ভারত আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মিত্রশক্তি। তাই দেশটির সাথে সদ্য স্বাধীন দেশটির সম্পর্ক অকৃত্রিম বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা থাকলেও এক্ষেত্রে উভয় দেশের জনগণ বারবার হতাশই হয়েছে। ভৌগলিক সীমা, সামরিক শক্তি ও বিপুল জনসংখ্যায় এগিয়ে থাকার অহমিকায় ভারত আমাদের সাথে সৎপ্রতিবেশীসুলভ আচরণ করেনি বরং সবসময়ই প্রভূত্ব তথা দাদাগিরি করে এসেছে। একটি মহল নিজেদের অবৈধ ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত ও নির্বিঘ্ন করার জন্য সব সময় দেশটির পদলেহন করে এসেছে। ফলে আমাদের স্বাধীনতার সুফলগুলো আজও অনেক ক্ষেত্রেই অধরাই রয়ে গেছে।
বস্তুত, আমাদের বৃহত প্রতিবেশী ভারত সব সময় এদেশে একটি আজ্ঞাবাহী শক্তিকে ক্ষমতার রাখার চেষ্টা করে এসেছে। ক্ষেত্র বিশেষে তারা বেশ সফলও হয়েছে। আসলে আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ে ভারতের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কিতই শুধু নয় বরং গর্হিতও বটে। বিশেষ করে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের পাতানো ও ভাঁওতাবাজীর নির্বাচন ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রশ্ন উঠলেও ভারতের পক্ষ থেকে এসব অতিবিতর্কিত নির্বাচনগুলোকে শর্তহীনভাবে সমর্থন দেয়া হয়েছে। এমতাবস্থায় আমাদের দেশের জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে ধারণা তৈরি করেছে যে, ভারত গণতান্ত্রিক মানদণ্ড নয় বরং নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। স্বল্পমেয়াদে এটি সুবিধাজনক হলেও দীর্ঘমেয়াদে এ নীতি উভয় দেশের সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক নয়। কারণ, গণতন্ত্র দুর্বল হলে রাষ্ট্র দুর্বল হয়, আর দুর্বল রাষ্ট্র কখনোই টেকসই অংশীদার হতে পারে না। আর এটিই বাস্তবতা।
বস্তুত, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক। ভৌগোলিক বাস্তবতা, ইতিহাসের উত্তরাধিকার এবং অর্থনৈতিক-নিরাপত্তাগত পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এ সম্পর্ককে ভিন্নতর মাত্রা দিয়েছে। কিন্তু একথা ঠিক যে, অনিবার্যতা আর ন্যায্যতা এক বিষয় নয়। গত এক দশকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এ সম্পর্ক যতটা ‘উষ্ণ’ বলা হয়েছে, জনগণের দৃষ্টিতে ততটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এর ভারসাম্য ও স্বচ্ছতা।
এ সম্পর্ক কি সত্যিই সমান দু’রাষ্ট্রের অংশীদারত্ব, নাকি শক্তিশালী প্রতিবেশীর সাথে দুর্বল রাষ্ট্রের আপসনির্ভর সহাবস্থান-এ প্রশ্ন এখন আত্মসচেতন মানুষের মধ্যে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। বিশেষ করে দ্বিপাক্ষিক পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য ঘাটতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ে ভারতের অবস্থান-এসব ইস্যু জনমনে আস্থার সঙ্কট তৈরি করেছে। যতই দিন যাচ্ছে ততই এটা তীব্র হতে তীব্রতর হচ্ছে। যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের আস্থাহীনতার সৃষ্টি করছে।
এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে নতুন করে মূল্যায়ন করা এখন আর কূটনৈতিক বিলাসিতা নয়, বরং এক অনিবার্য বাস্তবতা হয়ে দেখা দিয়েছে। মূলত, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে প্রায়ই ‘দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে সফল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু কূটনীতিতে সফলতা মাপা হয় শুধু রাষ্ট্রীয় ঘোষণায় নয়-মাপা হয় জনগণের আস্থা, স্বার্থের সমতা ও বাস্তব ফলাফলে। পরিসংখ্যান ও ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ সম্পর্কের ভিত যতটা মজবুত বলে দাবি করা হয়, বাস্তবে ততটা ভারসাম্যপূর্ণ নয়।
বাংলাদেশ ভারতের নিকটে ও ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী। প্রায় চার হাজার ১শ’ কিলোমিটার স্থলসীমান্ত, ৫৪টি অভিন্ন নদী এবং বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য-এ সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক নয়, কাঠামোগতভাবে জড়িত। কিন্তু এ ঘনিষ্ঠতার ভেতরেই জমে উঠছে তীব্র আস্থার সঙ্কট। যা উভয় দেশকে ভিন্নতর মেরুতে নিয়ে গেছে। ফলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে।
জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। নানা ইস্যুতে উভয় দেশের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। একথা অস্বীকার করা যাবে না যে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিরাপত্তা, বাণিজ্য, পানি ও সংযোগ এ চারটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। সকল ক্ষেত্রেই সহযোগিতার পাশাপাশি রয়েছে গভীর বৈষম্য ও অসমতাও। নিরাপত্তা সহযোগিতায় বাংলাদেশ ভারতের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার। উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর বিষয়ে বাংলাদেশের সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় এবং আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদ দমনে তথ্য আদান-প্রদান-সব মিলিয়ে এ খাতে বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু এর বিপরীতে সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিক হত্যার ঘটনা থামেনি বরং প্রতিনিয়তই সার্বিক পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ‘শূন্য হত্যা’ নীতির কথা বলা হলেও বাস্তবতার সাথে এর কোন সঙ্গতি নেই বললেই চলে বরং অবলিলায় সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা করা হচ্ছে। এমন বৈপরীত্য নিরাপত্তা সহযোগিতার নৈতিক ভিত্তিকেই করেছে প্রশ্নবিদ্ধ।
একথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, ভারত বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। তবে তা মোটেই ভারসাম্যপূর্ণ নয়। ভারতের সাথে আমাদের বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। শুল্ক ও অশুল্ক বাধা, কাস্টমস জটিলতা এবং অ্যান্টি-ডাম্পিং অভিযোগের কারণে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশ ভারতীয় বাজারে সীমিত। অন্যদিকে বাংলাদেশ একতরফাভাবে ভারতের জন্য ট্রানজিট সুবিধা দিয়েছে, যা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতির জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অথচ এর বিনিময়ে বাংলাদেশ কী পেয়েছে-এ প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নেই। যা সুসম্পর্কের জন্য মোটেই ইতিবাচক নয়।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও সংবেদনশীল সঙ্কট পানি বণ্টন। তিস্তা চুক্তি ঝুলে রয়েছে দীর্ঘকাল ধরে। অভিন্ন নদীগুলোর উজানে একতরফা প্রকল্প বাংলাদেশের কৃষি, পরিবেশ ও জীবিকায় সরাসরি বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মূলত, পানি কেবল একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এটি জীবন ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। কিন্তু এ ইস্যুতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল ও নতজানু। আবেগ দিয়ে সম্পর্ক রক্ষা করতে গিয়ে পানির মতো মৌলিক স্বার্থে ছাড় দেয়ার প্রবণতা রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রশ্ন তোলে।
আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে ভারতের ভূমিকা বরাবরই বিতর্কিত। বিশেষ করে বিতর্কিত নির্বাচন ও ক্ষমতার ধারাবাহিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে ভারতের নীরবতা বা অবস্থান বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। কূটনীতিতে বাস্তববাদ গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ উপেক্ষা করে কথিত ‘স্থিতিশীলতা’ রক্ষার নীতি দীর্ঘমেয়াদে উভয় দেশের জন্যই ক্ষতিকর। কারণ এতে জনগণের আস্থা হ্রাস পায়। মূলত, আস্থা ছাড়া কোনো সম্পর্কই টেকসই হয় না। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো-ভারতনীতির পুনর্মূল্যায়ন। এটি ভারতবিরোধিতা নয়, বরং আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রীয় কূটনীতি। যা আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতিস্বত্তার অস্তিত্ব সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের প্রয়োজন-দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, পানি, সীমান্ত ও বাণিজ্যে স্পষ্ট ‘রেড লাইন’ নির্ধারণ, সংসদীয় ও জন-আলোচনার মাধ্যমে কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ব্যক্তি বা সরকারকেন্দ্রিক নয়, রাষ্ট্রকেন্দ্রিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। বাংলাদেশ যদি নিজেই তার স্বার্থ স্পষ্ট না করে, অন্য রাষ্ট্র তা রক্ষা করবে-এমন আশা কূটনীতিতে বাস্তবসম্মত নয়। ভারতের সাথে ভারসাম্য রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো। বাংলাদেশকে বিমসটেক, আসিয়ান সংযোগ, চীন-জাপান-ইইউর সাথে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব এবং জলবায়ু ও নদী ইস্যুতে আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোকে আরো সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করতে হবে। এটি কোনো পক্ষ ত্যাগের কৌশল নয় বরং বহুমুখী সম্পর্কের মাধ্যমে নিজের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়ানো।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে জন-আস্থার ওপর। এ আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রয়োজন-গোপন কূটনীতি থেকে বেরিয়ে আসা, তথ্য প্রকাশ ও জবাবদিহি, সীমান্ত ও পানি ব্যবস্থাপনায় যৌথ কিন্তু সমতাভিত্তিক কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কূটনৈতিক রোডম্যাপ। স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভ নয় বরং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় স্বার্থই হতে হবে সিদ্ধান্তের মানদণ্ড। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ ও সম্মানজনক করার জন্য এর কোন বিকল্প নেই।
একথা ঠিক যে, নিরাপত্তা খাতে বাংলাদেশ ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। ২০০৯ সালের পর থেকে বাংলাদেশ উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর বিষয়ে নীতিগতভাবে ‘শূন্য সহনশীলতা’ গ্রহণ করে। দেশটির দাবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে, একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর ঘাঁটি বন্ধ করা হয় এবং অনেক নেতাকে গ্রেফতার বা হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু এ সহযোগিতার বিপরীতে সীমান্তে মানবাধিকার পরিস্থিতি ভয়াবহ রয়ে গেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিএসএফের গুলীতে নিহত হয়েছেন এক হাজারের বেশি বাংলাদেশী নাগরিক। শুধু ২০১৯-২০২৩ এ পাঁচ বছরেই নিহতের সংখ্যা শতাধিক। ২০২৩ সালে ভারত ‘শূন্য হত্যা নীতির’ কথা পুনর্ব্যক্ত করলেও ২০২৪ সালেও সীমান্তে নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। যা কোন বন্ধু রাষ্ট্রের জন্য শোভনীয় নয়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ি, বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যের আকার গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল আনুমানিক ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু এর মধ্যে বাংলাদেশের রফতানি ছিল মাত্র ২ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি, বিপরীতে আমদানি প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার। বার্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি ১০-১১ বিলিয়ন ডলার-যা বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগজনক। ভারতের পক্ষ থেকে ‘ডিউটি ফ্রি এক্সেস’ দেয়া হলেও বাস্তবে শুল্কবহির্ভূত বাধা, মাননিয়ন্ত্রণ জটিলতা এবং কাস্টমস বিলম্ব বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশ সীমিত করে রেখেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ভারতকে ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা দিয়েছে, যা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য অর্থনৈতিক লাইফলাইন। কিন্তু ট্রানজিট ফি, অবকাঠামোগত ক্ষতিপূরণ বা সমপর্যায়ের বাজার সুবিধা- এসব বিষয়ে বাংলাদেশ কী পাচ্ছে, তার সুস্পষ্ট হিসাব জনসমক্ষে নেই। যা আত্মসচেতন মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী অমীমাংসিত ইস্যু তিস্তা নদী। ২০১১ সালে চুক্তির খসড়া তৈরি হলেও আজ পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি। শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের অংশে তিস্তার পানি নেমে আসে ১০-১৫ শতাংশের নিচে, যেখানে কৃষি ও জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রায় ২০ লাখ মানুষ সরাসরি তিস্তার পানির ওপর নির্ভরশীল। অথচ এ ইস্যুতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক চাপ কার্যত অকার্যকর। তিস্তা শুধু পানি নয়-এটি সার্বভৌমত্ব ও ন্যায্যতার প্রতীক। এর পাশাপাশি ফেনী, গঙ্গা ও অন্যান্য অভিন্ন নদীতে উজানে একতরফা প্রকল্প বাংলাদেশের পরিবেশ ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে। এসব ক্ষেত্রেই একটি সাধারণ সমস্যা স্পষ্ট-বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট ‘রেড লাইন’ নির্ধারণের অভাব। অধিকাংশ চুক্তি ও সমঝোতা সংসদীয় আলোচনার বাইরে সম্পন্ন হয়েছে। জনগণ জানে না কোন ছাড়ের বিনিময়ে কী পাওয়া গেছে। একটি আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের কূটনীতিতে এটি বড় দুর্বলতা।
ভারতের সাথে ভারসাম্য রক্ষার জন্য বাংলাদেশকে কূটনৈতিক বিকল্প বাড়ানো দরকার। চীন বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার, জাপান সবচেয়ে বড় দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী, আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রধান রফতানি গন্তব্য। বিমসটেক, আসিয়ান সংযোগ এবং জলবায়ু কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা বাংলাদেশের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে পারে। এটি কোনো পক্ষ ত্যাগ নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের কৌশল। মূলত, বাংলাদেশ-ভারতে সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সঙ্কট পরিসংখ্যান নয়, আস্থা। এ আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রয়োজন-চুক্তির পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ, সংসদীয় অনুমোদন, সীমান্ত হত্যায় জবাবদিহি, পানি ও বাণিজ্যে সময়সীমাবদ্ধ রোডম্যাপ। স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সুবিধা নয়, দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় স্বার্থ হতে হবে সিদ্ধান্তের ভিত্তি।
উভয় দেশের সম্পর্কের ভারসাম্যহীনতার সবচেয়ে আলোচিত ও প্রতীকী উদাহরণ হয়ে উঠেছে আদানি গ্রুপের সাথে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তি। ২০১৭ সালে ভারতের ঝাড়খন্ডে অবস্থিত আদানি পাওয়ারের গড্ডা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ কেনার জন্য যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তা আজও স্বচ্ছতা ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে বিতর্কের কেন্দ্রে। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২৫ বছরের জন্য প্রায় ১,৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানিতে বাধ্য- এমনকি বিদ্যুৎ না নিলেও ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ দিতে হবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, এ বিদ্যুতের ইউনিট মূল্য বাংলাদেশে উৎপাদিত বা বিকল্প উৎস থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুতের তুলনায় ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি মূলত বাংলাদেশের জন্যই নির্মিত হলেও- কয়লা আমদানি হবে বিদেশ থেকে, বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে ভারতে, পরিবেশগত ঝুঁকি বহন করবে বাংলাদেশ, আর আর্থিক লাভের বড় অংশ যাবে একটি নির্দিষ্ট ভারতীয় করপোরেট গোষ্ঠীর কাছে। এ চুক্তিতে আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। সংসদীয় আলোচনার বাইরেই এটি চূড়ান্ত হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০২২-২৩ সালে বৈশ্বিক কয়লার দাম বাড়ার পর এ চুক্তির চাপ আরো স্পষ্ট হয়। বাংলাদেশ যখন ডলার সঙ্কটে পড়ে বিদ্যুৎ আমদানির অর্থ পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছিল, তখন আদানি পাওয়ার কয়েক দফা বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দেয় বা বন্ধ রাখে-যা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার দুর্বলতাকে প্রকাশ্যে এনে দেয়। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারকে পরিশোধযোগ্য বিল পুনঃতফসিল করতে হয়। অথচ এ চুক্তি পুনর্বিবেচনা বা পুনরায় দরকষাকষির বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো কূটনৈতিক দৃঢ়তা দেখা যায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, আদানি চুক্তি তিনটি গুরুতর বার্তা দেয়-দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে করপোরেট স্বার্থের প্রাধান্য, জাতীয় জ্বালানি নীতির ওপর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব এবং অসম ক্ষমতার সম্পর্কের কারণে বাংলাদেশের দরকষাকষির সীমাবদ্ধতা।
মূলত, এটি কেবল একটি বিদ্যুৎ চুক্তি নয়; বরং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কাঠামোগত অসমতার একটি কেস স্টাডি। যেখানে বন্ধুত্বের ভাষ্য ব্যবহার করে একটি দেশ তার করপোরেট গোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিশ্চয়তা আদায় করতে পেরেছে, কিন্তু অপর দেশকে বহন করতে হচ্ছে উচ্চমূল্য, ঝুঁকি ও দায়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো-বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখনো স্পষ্টভাবে বলা হয়নি, এ চুক্তিতে জাতীয় স্বার্থ কিভাবে সুরক্ষিত হয়েছে, বিকল্প উৎস বিবেচনা করা হয়েছিল কি না এবং ভবিষ্যতে এমন একতরফা চুক্তি এড়াতে কী নীতিগত সংস্কার হবে। যতদিন এ প্রশ্নগুলোর উত্তর না আসবে, ততদিন আদানি ইস্যু ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে আস্থাহীনতার প্রতীক হিসেবেই রয়ে যাবে। যা কোন ভাবেই কাম্য নয়।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এক অনিবার্য বাস্তবতা। কিন্তু তা হতে হবে সম্মান ও সমমর্যাদার। পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, উভয় দেশের সম্পর্ক ভারসাম্যহীন। এখন সময় এসেছে আবেগ থেকে বেরিয়ে এসে তথ্য, স্বার্থ ও জনগণের প্রত্যাশার ভিত্তিতে কূটনীতি পরিচালনার। সমতা, স্বচ্ছতা ও পারস্পরিকতা নিশ্চিত করা গেলে এ সম্পর্ক সত্যিকারের বন্ধুত্বে রূপ নিতে পারে। অন্যথায় এটি থাকবে একতরফা নির্ভরতার একটি অস্বস্তিকর উদাহরণ হয়ে।
উভয় দেশের সম্পর্ক পুনর্মূল্যান ও পুনর্গঠন জরুরি। কারণ, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। ভারতকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করতে হবে। এক্ষেত্রে দাদাগিরির নেতিবাচক মনোভাব পরিতাজ্য। একথা ঠিক যে, উভয় দেশের মধ্যে সম্পর্ক পুনর্গঠন হতে হবে সমতা, স্বচ্ছতা ও পারস্পরিকতার ভিত্তিতে। বন্ধুত্বের ইতিহাস অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালিত হয় বাস্তব স্বার্থ দিয়ে। বাংলাদেশের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ- আবেগনির্ভর নীরবতা থেকে বেরিয়ে এসে আত্মমর্যাদাশীল কূটনীতির পথে হাঁটার। কারণ, জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে সে পথ অনেকটাই অবারিত হয়েছে।
মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারত আমাদের মিত্রশক্তি হলেও দেশটি আমাদের স্বাধীন স্বত্ত্বাকে কোনভাবেই সম্মান করেনি বরং বরাবরই সম্প্রসারণ ও কর্তৃত্ববাদী আচরণ করেছে। পরিকল্পিতভাবে এদেশে সৃষ্টি করেছে একটি আজ্ঞাবাহী ও সেবাদাস শ্রেণি। এদেরকে নানাভাবে সহযোগিতা করে অবৈধভাবে দীর্ঘ সময় তাদের ক্ষমতায় রেখে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেছে। কিন্তু ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবের মাধ্যমে সে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় স্বার্থে বেশ সচেতন। তারা অতীত বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার সাধ্যমত চেষ্টা করছে। আমরা আশা করি, পরবর্তী নির্বাচিত সরকারও সে ধারাবাহিকতা রক্ষা করবে। | www.syedmasud.com