ইবনে হাসান

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। অর্থাৎ আশরাফুল মাখলুকাত। এটা অস্বীকার করার কোন যুক্তি নেই। স্বয়ং স্রষ্টাই বনি আদমকে সম্মানিত করে তৈরি করেছেন বলে ঘোষণা করেছেন। এখন প্রশ্ন হল অন্যান্য প্রাণীর মত মানুষও প্রাণীই। তবে মর্যাদাগত এ পার্থক্য কেন? মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য যেসব চাহিদা ও উপকরণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিন্ন। জীবনাচার ও জাত-স্বভাবেও মিল আছে। বেঁচে থাকার জন্য মানুষের খাদ্য, পানি, থাকার জায়গা ও বিশ্রাম দরকার পশুরও তাই প্রয়োজন। আকার আকৃতিতে মানুষ উন্নতমানের ও সুষমামণ্ডিত। তবে অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলোতে তেমন অমিল খুঁজে পাওয়া যায় না। পশুদের মত নাক, কান, চোখ, মুখ, মাথা ইত্যাদি সবইত মানুষেরও আছে। বরং পশুর কোন কোন অঙ্গ বেশি আছে। মানুষের লেজ ও শিং নেই, পা দুটো কম। তবে মানুষের থাকা খাওয়া পরা পশুর মত নয়। সবকিছুই উন্নতমানের। সেদিক বিবেচনায় মানুষ উন্নতমানের প্রাণী। তাহলে আসল পার্থক্যটা কোথায়? কেন মানুষ সম্মান ও মর্যাদার আসনে সমাসীন।

সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন দু’টি সত্ত্বার সমন্বয়ে। পাশবিক সত্ত্বা ও নৈতিক সত্ত্বা। নৈতিক সত্ত্বার কারণেই মানুষ মর্যাদাশীল সৃষ্টি। দ্বিতীয়ত মানুষকে সুন্দরতম অবয়ব বা কাঠামোয় সৃষ্টি করা হয়েছে। তার নৈতিকতার বিকাশ ঘটে জ্ঞান বিবেক বুদ্ধি চিন্তা চেতনা ও সৎ প্রবণতার মাধ্যমে। এটা চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে আত্মশুদ্ধি অর্জনের দ্বারা। মানুষ মৌলিক মানবীয় গুণাবলী অর্জনের মাধ্যমে নেতৃত্ব ও সম্মানজনক আসনে সমাসীন হতে পারে। এর ব্যতিক্রম ঘটলে সে নিকৃষ্ট জীবে পরিণত হয়। এসব গুণাবলী অর্জনের জন্য তাকে তিনটি প্রধান ইন্দ্রিয়ের সাহায্য নিতে হয়। মহামূল্যবান এ তিনটি ইন্দ্রিয়ের যথার্থ ব্যবহার করতে না পারলে বা না করলে মানুষ আর মানুষ থাকে না। অবয়বের কোন পরিবর্তন ঘটে না। তবে স্বভাবগতভাবে সে মানবীয় মর্যাদা হারায়। উক্ত ৩টি ইন্দ্রীয় হচ্ছে- চোখ, কান ও অন্তর।

মহান স্রষ্টার ভাষায় যেসব মানুষ ধ্বংসে নিপত্তিত হবে তাদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তাদের চোখ আছে দেখে না। কান আছে শোনে না, অন্তর আছে উপলব্ধি করে না। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে পশুর চোখ কান ও দীল আর মানুষের চোখ কান ও দীল এক নয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একটা ছাগল বা গরুর বাঁধন খুলে দেয়া হলে সে ছুটে গিয়ে একটা বাগানে ঢুকে সামনে যা পায় তাই খেয়ে সাবার করে ফেলবে। চোখে দেখেও তার উপলব্ধিতে আসবে না সে কী খাচ্ছে এবং খাওয়া উচিত কিনা। এমনকি শত চিৎকার করেও কোন লাভ হবে না তাকে থামানো যাবে না। ডাকাডাকি আর নিষেধের কোন তোয়াক্কা করবে না। নিরুদ্বেগে তার কাজ সে চালিয়ে যাবে। তার চোখ কান দীল তাকে বিরত রাখতে সাহায্য করবে না। কিন্তু একজন মানুষ কেবল চর্মচক্ষু দিয়েই দেখে না। তার অন্তর্দৃষ্টি সঠিক জিনিসটা বুঝতে ও চিনতে সাহায্য করে। তার বাহ্যিক কানের সাথে দীলের কানও আছে। কিছু শুনার সাথে সাথেই উচিত অনুচিত জানতে পারে। এমনিভাবে তার দীল দেমাগ ন্যায়-অন্যায়, ভাল মন্দ বিচার বিবেচনার উপলব্ধি দান করে। তার চেতনার সাহায্যে পাপ-পুণ্যের পরিচিতি তার মানসপটে উদয় হয়। এরপর বিবেকের ফয়সালায় পাপ অথবা পুণ্যের পথ অবলম্বন করে। কুরআন পাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সুস্পষ্টভাবে সে কথাই উল্লেখ করেছেন এবং মানুষ আর পশুর প্রকৃত পার্থক্যটা এখানেই।

মানুষ তার বিবেক-বিবেচনা জ্ঞান বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে কল্যাণ অকল্যাণ ন্যায় অন্যায়, সঠিক বেঠিক সত্য মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয় করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কোনটা সে গ্রহণ করবে আর কোনটা করবে না। সঠিকটা গ্রহণ করতে পারলেই মঙ্গল ও সফল। ভুল পথে পা বাড়ালেই অমঙ্গল অশান্তি ও ব্যর্থতা। অবশ্যই মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা জ্ঞানের দ্বারাই নির্ণিত হয়। সেজন্য প্রয়োজন যথার্থ জ্ঞান অর্জন ও তার যথার্থ প্রয়োগ। উল্লেখ্য, আদম (আ.)কে সৃষ্টি করে আল্লাহ পাক তাকে সমস্ত বিষয়ের নাম শিখিয়ে দিলেন। প্রথমে ফেরেশতাদের সেসবের নাম বলতে বললেন, কিন্তু তারা অপারগ হলে আদমকে (আ.) বলতে বললেন। তিনি সহজেই সব কিছুর নাম বলে দিলেন। ফলে তার মর্যাদা ফেরেশতাদের চেয়ে বেশি প্রমাণিত হল। মানুষ সৃষ্টির ব্যাপারে ফেরেশতাদের নেতিবাচক অবস্থার প্রেক্ষিতেই আল্লাহ পাক উক্ত পরীক্ষাটি নিয়েছিলেন। একটা বিষয় এখানে লক্ষ্যণীয় আর তা হচ্ছে আল্লাহ পাক আদমকে (আর.) বস্তুরাজির নাম শিখিয়ে তার জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরেছেন। জ্ঞান অর্জন প্রশ্নে দু’টি প্রান্তিক ধারণা চালু আছে। একটিগোষ্ঠী মনে করে জ্ঞান বলতে ধর্মীয় জ্ঞানের উৎকর্ষ সাধন। অপর গোষ্ঠী শুধু বস্তুগত ও জাগতিক জ্ঞানার্জনকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। আসলে উভয় জ্ঞানে সমৃদ্ধ হওয়ার মাঝেই জ্ঞান পূর্ণতা পায়। জ্ঞানের মূল উৎস ওহীর জ্ঞান তথা আল কুরআনের জ্ঞান। এটা সন্দেহ সংশয় মুক্ত ও শতভাগ নির্ভুল। আল কুরআনে আধ্যাতিক ও নৈতিক জ্ঞানের চর্চা ও অনুশীলনের কথা যেমন আছে অনুরূপ বস্তু জ্ঞান তথা আল্লাহর সৃষ্টি জগত নিয়ে চিন্তা ফিকির গবেষণার তাকিদও দেয়া হয়েছে আল্লাহ পাক সেটাই বলেছেন। তাই একদিকে নিষ্ঠাবান আবেদ বান্দা হওয়ার সাথে সাথে সালেহ বান্দা হতে হবে। এদুয়ের সমন্বয় ঘটলেই আল্লাহ জমিনে খিলাফথ দান করবেন। আমাদের সমাজে আবেদ হিসেবে পরিচিত মানুষের বিপুল উপস্থিতি আছে। অনেক বড় বড় বুজুর্গ পীর মাশায়েখ আছে। কিন্তু দ্বীন বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নেই। কারণ সালাহিয়াতের অনুপস্থিতি যেটা দ্বীন বিজয়ের জন্য অপরিহার্য শর্ত। আজ সারা বিশ্বে বাতিলের প্রভাব প্রতিপত্তি ও প্রভুত্ব। তাদের জোর জুলুম অত্যাচারে মানবতা বিপন্ন বিপর্যস্ত। তাদের ধ্বংস কামনা করে এত দোয়া মোনাজাত প্রার্থনা যেন কোন কাজেই আসছে না। ফলে হতাশার অন্ধকারে নিমজ্জিত মানবতা।

বিশ্বব্যাপী জুলুম নিপীড়ন নির্যাতনের মূল কারণ কী? কারণ এর সাথে যারা জড়িত তাদেরও সত্যিকার অর্থে কোন নীতি নৈতিকতা চরিত্র আদর্শ বলে কিছুই নেই। তারা ত ঐশী বা ওহীর জ্ঞনের অনুসরণ করে না। ফলে তারা বিপথগামী বিভ্রান্ত। বিভ্রান্তরা সব সময় আত্মপুজারী হয়। ন্যায়-অন্যায় বিবেকবোধ কাজ করে না। নিজের নিজ পরিবার, সমাজ জাতি ও দেশের স্বার্থ সুবিধা ছাড়া কিছুই বুঝতে চায় না বুঝতে পারে না। হয় শক্তি প্রয়োগ অথবা ছলে বলে কলে কৌশলে অন্যকে পদানত করার বা তার সর্বস্ব লুটে নেয়াটাকে বৈধ মনে করে। অন্ধের মত ধ্বংসযজ্ঞ ও তান্ডবলীলা চালাতে কুণ্ঠাবোধ করে না। প্রতিপক্ষের ওপর হিংস্র হায়েনার মত ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঘরবাড়ি জনপদে বিভিষিকার রাজত্ব কায়েম করে। যুগে যুগে বিশ্বজুড়ে এ চিত্রই দেখা যায়। বর্তমানেও বিশ্বে একই রকম তাণ্ডব চলছে। দেশে দেশে জাতিতে জাতিতে দ্বন্দ্ব সংঘাত সর্বগ্রাসী রূপে। সংঘর্ষে পৃথিবীটা জর্জরিত। কোথাও কোন সংযম বা নিয়ন্ত্রণ নেই। অন্ধ দ্বৈত্যের মত গদা ঘুরাচ্ছে শক্তিমানরা। জংলীপনার ভয়ংকর দৃশ্যই প্রতীয়মান। শান্তি স্বস্তির প্রত্যাশা ও সম্ভাবনা সুদূর পরাহত। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ, সংঘাত সংক্ষুব্ধ মধ্যপ্রাচ্য, ইরানের সাথে আমেরিকা-ইসরাইলের যুদ্ধ পাক-আফগান লড়াই মিয়ানমারে সংঘাত, কাশ্মীর নিয়ে পাক-ভারত উত্তেজনা ভেনিজুয়েলায় ট্রাম্পের নগ্ন থাবা এসবই তার জ¦লন্ত উদাহরণ।

অপরদিকে চরিত্র ও নৈতিকতার অবক্ষয় ও অধঃপতন বিশ্বব্যাপী সুনামীর রূপ ধারণা করেছে। এটা হল ভোগবাদী দর্শনের দানবীয় রূপ। এর মূল কথাই হল খাও দাও মজা কর ফূর্তি কর। জীবনত একটাই। কাজেই ভোগের পেয়ালাকে পূর্ণ করতে হবে। এই ভোগের চিন্তা মানুষকে পশুতে পরিণত করে। লোভ-লালসা কামনা বাসনাকে চরিতার্থ করার জন্য হেন ঘৃণ্য ও নিকৃষ্ট কাজ নাই যা সে করতে পারে না। বর্তমানে আমরা সে বীর্ভৎস চিত্রই দেখতে পাচ্ছি বিশ্বব্যাপী। অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও নোংরামীর প্রচণ্ড বন্যায় ভেসে গেছে, ডুবে গেছে সকল সুকুমার বৃত্তি। লাজ লজ্জা শরম-ভরম, শালীনতা যেন মুখ লুকিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

এসব কিছুই ঘটছে এ জন্য যে, মানুষ তার সম্মান ও মর্যাদার কথা শ্রেষ্ঠত্বের কথা বিস্মৃত হয়ে গেছে। সে স্মরণ করে না তার স্রষ্টা কে এবং সৃষ্টির উদ্দেশ্যই বা কী? আর সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে বেখবর থাকলে জীবনটাইত সম্পূর্ণ বৃথা। শুধু ভোগ বিলাস ও লালসা পূরণইত আসল কথা নয়। এসবের জন্য জীবজন্তুরাই রয়েছে। এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকলে মানুষ আর এদের মধ্যে তফাৎ কী? মানুষের চিন্তা চেতনা ধ্যান ধারণা এতটা নীচে নেমেছে যে ভাল মন্দ কল্যাণ অকল্যাণ ন্যায় অন্যায় সত্য মিথ্যার পার্থক্য করার মত সব অনুভূতি হারিয়ে অনিয়ন্ত্রিত বলগাহীন জীবনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। কেউ কারো তোয়াক্কা করছে না মানছে না। মহামারির মত ছড়িয়ে পড়ছে ফেৎনা ফাসাদ অশান্তির আগুন। মুক্তি ও স্বস্তি নাগালের বাইরে এক সোনার হরিণ।

এটা হল গোটা বিশ্বের বাস্তব অবস্থা। তবে মুসলিম বিশ্বের ক্ষেত্রে এমনটা হওয়ার ত কথা নয়। কেননা তারা ত সৃষ্টিকর্তাকে চিনে জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানে। পরকালে ভাল কাজের ভাল ফল ও মন্দ কাজের কঠিন শাস্তির কথাও অবহিত। এরপরও মুসলিম উম্মাহ সীমাহীন গাফলতীর সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে। মুসলিম উম্মাহর এ অবিমৃষ্যকারিতার কারণে গোটা মানবজাতি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। মুসলিম জাতিকে আল্লাহপাক সর্বোত্তম উম্মত আখ্যায়িত করে বিশ্বমানবতার কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করেছেন তারাই যদি বিভ্রান্তি, অজ্ঞতার বেড়াজালে বন্দী হয়ে পড়ে তবে মানবতাকে পথের দিশা দেবে কে? সুতরাং ইহকাল পরকালের শান্তি কল্যাণ ও মুক্তির জন্য এ উম্মতের জাগরণের বিকল্প নেই। তাদের মধ্যে চেতনার উন্মেষ ঘটলে তারা যেমন সঠিক পথের দিশা পাবে তেমনি বিশ্ব মানবতাও আলোর সন্ধান পেয়ে জীবন ধন্য করতে পারবে আজকের দিনে সেটাই হৃদয় নিংড়ানো প্রত্যাশা।