জসিম উদ্দিন মনছুরি
ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখায় শাহাদাত বরণ করতে হয়েছে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিক ওসমান হাদীকে। ১৮ ডিসেম্বর রাত ৯ টা ৪০ মিনিটে সিঙ্গাপুরের জেনারেল হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এর আগে ১২ ডিসেম্বর নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে জুমার নামাজের পর আততায়ীদের অতর্কিত হামলায় গুলীবিদ্ধ হলে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অস্ত্রপচারের পর উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। দুর্বৃত্তদের ছোড়া গুলী তাঁর মাথার একদিক দিয়ে প্রবেশ করে অপর দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। ফলে ব্রেইন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ডাক্তারদের পরামর্শে সিঙ্গাপুরে নেওয়ার একদিন পর তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ দেশের জনগণ। হাদীর মৃত্যুর খবর শুনে ক্ষোভে ফেটে পড়েন সারাদেশের মানুষ। তাঁর মৃত্যুতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে ২০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেন এবং দেশবাসীকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানান। শরীফ ওসমান হাদীর পরিবারের সকল দায়িত্ব রাষ্ট্রীয়ভাবে নেওয়ার কথাও তিনি জানান।
ইনকিলাব মঞ্চসহ জুলাই যোদ্ধারা তাঁর মৃত্যুর খবর শুনে শাহবাগে জড়ো হতে থাকেন। শাহবাগ থেকে ক্ষোভের দাবানল সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্র জনতার বিক্ষোভের মুখে দৈনিক প্রথম আলো ও ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের অফিসে বিক্ষুব্ধ জনতা অগ্নিসংযোগ করে। এরপর ছাত্রজনতা শেখ মুজিবের বাসস্থান ধানমন্ডি ৩২ এর অবশিষ্টাংশেও আক্রমণ করে। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা বিক্ষুব্ধ ছাত্রজনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করেও সফল হননি। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেটসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে ক্ষোভের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে।চট্টগ্রামের খুলশিতে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনারের বাসা ঘেরাও করে বিক্ষুব্ধ জনতা। বিক্ষোভের সময় ১০ ছাত্রজনতাকে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আটক করে। এরপর সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নওফেলের বাসায় অগ্নিসংযোগ করা হয়। ভারতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য ওসমান হাদীকে হত্যা করা হয়েছে বলে ইনকিলাব মঞ্চসহ ছাত্রজনতার অভিযোগ। ইতোমধ্যে গোয়েন্দা সংস্থা অকাট্য প্রমাণ পেয়েছে যে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ ও ভারতের মদদে দুর্বৃত্তরা ওসমান হাদীকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলী করে। ঘটনার পর দুর্বৃত্তরা গোয়েন্দা ও পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে ভারতে পালিয়ে যায়। ভারতে আশ্রিত হত্যাকারীদের ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ১৪ ডিসেম্বর সর্বদলীয় প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
সমাবেশে ভারতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলনের জন্য শপথ বাক্য পাঠ করানো হয়। দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ও অনুষ্ঠানের সভাপতি ড. মাহমুদুর রহমান সমবেত জনতাকে নিয়ে শপথ বাক্য পাঠ করেন। একই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জুলাই অভ্যুত্থানের স্বপক্ষের শক্তিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। অনুষ্ঠানে এনসিপির সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ ভারত সন্ত্রাসীদের মদদ বন্ধ ও ফিরিয়ে না দিলে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য সেভেন সিস্টার্সকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার ঘোষণা দেন। এর জেরে দুই দেশের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। এর আগে হত্যাকারীদের ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করেন। ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশন ঘেরাও কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনারকে ভারতের পক্ষ থেকে তলব করা হয়। ফলে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কে টানা পোড়েন শুরু হয়। এ নিয়ে দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের মধ্যেও কথা কাটাকাটি শুরু হয়েছে। এনসিপির নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ ঢাকার এক সমাবেশে ভারতের সেভেন সিস্টার্স হিসেবে পরিচিত পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যকে ভারত থেকে আলাদা করার বিষয়ে যে হুমকি দিয়েছেন তা নিয়ে দু দেশেরই প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্যে কড়া প্রতিক্রিয়া এসেছে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার কাছ থেকে।
ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী শর্মা বলেছেন, “বাংলাদেশের নেতারা যদি ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে দেশটির উত্তরপূর্বাঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করার হুমকি দেওয়া অব্যাহত রাখেন তাহলে নয়া দিল্লি বেশিদিন চুপ থাকবে না”।ওদিকে হাসনাতের বক্তব্যের পর ঢাকায় ‘জুলাই ঐক্য’ নামের একটি ব্যানারে ভারতীয় হাইকমিশন ঘেরাওয়ের কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে দিলীøতে বাংলাদেশের হাই কমিশনারকে ডেকে পাঠায় দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অবশ্যই এর আগে গত ১৪ ডিসেম্বর ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করেছিল।
ভারতের সাবেক সেনা কর্মকর্তা কর্ণেল (অব.) অজয় কে রায়নার একটি টুইট ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনা ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। টুইটে তিনি দাবি করেন, ওসমান হাদীর পর পরবর্তী কিলিং মিশনের টার্গেট হতে যাচ্ছেন হাসনাত আব্দুল্লাহ। কর্ণেল (অব.) রায়না ভারতের একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং লেখক হিসেবে পরিচিত। বিতর্ক আরো গভীর হয়, যখন ওই পোস্টে তিনি কোথায় গুলি করা দরকার তাও উল্লেখ করে বলেন, গুলি করতে হবে ঘাড়ে, মাথায় নয়। প্রথমে তাকে নিশ্চুপ করাতে হবে। এবং ছোট্ট ছোট্ট ভুলগুলোও শুধরে নেয়া হবে। এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। স্বাধীনতার পর থেকে ভারত বন্ধুত্বের নামে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সব সময় আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। তাদের আগ্রাসনে প্রাণ হারিয়েছে অনেক নিরীহ সাধারণ মানুষ।মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের রেকর্ড অনুযায়ী ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে গত ২০১২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১০৬৪ জন বাংলাদেশী নাগরিককে হত্যা করেছে বিএসএফ। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুসারে ২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ৬ বছরে বিএসএফ গুলী ও শারীরিক নির্যাতনে হত্যা করেছে ৪২ জন বাংলাদেশীকে।
অন্য একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সীমান্তে ৩শ ১২ বার হামলা চালানো হয়। এতে ১২৪ জন বাংলাদেশী নিহত হয়। এর মধ্যে ১৯৯৬ সালে ১৩০টি হামলায় ১৩ জন নিহত হন।১৯৯৭ সালে ৩৯টি ঘটনায় ১১ জন।১৯৯৮ সালে ৫৬টি ঘটনায় ২৩ জন। ১৯৯৯ সালে ৪৩টি ঘটনায় ৩৩ জন।২০০০ সালে ৪২টি ঘটনায় ৩৯ জন নিহত হয়।জাতীয় মানবাধিকার সংগঠনের হিসাব অনুসারে ২০১২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বিএসএফ হত্যা করেছে ৩৫ জনকে। এ সময় বিএসএফ ২২ বাংলাদেশীকে গুলী ও নির্যাতন করে আহত করেছে। আর অপহরণ করেছে ৫৮ জনকে। ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে মাত্র ৭ দিনের ব্যবধানে ভারতীয়রা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ৩ বাংলাদেশীকে জোর-জবরদস্তি অপহরণ করে নিয়ে যায়।বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৩ সালে মোট ২৭ জন বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে বিএসএফ সদস্যরা। ২০১৪ সালে হত্যা করা হয়েছে ৩৩ জন বাংলাদেশিকে। আহত হয়েছেন ৬৮ জন। এছাড়া বিএসএফ ধরে নিয়ে গেছে ৫৯ জনকে। তিন বছরে সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যায় ২০১৫ সাল শীর্ষে অবস্থান করছে।২০১৫ সালে বিএসএফ হত্যা করেছে ৪৫জন বাংলাদেশিকে।
এছাড়া বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কুড়িগ্রামের অনন্তপুর-দিনহাটা সীমান্তের খিতাবেরকুঠি এলাকায় ০৭ জানুয়ারি ২০১১ সালে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ-এর সদস্যরা ফেলানী খাতুন নামের এক কিশোরীকে গুলী করে হত্যা করে। লাশ পাঁচ ঘণ্টা কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখা হয়।বাবার সঙ্গে ফেলানী নয়াদিল্লিতে গৃহকর্মীর কাজ করত। বিয়ের উদ্দেশে সে দেশে ফিরছিল। এরপর মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সীমান্তে ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর তারিখে স্বর্ণা দাস নামে অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ গুলি করে হত্যা করে। সেদিন রাতে মা সঞ্জিতা রানী দাসের সঙ্গে ভারতের ত্রিপুরায় থাকা ভাইকে দেখতে যাওয়ার সময় এই ঘটনা ঘটে। তারা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের ইরানি থানার কালেরকান্দি সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার কাছে পৌঁছালে বিএসএফ তাঁদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলী ছোড়ে। গুলীতে কিশোরী স্বর্ণা মারা যায় এবং স্বর্ণার মা সহ কয়েকজন আহত হয়।
ভারত বরাবরই নিজেদের সুবিধার জন্য বাংলাদেশকে কোণঠাসা করে রাখতে সচেষ্ট থাকে। ফারাক্কা বাঁধ তার অন্য একটি উদাহরণ।চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত থেকে ভারতের ১৮ কিলোমিটার ভেতরে গঙ্গা নদীর উপর ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করে।এই বাঁধের প্রভাবে শুকনো মৌসুমে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পানির জন্য হাহাকার তৈরি হয়।কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষার যুক্তি দেখিয়ে ভারত এই ব্যারেজ নির্মাণ করে। ফলে বাংলাদেশে এর বিরূপ প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। উল্লেখ্য যে ভারতের সাথে বাংলাদেশের আটটি বিভাগ এবং ভারতের কয়েকটি রাজ্যের সীমানা রয়েছে।বাংলাদেশ এবং ভারত একটি (৪,১৫৬.৫৬কিমি বা ২,৫৮২ মাইল) দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমানায় বেষ্টিত। এটা বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম ভূমি সীমানা।যার মধ্যে আছে আসাম ২৬২ কিমি (১৬৩ মাইল), ত্রিপুরা ৮৫৬ কিমি (২৭৫ মাইল), মিজোরাম ১৮০ কিমি (১১০ মাইল), মেঘালয় ৪৪৩ কিমি (২৭৫ মাইল) এবং পশ্চিমবঙ্গ ২,২১৭ কিমি (১,৩৭৮ মাইল)। সীমানার পাশাপাশি বাংলাদেশের বিভাগগুলোর মধ্যে আছে ময়মনসিংহ, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, সিলেট এবং চট্টগ্রাম। দুটো রাষ্ট্রের মধ্যে কতগুলো থাম বা পিলার দিয়ে মার্কা করা আছে। কিছু সীমা নির্ধারণ করার স্থানে দু-দিক থেকে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া আছে। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ৭ মে ভারত এবং বাংলাদেশ দু-দেশের অনুমোদন সাপেক্ষে ভূমি পরিসীমা চুক্তি করে সীমানার সরলীকরণ করা হয়েছিলো। ২০২১ সালের ৩ অগাস্ট ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পার্লামেন্টে এক লিখিত জবাবে জানায়, বাংলাদেশ সীমান্তে তারা ৪০৯৭ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে ৩১৪১ কিলোমিটার অংশে বেড়া বসাতে পেরেছে। পরবর্তী সাড়ে তিন বছরে কাজ অবশ্য আরও কিছুটা এগিয়েছে। ভারত বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, আগ্রাসী নীতিতে আভ্যন্তরীণ সব ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। যার ফলে ভারতের হস্তক্ষেপে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে। এরপর ভোটবিহীন নির্বাচনে একে একে ২০১৪ সালের নির্বাচন, ২০১৮ সালের নির্বাচন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখে। বলা হয়ে থাকে ভারতের মদদে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে নিজেদের সুবিধা ভাগিয়ে নেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছিল। এমনকি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে ভারত নিজেদের যুদ্ধ বলে চালিয়ে আসছে। গত ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় দিবসে নরেন্দ্র মোদী এক টুইট বার্তায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ভারতের বিজয় বলে উল্লেখ করেছেন।
ভারতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ছোটখাটো কিছু সংগ্রাম হয়েছে। বলা হয়ে থাকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সাল থেকে ৭৫ সাল পর্যন্ত ভারতের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক ছিলো।১৯৭৫ সালের পট পরিবর্তনের পর থেকে উভয় দেশের সম্পর্ক নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে যায়। বিশেষত, সীমান্ত বিরোধ, বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা এবং নদী জলবণ্টন নিয়ে দুই দেশের মধ্যেকার সম্পর্কে উত্তেজনা দেখা গেছে।এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে ভারত কর্তৃক বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রভাব খাটানো বা আধিপত্য বিস্তার করার ধারণা প্রচলিত রয়েছে। ভারতীয় আধিপত্যবাদের ধারণাটি মূলত সামরিক ও বেসামরিক উভয় শাসনামলে (১৯৭৫-১৯৯০) শক্তিশালী হয়, যখন বিভিন্ন সরকার ভারতকে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। ভারতের আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম প্রত্যক্ষভাবে বিরোধিতা করেছিলেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। তিনি ১৯৭৬ সালের ১৬ মে ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে লংমার্চের যাত্রা করেন।
মাওলানা ভাসানী সাহসিকতার সহিত বলেছিলেন “আসাম আমার, পশ্চিমবঙ্গ আমার ত্রিপুরাও আমার। এগুলো ভারতের কবল থেকে ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মানচিত্র পূর্ণতা পাবে না।” বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ভোট বিহীন নির্বাচনের সময় ভারত বরাবরই নির্বাচনকে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও গণহত্যার জন্য আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত এবং গণহত্যার বিচারে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড নিয়ে তাদের মায়াকান্নার শেষ নেই। গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা-বিচারাধীন রয়েছে। এতদিন নিশ্চুপ থাকা ভারত হঠাৎ করে গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে কুটকৌশলে অংশ নিচ্ছেন। ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে ডেকে বলা হয়, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার বিষয়। তারা বলেন,একটা মহল যে অতিরঞ্জিত বয়ান তৈরির চেষ্টা করছে, ভারত তা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করছে।ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও বলছে, বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। এর ভিত্তি গড়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সংগ্রামে, যা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ও জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে। ভারত বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অবাধ, সুষ্ঠু, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানিয়ে আসছে ভারত। এ যেন ভূতের মুখে রাম নাম।
ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা বলায় এবং বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখায় গণঅভ্যুত্থানের সাহসী যোদ্ধা শহীদ হাদীকে মৃত্যুবরণ করতে হলো। এরপর একে একে “র”য়ের কিলিং টার্গেট মিশন ঠিক করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। এখন সময় এসেছে দেশ প্রেমিক শক্তিগুলো একত্র হয়ে ভারতীয় আগ্রাসন রুখে দেওয়ার। জুলাই অভ্যুত্থানের শক্তিগুলী যদি নিজেদের মধ্যে রেষারেষি এবং দোষারোপের রাজনীতিতে মগ্ন থাকেন তাহলেই আজন্ম শত্রু ভারত নিজেদের আগ্রাসী ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপ করবে এটাই স্বাভাবিক।
যা তাদের উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে শোনা কথায় স্পষ্ট প্রমাণিত হচ্ছে। এমতাবস্থায় দেশপ্রেমিক জনগণের উচিত সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে এক কাতারে দাঁড়িয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রাখতে ইস্পাত কঠিন হয়ে ভারতের আগ্রাসন মোকাবেলা করা। যেই পথ দেখিয়ে গেছেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীসহ শরিফ ওসমান হাদীরা। আশা করি এই বিষয়টি উপলব্ধি করে দেশপ্রেমিক জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভারতের আগ্রাসন মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত থাকবে। যেরকম আগ্রাসনই হোক না কেন সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে শত্রুদের মোকাবেলা করাই হবে দেশের অখণ্ডতা রক্ষার পবিত্র সংগ্রাম। আশা করি সে সংগ্রামে দেশের ১৮ কোটি জনগণ সামিল হবে।
লেখক : গবেষক, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।