॥ মো. মোবারক হোসাইন ॥

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হলো ব্যাংকিং খাত। একটি দেশের মানুষ যে সঞ্চয় করে, সেই সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তর করে শিল্প, কৃষি, বাণিজ্য ও অবকাঠামো খাতে পৌঁছে দেওয়ার প্রধান মাধ্যম হচ্ছে ব্যাংক। অর্থনীতির ভাষায় ব্যাংককে বলা হয় আর্থিক মধ্যস্থতাকারী (Financial Intermediary), কিন্তু বাস্তবে এর ভূমিকা আরও বিস্তৃত। একটি শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছাড়া কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি কিংবা উদ্যোক্তা তৈরির মতো মৌলিক অর্থনৈতিক কর্মকা- টেকসইভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই বিশ্বের প্রতিটি উন্নয়নশীল দেশ ব্যাংকিং খাতকে অর্থনীতির মেরুদ- হিসেবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। স্বাধীনতার পর দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের প্রবৃদ্ধির যাত্রায় ব্যাংকিং খাত একটি নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু যখন এই খাত রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল সুশাসন, ঋণ অনিয়ম ও করপোরেট দখলের শিকার হয়, তখন তার অভিঘাত গোটা অর্থনীতিকে বহন করতে হয়।

এই বাস্তবতায় ১৯৮৩ সালে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের ব্যাংকিং খাতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। সুদমুক্ত ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিয়ে শুরু হওয়া এই প্রতিষ্ঠানটি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই জনগণের আস্থা অর্জন করে। ধর্মীয় অনুপ্রেরণার পাশাপাশি স্বচ্ছ সেবা, দ্রুত কার্যক্রম, আমানতের নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগ ব্যবস্থার কারণে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী সমাজ পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে এটি শুধু একটি ব্যাংক নয়, বরং বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে একটি সফল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশের অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকও পরবর্তীতে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং উইন্ডো চালু করতে বাধ্য হয়, যা ইসলামী ব্যাংকের বাজার গ্রহণযোগ্যতারই প্রতিফলন।

জাতীয় সঞ্চয় বৃদ্ধি এবং মূলধন গঠনের ক্ষেত্রেও ইসলামী ব্যাংকের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশের উন্নয়নের জন্য বিদেশি ঋণের চেয়ে অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় অনেক বেশি কার্যকর। ইসলামী ব্যাংক কোটি কোটি গ্রাহকের ক্ষুদ্র ও বৃহৎ আমানত সংগ্রহ করে সেই অর্থ উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ করেছে।

বর্তমানে ব্যাংকটির সম্পদের পরিমাণ পাঁচ লাখ কোটি টাকার বেশি, আমানত চার লাখ কোটি টাকার বেশি এবং বিনিয়োগও চার লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি। এই বিপুল অর্থ যদি শিল্প, কৃষি, ব্যবসা ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহৃত না হতো, তাহলে দেশের অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাবও তৈরি হতো না।

শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও ইসলামী ব্যাংকের ভূমিকা সুস্পষ্ট। গার্মেন্টস, ওষুধ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ইস্পাত, সিমেন্টসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী শিল্পে দীর্ঘদিন ধরে অর্থায়নের মাধ্যমে হাজার হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা কিংবা সম্প্রসারণে ব্যাংকটি সহায়তা করেছে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) খাতে শরিয়াহসম্মত অর্থায়ন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) উন্নয়নেও ইসলামী ব্যাংকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ঋণ পাওয়া সবসময় সহজ ছিল না। ইসলামী ব্যাংক শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের মাধ্যমে হাজার হাজার নতুন উদ্যোক্তার পাশে দাঁড়িয়েছে। নারী উদ্যোক্তা, তরুণ ব্যবসায়ী এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনাকারীদের জন্য বিশেষ বিনিয়োগ কর্মসূচি গ্রহণ করে তারা আত্মকর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এসব ক্ষুদ্র উদ্যোগ পরবর্তীতে বড় শিল্পে রূপ নিয়েছে এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে।

গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে ইসলামী ব্যাংকের Rural Development Scheme (RDS) বাংলাদেশের অন্যতম সফল ক্ষুদ্র অর্থায়ন কর্মসূচি হিসেবে স্বীকৃত। গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র কৃষক এবং প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে অর্থায়নের মাধ্যমে এই কর্মসূচি আত্মনির্ভরশীলতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। শহরকেন্দ্রিক ব্যাংকিং সেবাকে গ্রামে পৌঁছে দিয়ে ব্যাংকটি আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুদ্র ব্যবসা সৃষ্টি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতা বৃদ্ধিতে এই উদ্যোগের প্রভাব এখনো গবেষণার বিষয়।

বৈদেশিক রেমিট্যান্স আহরণেও ইসলামী ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ধরে রেখেছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা এই ব্যাংকের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠিয়েছেন। এই রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করেছে, আমদানি ব্যয় নির্বাহে সহায়তা করেছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি করেছে। প্রবাসীদের আস্থার একটি বড় অংশও দীর্ঘদিন ইসলামী ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

কিন্তু এতসব অবদানের পরও ২০১৫ সালে আবুল বারকাত “বাংলাদেশে মৌলবাদ ও মৌলবাদী জঙ্গিত্বের রাজনৈতিক অর্থনীতি” শীর্ষক একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, যা ১ জুন ২০১৫ সালে Bangladesh Journal of Political Economy-এ প্রকাশিত হয়। ওই গবেষণায় তিনি যুক্তি দেন যে বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির একটি সংগঠিত অর্থনৈতিক ভিত্তি রয়েছে এবং সেখানে তিনি ইসলামী ব্যাংক, বীমা, এনজিও, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে তাঁর ভাষায় “মৌলবাদের অর্থনৈতিক কাঠামো”র অংশ হিসেবে আলোচনা করেন।

আবুল বারকাতের নাম জনতা ব্যাংকের একটি বহুল আলোচিত ঋণ অনিয়মের মামলায় উঠে আসে, যা বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে অন্যতম আলোচিত বিতর্ক হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযোগ অনুযায়ী, তার দায়িত্বকালীন সময়ে অ্যাননটেক্স গ্রুপকে প্রায় ২৯৭ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে ব্যাংকের প্রচলিত নীতিমালা ও যথাযথ যাচাই-বাছাই অনুসরণ করা হয়নি। দুদকের দাবি, ঋণ অনুমোদনের সময় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, জামানতের যথার্থতা এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করায় পরবর্তীতে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে। এই ঘটনায় ২০২৫ সালে দুদক আবুল বারকাতসহ মোট ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে ।

এছাড়া ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে এক অনুষ্ঠানে তিনি মন্তব্য করেন যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে “অবৈধভাবে ব্যবসা করছে” এবং এটি “মৌলবাদী ব্যাংকিং”-এর সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির একটি অর্থনৈতিক অবকাঠামো রয়েছে এবং ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সেই কাঠামোর অংশ। তাঁর এই বক্তব্য দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। এসব মন্তব্য ইসলামী ব্যাংকের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে এবং শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরিতে ভূমিকা রাখে। ফলে বিষয়টি একাডেমিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে ওঠে।

তবে প্রশ্ন হলো, একটি ব্যাংক সম্পর্কে রাজনৈতিক বা আদর্শিক বিতর্ক চলার মধ্যেই কীভাবে সেই ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ অন্য একটি ব্যবসায়িকগোষ্ঠীর হাতে চলে গেল? এখানেই সামনে আসে এস আলম গ্রুপের নাম। বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদন, বিশেষ করে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) অনুসন্ধানে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রক্সি শেয়ারহোল্ডার ও কাগুজে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয় এবং সেই অধিগ্রহণে ব্যবহৃত অর্থের একটি বড় অংশ এসেছে ব্যাংকটির নিজস্ব ঋণ থেকে। অর্থাৎ অভিযোগ অনুযায়ী, একটি ব্যাংকের অর্থ ব্যবহার করেই সেই ব্যাংকের মালিকানা অর্জনের পথ তৈরি করা হয়েছিল। যদি এসব অভিযোগ আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়, তবে তা হবে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসের অন্যতম বড় করপোরেট কেলেঙ্কারি।

অভিযোগ আরও রয়েছে, ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের পর এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করে এবং পরবর্তীতে এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই বড় ঋণখেলাপিতে পরিণত হয়। বিএফআইইউর অনুসন্ধানে প্রক্সি শেয়ারহোল্ডার, শেল কোম্পানি, অর্থ স্থানান্তর এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে নানা তথ্য উঠে এসেছে। বিষয়গুলো বর্তমানে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় রয়েছে। এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।

সবশেষে প্রশ্ন থেকে যায়Ñ যে প্রতিষ্ঠান চার দশক ধরে বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, রেমিট্যান্স, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে, সেই প্রতিষ্ঠান কীভাবে বিতর্ক, করপোরেট দখল এবং আর্থিক অনিয়মের প্রতীকে পরিণত হলো? এর উত্তর শুধু একজন ব্যক্তি, একটি ব্যবসায়িকগোষ্ঠী বা একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং সুশাসন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা এবং রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি বড় প্রশ্ন। ইতিহাসের প্রতি ন্যায়বিচার করতে হলে যেমন ইসলামী ব্যাংকের অবদান স্বীকার করতে হবে, তেমনি যেকোনো অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও আর্থিক দুর্নীতিরও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে ওঠে আস্থা, সুশাসন ও আইনের শাসনের ওপর- কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাবের ওপর নয়।