণ, সামাজিক প্রেক্ষাপট ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য।

বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান নিয়েও সচেতন হওয়া জরুরি।

পর্দা না করলেই শাস্তি? তারা পর্দা পালনে উৎসাহ দেয়, তবে বর্তমান রাজনৈতিক বক্তব্যে রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের বিষয়টি গুরুত্ব পায় না।

নারীরা ঘর থেকে বের হতে পারবে না? তাদের অবস্থান অনুযায়ী নারীরা শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারবে-শর্ত হলো শালীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

চুরি করলেই প্রকাশ্যে হাত কাটা? এ ধরনের বক্তব্য বাস্তব প্রেক্ষাপট, আইনগত কাঠামো এবং ন্যায়বিচারের শর্তগুলো উপেক্ষা করে আতঙ্ক ছড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

তালেবানি শাসন কায়েম হবে? বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলো তালেবান আদর্শ অনুসরণ করে না; তারা নির্বাচনভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী।

সমাজে প্রচলিত বিভ্রান্তি ও ভয় প্রসঙ্গে ইসলামি ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য হলো নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক পরিবেশের মাধ্যমে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হবে, জোর করে নয়।

অতএব, অমূলক গুজব ও ভয়ভীতির রাজনীতিতে কান না দিয়ে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়া। রাজনৈতিক স্বার্থে যেন কেউ ধর্ম বা আইনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করতে না পারে—সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখাই আজ আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।

লেখক : শিক্ষার্থী, সরকারি বাঙলা কলেজ, ঢাকা।