বাংলাদেশে গ্যাস দুর্ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি ক্রমেই নগর ও গ্রামীণ জীবনের জন্য এক নীরব মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে। রাজধানী থেকে জেলা শহর, এমনকি গ্রামীণ জনপদেও প্রায়ই শোনা যাচ্ছে গ্যাস লিকেজ, বিস্ফোরণ বা অগ্নিকাণ্ডের খবর। এসব ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্রাণহানি, পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি এবং মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে যাওয়া অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর শোক, তদন্ত কমিটি ও কিছু আশ্বাসের খবর পাওয়া যায়। কিন্তু কার্যকর প্রতিরোধ বা স্থায়ী সমাধান খুব কমই দেখা যায়। ফলে একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে এবং মানুষের জীবন প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এর প্রধান কারণ ত্রুটিপূর্ণ অবকাঠামো, পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাস পাইপলাইন, অবৈধ সংযোগ এবং দুর্বল তদারকি ব্যবস্থা। এ বিষয়ে নীতিমালা থাকলেও সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ প্রায়ই অনুপস্থিত। অনেক ক্ষেত্রে অসাধু ব্যক্তিরা উৎকোচের বিনিময়ে ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাস বা বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে মানুষকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে একটি অবহেলিত গ্যাসলাইন বা মানহীন সিলিন্ডার অনেক সময় ঘরের ভেতরেই সম্ভাব্য বিস্ফোরণের ঝুঁকি হয়ে থাকে।

ঢাকা ও চট্রগ্রাম দেশের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র হলেও অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং নিরাপত্তার অবহেলার কারণে এ শহরগুলো বারবার অগ্নিকাণ্ডের শিকার হচ্ছে। নিমতলী, চুড়িহাট্রা, তাজরীন ফ্যাশনস, সীতাকুণ্ড কনটেইনার ডিপো কিংবা বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজের মতো মর্মান্তিক ঘটনাগুলো আমাদের বারবার সতর্ক করে দিয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই কিছুদিন আলোচনা শেষে আমরা যেন আবারও ভুলে যাই। এসব দুর্ঘটনা কেবল প্রযুক্তিগত ত্রুটির ফল নয়; এগুলো প্রশাসনিক উদাসীনতা, অব্যবস্থাপনা এবং দায়িত্বহীনতার নির্মম উদাহরণ। দেশের নাগরিকের নিরাপত্তা কোনো দয়া বা দাক্ষিণ্য নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে প্রত্যেক নাগরিক আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারী এবং আইন ছাড়া কারও জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না। একইভাবে ৩২ অনুচ্ছেদ নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতও বিভিন্ন রায়ে উল্লেখ করেছে যে রাষ্ট্রীয় অবহেলায় নাগরিকের জীবনহানি মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। তবু বাস্তবে আমরা প্রতিনিয়ত গ্যাস লিকেজ, বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে মানুষের প্রাণহানি দেখছি- যা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে আসে।

বাংলাদেশে এলপিজি গ্যাসের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু সে অনুপাতে বাড়েনি মান নিয়ন্ত্রণ, তদারকি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বাজারে এখনও এমন অনেক সিলিন্ডার রয়েছে যেগুলোর মেয়াদ শেষ বা যেগুলো কখনো সঠিকভাবে পরীক্ষিত হয়নি। নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা এবং ব্যবসায়িক লাভের প্রতিযোগিতায় এসব ঝুঁকিপূর্ণ সিলিন্ডার মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে। বিস্ফোরণের পর আমরা দেখি ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি, হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা মানুষ এবং কয়েকদিনের সংবাদমাধ্যমের আলোচনার পর ধীরে ধীরে বিষয়টি বিস্মৃত হয়ে যায়। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায় এ মৃত্যুগুলোর দায় কার? অথচ প্রতিনিয়ত মানহীন সিলিন্ডার ঘরের ভেতর একটি লুকানো মিসাইল। এটি কোনো অতিরঞ্জিত উপমা নয়; বরং নগরজীবনের এক নির্মম বাস্তবতা। প্রতিদিন রান্নাঘরে যে সিলিন্ডার ব্যবহার করি, তা কতটুকু নিরাপদ সে বিষয়টি আমরা কেউ যাচাই করি না। বাজারের মানহীন সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ করতে না পারলে এ উন্নয়ন ও অগ্রগতি সব দাবি অর্থহীন।

নগরজীবনে গ্যাস একদিকে আশীর্বাদ, অন্যদিকে অব্যবস্থাপনায় তা হয়ে উঠছে নীরব মৃত্যফাঁদ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্যাস লিকেজ ও পাইপলাইন বিস্ফোরণে যে প্রাণহানি ঘটছে, তা নিছক দুর্ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠাকি অবহেলার সম্ভাব্য ফল। ঢাকা ও আশপাশে বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগ দেয় তিতাস গ্যাস। কিন্তু লাইন বসানোর পর সে পাইপলাইনের নিরাপত্তা বা রক্ষণাবেক্ষণে কার্যকর নজরদারি প্রায় অনুপস্থিত। ফলে বছরের পর বছর ধরে জংধরা পাইপ, ঢিলা সংযোগ আর অদৃশ্য গ্যাস লিকেজ জমে থাকে- যা একসময় ভয়াবহ বিস্ফোরণে রূপ নেয়। প্রতিটি বিস্ফোরণ যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়- অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার এ গ্যাসলাইনগুলো অনেক সময় ঘরের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে একেকটি ‘এটম বোম’। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোয় পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট। ২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ চট্রগ্রামের হালিশহরে একটি ছয়তলা আবাসিক ভবনে সেহেরির সময় গ্যাস লাইনের বিস্ফোরণে পাঁচজন নিহত হন। ফায়ার সার্ভিস জানায়, লাইনে জমে থাকা গ্যাস অথবা রাতে চুলা বন্ধ না থাকার কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এর ঠিক পরদিন ২৪ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার দাউদকান্দিতে একটি বাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডারের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে নারী ও শিশুসহ একই পরিবারের চারজন দগ্ধ হন। আর ৬ মার্চ রাজধানীর উত্তরায় কামারপাড়ায় গ্যাস পাইপলাইনের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে দুই শিশু ও এক অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ একই পরিবারের ১০ জন দগ্ধ হন। এর আগেও এমন মর্মান্তিক ঘটনার নজির রয়েছে। ২০২০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় একটি মসজিদে এশার নামায চলাকালে জমে থাকা গ্যাস বিস্ফোরণে ৩০ জন নিহত হন-যেখানে তিতাস গ্যাস লাইনের ত্রুটি ও অব্যবস্থাপনার বিষয়টি সামনে আসে। একই বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের পাঠানটুলিতে গ্যাস বিস্ফোরণে সাতজন নিহত হন। ২০২১ সালের ২৭ জুন রাজধানী মগবাজারে বিস্ফোরণে প্রাণ হারান ১০ জন।

আর ২০২৩ সালের ৭ মার্চ সিদ্দিকবাজারের একটি বহুতল ভবনে বিস্ফোরণে নিহত হন ২০ জন। ফায়ার সার্ভিসের ভাষ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে দেশে ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অন্তত ৮৫ জন নিহত এবং ২৬৭ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে গ্যাস লিকেজ থেকে ৫৬২টি এবং গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে ১২১টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আগুনের বড় অংশই লেগেছে বাসাবাড়িতে-৮ হাজার ৭০৫টি ঘটনা যা মোট অগ্নিকাণ্ডের ৩২.১৭ শতাংশ। ২০২৪ সালে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ, বিস্ফেরণ ও সরবরাহ লাইনের লিকেজ মিলিয়ে ১ হাজার ২১৩টি দুর্ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে সিলিন্ডার লিকেজ ৭০৪টি, বিস্ফোরণ ৪৪টি এবং সরবরাহ লাইনের লিকেজ থেকে অগ্নিকাণ্ড ৪৬৫টি। এর আগের বছর ২০২৩ সালে দেশজুড়ে অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা ছিল ২৭ হাজার ৬২৪টি, যাতে প্রায় ৭৯২ কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়; নিহত হন ১০২ জন এবং আহত হন ২৮১ জন। এসব পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়; এটি নগরবাসীর নিরাপত্তাহীন জীবনের প্রতিচ্ছবি।

ঢাকার মতো অতিরিক্ত জনবহুল শহরে অনেক ভবনই নিরাপত্তা বিধি উপেক্ষা করে নির্মিত । অনেক স্থাপনায় অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র থাকলেও সেগুলো ব্যবহারের প্রশিক্ষণ অধিকাংশ মানুষের নেই। রাজধানীর বহু ভবনে সিঁড়ির নিচেই বৈদ্যুতিক মিটার বসানো থাকে, আবার কোথাও জরুরি বের হওয়ার বিকল্প পথও নেই। ফলে অগ্নিকাণ্ডের সময় ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। অন্যদিকে বছরের পর বছর গ্যাসনির্ভর জীবনযাপন করলেও অনেকেরই গ্যাস চুলা ব্যবহারে মৌলিক নিরাপত্তা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই। যেমন-চুলা জ¦ালানোর আগে রান্নাঘরের জানালা খুলে দেওয়া বা এডজাস্ট ফ্যান চালু করে জমে থাকা গ্যাস বের করে দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু তাড়াহুড়োয় আমরা এসব নিয়ম প্রায়ই উপেক্ষা করি, আর সে অসতর্কতার মাশুল কখনো কখনো পুরো পরিবারকেই দিতে হয়। মানহীন সিলিন্ডার ও অবহেলিত গ্যাসলাইন শুধু প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়; এগুলো আমাদের ঘরে ঘরে লুকিয়ে থাকা নীরব বিপদ। রাষ্ট্র ও নাগরিক উভয়ের সচেতনতা ছাড়া এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়।

শেষ পর্যন্ত বিষয়টি শুধু একটি দুর্ঘটনার নয়; এটি দায়িত্ব, জবাবদিহি এবং নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। ত্রুটিপূর্ণ গ্যাসলাইন যদি সময়মতো শনাক্ত ও মেরামত না করা হয়, তবে প্রতিটি বসতবাড়ি ও জনপদ সম্ভাব্য বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত নিয়মিত পরিদর্শন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং কঠোর জবাবদিহির মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাকে নিরাপদ করা। অন্যথায় প্রতিটি দুর্ঘটনা শুধু পরিসংখ্যানই বাড়াবে না, বরং রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব-নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষার অঙ্গীকারকেও প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক