শত শত শহীদের রক্তস্নাত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ২০২৬ সেশনের জন্য সভাপতি ও সেক্রেটারি জেনারেলের নির্বাচন ও মনোনয়ন সম্পন্ন হয়েছে। নেতৃত্ব নির্বাচনের এ প্রক্রিয়াটি ছাত্রশিবিরের একটি অনবদ্য বৈশিষ্ট্য। প্রতি বছরের শেষ দিকে সংগঠটির সর্বোচ্চ পদে থাকা সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে পরবর্তী নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়। এখানে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো বিগত সাড়ে ১৫ বছরের আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমলে যখন ছাত্রশিবির এ ধরনের প্রকাশ্যে সদস্য সম্মেলনের আয়োজন করতে পারেনি; সেরকম প্রতিকূল সময়েও তারা অনলাইনের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করেছে। কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূলের প্রতিটি শাখায় প্রতিবছর নিজেদের সেটআপ সম্পন্ন করেছে- যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। কোনো ছাত্র সংগঠন বা দলকে সমালোচনা না করে একদম বস্তুনিষ্ঠভাবেও যদি পর্যবেক্ষণ করি তাহলেও বলতে হবে যে, বাংলাদেশের অন্য কোনো ছাত্র সংগঠনে এত নিয়মিত নেতৃত্বে নির্বাচন হয় না। ছাত্রশিবিরের নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে আরেকটি বিবেচ্য বিষয় হলো এখানে অনিয়মিত কোনো ছাত্রকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে রাখা হয় না। নীতিগত এ বৈশিষ্ট্যগুলো বিবেচনায় রেখেই প্রতিটি সদস্য যার যার অবস্থান থেকে এ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেন।

আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জেনারেলের নির্বাচন নিয়ে কখনোই কোনো গ্রুপিং অন্তর্কলহ বা বিশৃংখলার খবর পাওয়া যায় না। এবারের সদস্য সম্মেলনে একজন অতিথি হিসেবে আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনের প্রবেশ মুখ থেকে শুরু করে প্রতিটি স্তরে আমার শিবিরের সদস্য ও ভলান্টিয়ারদের শৃঙ্খলা, বিনয় এবং মেহমানদের সম্মানের সাথে বরণ করে নেয়ার মানসিকতা আমার চোখে পড়েছে। অনুষ্ঠানটিতে কয়েকবার মেহমানদের এবং আগত সকল সদস্যদের কয়েক দফায় আপ্যায়ন করা হয়েছে। প্রতিটি মেহমানকে উপহার সামগ্রী প্রদান করা হয়েছে। ডেলিগেট সদস্যদেরও আলাদা উপকরণসমূহ দেয়া হয়েছে। উপস্থিত সবার জন্য সকালের নাস্তা এবং দুপুরের খাবার পরিবেশন করা হয়েছে। এ খাবার বন্টন নিয়েও কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা আমার চোখে পড়েনি। সেদিন জুমআবার থাকায় মিলনায়তনের বাইরেও জুমআর নামাজের আয়োজন করা হয়েছিল। নামাজের আগে যথারীতি খুতবা হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ অজু করে নামাজে অংশ নিয়েছে। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা চিৎকার বা তর্ক-বিতর্ক আমার নজরে আসেনি।

বিভিন্ন দলের কর্মী সম্মেলনে বা কাউন্সিলে যেভাবে চেয়ার ভাঙার ঘটনা ঘটে, যেভাবে গ্রুপিং হয়, মারামারি হয় অথবা স্টেজে ওঠা নিয়ে তর্ক বিতর্ক হয় কিংবা যেভাবে একপক্ষ অপরপক্ষের লোকদের অসম্মানিত করে তেমন কোন দৃশ্য ছাত্রশিবিরের সম্মেলনে দেখা যায়নি। ৬০০০ এর বেশি সদস্য এ শীতের মাঝে ভোর বেলায় সমবেত হয়ে নেতৃত্ব নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ এ আয়োজনে দায়িত্বশীল ভূমিকা করতে সক্ষম হয়েছেন। এটি সত্যিই প্রশংসনীয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে শিবিরের মতো গঠনমূলক ও সুশৃঙ্খল আচরণ অন্য কোথাও সেভাবে দেখা যায় না। আমার মনে হলো, ছাত্রশিবিরের এ অনবদ্য বৈশিষ্ট্যগুলোর স্বীকৃতি দেয়া দরকার। যারা নিয়মিতভাবে এ ধরনের আয়োজনে যায়, তাদের কাছে এ বিষয়গুলো স্বাভাবিকবোধ হওয়ায় হয়তো আলাদা করে তারা লেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে, এ বিষয়গুলো নিয়ে লেখা প্রয়োজন। এটি শুধু ছাত্রশিবিরের প্রশংসা করার জন্যই নয়, বরং যে বাংলাদেশের আমরা স্বপ্ন দেখি, যে ধরনের ছাত্র রাজনীতি আমরা কল্পনা করি- সে বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্যই ছাত্রশিবিরের এ দৃষ্টান্তগুলো নিয়ে বড়ো পরিসরে আলোচনা করা দরকার।

ছাত্রশিবিরের সদস্য সম্মেলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল ভিন্ন দল ও মতের লোকদের উদ্বোধনী সেশনে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এ সেশনে সাংবাদিকরাও থাকতে পারেন। অতিথি বিভিন্ন দলের নেতৃবৃন্দ তাদের শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন। সাথে থাকেন বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ভাতৃপ্রতীম ছাত্র্র সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দ। এবারের সদস্য সম্মেলনে ফিলিস্তিন, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, যুক্তরাজ্যসহ নানা দেশের বৃহত্তম ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা যোগদান করে শুভেচ্ছা বক্তব্য দিয়েছিলেন। এভাবে বাংলাদেশের অন্য কোনো ছাত্র সংগঠনের শীর্ষ সম্মেলনে বিদেশী ছাত্র সংগঠনদের প্রতিনিধিরা আসেন কিনা আমার জানা নেই। অবশ্য ছাত্রশিবিরের সদস্য সম্মেলনে বিদেশী মেহমানদের আসার দৃষ্টান্ত নতুন নয়। এর আগে প্রতিটি সদস্য সম্মেলনেই বিদেশী মেহমানরা এসেছিলেন। ১৯৭৮-৭৯ সালে যে সদস্য সম্মেলন হয়েছিল সেখানে মালয়েশিয়ার তৎকালীন ছাত্র সংগঠনের প্রধান হিসেবে আনোয়ার ইব্রাহিম এসেছিলেন যিনি এ মুহূর্তে দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ঠিক একইভাবে গত বছর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছাত্রশিবিরের সর্বশেষ যে সদস্য সম্মেলনটি হয়েছিল সেখানেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধি যারা এসেছিলেন; এবারও এ প্রক্রিয়া অব্যহত ছিল। এর মাধ্যমে ছাত্রশিবির বিশ্বছাত্র আন্দোলনের পরিম-লে বাংলাদেশের নাম বারবার উজ্জ্বল করেছে।

মূল ভেন্যুর বাইরে ছাত্রশিবিরের প্রকাশনা বিভাগের আওতায় একটি বড়ো প্রদর্শনী ও বিক্রি কেন্দ্র চোখে পড়লো। সেখানে আসন্ন ২০২৬ সালের কয়েক ধরনের ক্যালেন্ডার যেমন ছিল ঠিক তেমনি চাবির রিং থেকে শুরু করে পেপার ওয়েইটের মতো স্যুভেনিরসহ নানা ধরনের উপহার সামগ্রীও ছিল। পাশাপাশি, ছাত্রশিবিরের বিগত সময়ের গুরুত্বপূর্ণ সব প্রকাশনাও সেখানে রাখা হয়েছিল। বিশেষ করে শিক্ষাখাতে ২০২৫ সেশনে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির যে ৩০ দফা সংস্কার প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে সেটিও বুকলেট আকারে এ প্রদর্শনী কেন্দ্রে দেখলাম। এর বাইরে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা বিশেষ করে জীববিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান, পদার্থ বিজ্ঞান মহাকাশ বিজ্ঞানসহ নানা বিষয়ের ওপর প্রকাশিত প্রকাশনাগুলো ছিল। একইসাথে, নিজেদের জনশক্তিকে নৈতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিও আলোকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ছাত্রশিবির যেসব পুস্তক প্রকাশনা ও উপকরণ বের করেছে সেগুলোও ঐ প্রদর্শনীকেন্দ্রে ছিল- যা আগত দর্শনার্থী ও অতিথিদের আকৃষ্ট করেছে।

এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, প্রতিবার সাধারণত ডিসেম্বর মাসের শেষ দিনে অথবা জানুয়ারি মাসের ১ তারিখের মধ্যেই ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সদস্য সম্মেলন আয়োজন করা হয়। কিন্তু এবার বেশ ৪-৫ দিন আগে ২৬ ডিসেম্বর সম্মেলনটি আয়োজন করা হলো। আমি এর নেপথ্য কারণ জানবার চেষ্টা করেছি এবং কারণগুলো জেনেও আমার খুব ভালো লেগেছে। প্রথমত বেশ কয়েকটি বিশ^বিদ্যালয়ে ৩০ ও ৩১ ডিসেম্বর ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ছাত্রশিবির যেহেতু একটি ছাত্র সংগঠন; এ কারণেই তারা ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা যেন নির্বিঘেœ পরীক্ষা দিতে পারেন তাই তারা নিশ্চিত করতে চেয়েছে। দ্বিতীয় যে কারণটি আমি জেনেছি তা হলো আগামী ৩০ ডিসেম্বর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল অদম্য জবিয়ান বিশেষণে এ নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে। এ নির্বাচনটিও যেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা যায় সে কারণেও সম্মেলনটি দিন কয়েক আগেই আয়োজন করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে এদেশের বামপন্থী বুদ্ধিজীবী এবং মিডিয়ারা দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের অপবাদ এবং অপপ্রচার চালিয়ে আসছে। নানা ধরনের অপরাধের সাথে ছাত্রশিবিরকে জড়িয়ে প্রোপাগান্ডা চালানো হয়েছে। আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী আমলে একাধিক হত্যাকান্ডের সাথে স্থানীয় ছাত্রশিবির নেতৃবৃন্দকে ফাঁসানো হয়েছিল। তাদেরকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে। বছরের পর বছর তারা কারাগারে থেকেছেন, তাদের ক্যারিয়ার নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু এসব দায়িত্বশীলরা পরবর্তীতে আদালত থেকে বেকসুর খালাস পেয়েছেন এবং অনেকেই বিভিন্ন দেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষায় সর্বোচ্চ ডিগ্রি লাভ করেছেন। এভাবে ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে আনা সবগুলো অভিযোগ মিথ্যা, বানোয়াট ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই প্রমাণিত হয়েছে আর সময়ের পরিক্রমায় ছাত্রশিবির তার গঠনমূলক ও নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচির মাধ্যমে আরো বেশি জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য ছাত্র সংগঠনে পরিণত হয়েছে। এবারের সদস্য সম্মেলনের প্রতিটি পরতে পরতে আমি সে বিষয়গুলো লক্ষ্য করেছি।

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্য সম্মেলনে গেলে আমার বরাবরই খুব সুন্দর অনুভূতি হয়; কেননা এ ছাত্র সংগঠনটি সবসময়ই মজলুম বান্ধব সংগঠন। সম্মেলনের সামনের দিকে কয়েক সারি জুড়ে কেবলই আহতদের দেখা গিয়েছে। একটু পর পর এমন কারো দিকে চোখ চলে গিয়েছে যিনি হুইল চেয়ার দিয়ে হাঁটছেন কিংবা ক্র্যাচের ওপর ভর করে হাঁটছেন। কয়েকজনকে দেখলাম যাদের চোখ নেই। ভলান্টিয়াররা যেভাবে তাদের সম্মানের সাথে নিয়ে গেলেন বা আসলেন তা শিবিরের প্রতি আমার সম্মান আরো বৃদ্ধি করেছে। আমি যে সিটে বসেছিলাম, আমার পাশেই ছিলেন একজন জুলাই যোদ্ধা- যার দুটো হাতই কেঁটে ফেলতে হয়েছে। সকালে নাস্তা খাওয়ার সময় আমি দেখলাম তাকে ছাত্রশিবিরের ভাইয়েরা আদর করে খাইয়ে দিচ্ছেন। ছাত্রশিবিরের ২৩৪ জন শহীদকে সংগঠনটি নিয়মিতভাবে স্মরণ করে। বিভিন্ন ক্যাম্পাসে, আন্দোলনে যারা আহত হয়েছেন, পঙ্গু হয়েছেন কিংবা আওয়ামী আমলে যাদেরকে একদম কাছ থেকে গুলী করা হয়েছে, তাদের একটি মিলনমেলা হয়েছিল এবারের সদস্য সম্মেলনে। এর পাশাপাশি অসংখ্য জুলাই যোদ্ধা এসে এবারের সম্মেলনকে আরো বেশি সমৃদ্ধ ও বরকতময় করে তুলেছিল। ছাত্রশিবির যেভাবে শহীদ ও জীবন্ত শহীদদের স্মরণ করে; বাংলাদেশের সকল ছাত্র সংগঠন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য তা অনুকরণীয় হতে পারে বলে আমি বিশ^াস করি।

আরেকটি বিষয়ও এবার চোখে পড়ল। একদম প্রবেশ মুখে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের ভেন্যুর ওপর থেকে নিচে একটি লম্বা ব্যানার। ব্যানারটির শিরোনাম, ‘যে ৭ জন ভাই এখনো ফিরে আসেনি।” সেখানে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী দু’ছাত্র ওয়ালিউল্লাহ, আল মুকাদ্দাস, হাফেজ জাকির হোসেনসহ আওয়ামী আমলে গুম হওয়া সাতজন ভাই তাদের নাম এবং ছবি সংযুক্ত ছিল। একদম প্রবেশমুখে এ ব্যানারটি থাকার কারণে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হলো যেন যারাই এ মিলনায়তনে প্রবেশ করবেন; তারা যেন নিখোঁজ এ ভাইদের একটিবারের জন্য হলেও স্মরণ করতে পারেন। এখানে আরো বলা দরকার যে, ছাত্রশিবির এখনো প্রতি বছরের সদস্য সম্মেলনে ৭ জন নিখোঁজ ভাইয়ের নামে ডেলিগেট কার্ড তৈরি করে। আর যখন এ ডেলিগেট কার্ডগুলো মূল ভেন্যুতে কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হয় তখন তাদের পরিবার এবং সহকর্মীসহ অসংখ্য মানুষ আবেগতাড়িত হয়ে যান।

ছাত্রশিবিরের যেকোনো বড়ো সম্মেলনের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, কোনো একজন শহীদের পিতার মাধ্যমে এর উদ্বোধন হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। একইভাবে এবারের কেন্দ্রীয় সদস্য সম্মেলনের উদ্বোধন ঘোষণা করেন জুলাই অভ্যুত্থানে ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে শাহাদাতবরণকারী কিশোর শহীদ মুনতাসির আলিফের গর্বিত পিতা সৈয়দ গাজিউর রহমান। তিনি উদ্বোধন করলেও একইসাথে সম্মেলনে উপস্থিত ভিকটিম ও শহীদ পরিবারের প্রতিনিধিদের অত্যন্ত সম্মান এবং আন্তরিকতার সাথে মঞ্চে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। উদ্বোধনী ভাষণের সময় তারা সবাই একসাথেই মঞ্চে ছিলেন। তাই বলা যায়, সকল শহীদ পরিবার ও ভিকটিমেরা মিলেই এবারের সদস্য সম্মেলন উদ্বোধন করেছেন। এর আগে ২০২৪ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যে সদস্য সম্মেলনটি হয়েছিল সেখানেও একইভাবে শহীদ পরিবারগুলোকে দিয়েই সদস্য সম্মেলনের উদ্বোধন করানো হয়েছিল যা মজলুম পরিবারগুলোকে বারবার স্বস্তিদায়ক অনুভূতি প্রদান করে। শহীদ ও মজলুমদের প্রতি ইসলামী ছাত্রশিবির যেভাবে ভালোবাসা ও সম্মান প্রকাশ করে তার জন্য তারা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। আশা করি, শহীদি কাফেলা নামে পরিচিত সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির আগামী দিনগুলোতেও এ সিলসিলা ধরে রাখবে।

উপসংহারে বলতে চাই ছাত্রশিবিরের এবারের সদস্য সম্মেলনের বড়ো একটি বৈশিষ্ট্য ছিল এর প্রাসঙ্গিকতা। গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানী ঢাকার বিজয়নগরে গুলীবিদ্ধ হন জুলাই যোদ্ধা, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদী। তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়, পরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় তিনদিন পর তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় সিঙ্গাপুরে। ১৮ ডিসেম্বর তার শাহাদাতের খবর আসে। তখন থেকেই পুরো জাতি শোকে মুহ্যমান অবস্থায় রয়েছে। ছাত্রশিবিরের এবারের সদস্য সম্মেলেনে অন্যতম উপজীব্য চরিত্র ছিলেন শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদী। মিলনায়নের বাইরে তার বিশাল ব্যানার ঝুলানো হয়েছিল। তার উক্তিগুলো নানা পোস্টারে মিলনায়তনের বিভিন্ন স্থানে শোভা পাচ্ছিল। সদস্য সম্মেলনে শহীদ হাদীর ওপর একটি ডকুমেন্টারি প্রদর্শিত হয় যা উপস্থিত সবাইকে অশ্রুসিক্ত করে দিয়েছে। অনুষ্ঠানের প্রথম সেশনের অন্যতম অতিথি ছিলেন শহীদ হাদীর বড়ো ভাই ওমর বিন হাদী। প্রথম সেশনে সভাপতির বক্তব্য দিতে গিয়েও বিদায়ী কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম শহীদ হাদীর কথা স্মরণ করেন এবং তার উচ্চারিত শ্লোগানগুলো সমবেত কন্ঠে উচ্চারণ করে সবাইকে জুলাইয়ের বিপ্লবী চেতনা আরো একবার স্মরণ করিয়ে দেন। সবমিলিয়ে এবারের সদস্য সম্মেলনকে আমার কাছে সময়োপযোগী, নিয়মতান্ত্রিক ও শৃংখলাসম্পন্ন একটি আয়োজন বলেই মনে হয়েছে। আমি মনে করি, ইসলামী ছাত্রশিবিরের এই ধরনের ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন মহলে আরো বেশি আলোচনা হওয়া উচিত। আমি ছাত্রশিবির এবং এর নতুন নেতৃত্বের সফলতা ও কল্যাণ কামনা করছি।