বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে যে দু’টি খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে তার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে পণ্য রপ্তানি আয়। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জনশক্তি রপ্তানি খাত। পণ্য রপ্তানি খাত যদিও জাতীয় অর্থনীতিতে তুলনামূলকভাবে কম মূল্য সংযোজন করে তারপরও এ খাতের গুরুত্ব কোনভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। অর্থনীতিবিদগণ বারবার বলে আসছেন, পণ্য রপ্তানি খাতকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভিত্তিতে ঢেলে সাজানো দরকার কিন্তু তাদের সে পরামর্শে কেউই কর্ণপাত করছে না। ফলে পণ্য রপ্তানি খাতের বিপুল সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। দেশ এ খাতের কাক্সিক্ষত অবদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো (ইপিবি) থেকে প্রকাশিত রপ্তানির হালনাগাদ তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে গত ডিসেম্বর মাসে দেশের রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সোয়া ১৪ শতাংশ কমেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে মোট ৪ দশমিক ৬২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করা হয়েছিল।
গত ডিসেম্বর মাসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে বাংলাদেশ পণ্য রপ্তানি বাবদ আয় কমেছে প্রায় ২৪ হাজার মার্কিন ডলার। আগের বছর একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ২৪ দশমিক ৫৪ হাজার মার্কিন ডলার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যে রপ্তানি বেড়েছে যথাক্রমে ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ, ১৮দশমিক ০৮ শতাংশ ও ১৪ দশমিক ৫০ শতাংশ। উদীয়মান বাজারগুলোর মধ্যে সংযুক্ত আরত আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় রপ্তানি বেড়েছে যথাক্রমে ২৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ, ২১ দশমিক ৩৩ শতাংশ ও ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি কমে যাবার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং স্থবিরতার লক্ষণ ফুটে উঠেছে।
নানা কারণেই রপ্তানি আয় কমে যেতে পারে। তবে বর্তমানে রপ্তানি আয় কমে যাবার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে কাজ করেছে জ¦ালানি সঙ্কট। বাংলাদেশ বর্তমানে তীব্র জ¦ালানি সংকটে ভুগছে। চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক গ্যাস যোগান পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ২৯টি গ্যাস ফিল্ড আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে ২০টি গ্যাস ফিল্ড থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। দেশ দৈনিক গ্যাসের চাহিদা হচ্ছে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমান প্রমাণিত গ্যাস মজুদ দিয়ে আগামী ৮ থেকে ১০ বছরের চাহিদা মেটানো সম্ভব। যেহেতু স্থানীয়ভাবে গ্যাসের যোগান বৃদ্ধির তেমন কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি তাই আমাদের আমদানিকৃত এলএনজি’র উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিছুদিন আগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ইউনিট এলএনজি’র মূল্য ৫৫ থেকে ৫৭ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি আমদানি করা হলে প্রতি ইউনিট এলএনজি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ মার্কিন ডলারে ক্রয় করা সম্ভব। বাংলাদেশে গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেখানে ৮ থেকে ১০টি গ্যাস ফিল্ড খনন করলে একটিতে গ্যাস পাওয়া যায়, সেখানে বাংলাদেশে প্রতি তিনটি গ্যাস ক্ষেত্রে খনন করা হলেই একটিতে গ্যাস পাওয়া যায়। অজ্ঞাত কারণে কর্তৃপক্ষীয় পর্যায়ে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের প্রতি অনীহা লক্ষ্য করা যায়। তার পরিবর্তে মহল বিশেষ এলএনজি আমদানির প্রতি অতি আগ্রহী। কারণ এলএনজি আমদানি করা হলে ভালো কমিশন পাবার সম্ভাবনা থাকে। এ ছাড়া বিদেশি নানা শক্তি বাংলাদেশকে গ্যাস সম্পদে স্বনির্ভর হতে দিতে চায় না। তারা নানাভাবে স্থানীয়ভাবে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে চলেছে। আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে মিয়ানমার এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমা চিহ্নিত হয়েছে অনেক বছর আগে। কিন্তু এখনো আমরা সমুদ্র সীমায় গ্যাস অনুসন্ধানের কোন কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারিনি। অথচ ভারত ও মিয়ানমার তাদের সমুদ্র সীমায় অনুসন্ধান চালিয়ে গ্যাস আবিস্কার করেছে। যে কোন পণ্য এবং সেবা উৎপাদনের ক্ষেত্রে জ¦ালানির কোন বিকল্প নেই। কিন্তু আমরা বর্ধিত উৎপাদন ব্যবস্থা সচল রাখার জন্য শিল্প-কারখানায় গ্যাসের যোগান নিশ্চিত করতে পারছি না।
শিল্প-কারখানায় উৎপাদন কমে গেছে। কারণ, অধিকাংশ শিল্প-কারখানাই তাদের উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না। ফলে পণ্য উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। রপ্তানি আয় কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশ দীর্ঘ প্রায় ৪ বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রবণতা প্রত্যক্ষ করছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশ ইতিমধ্যেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হলেও আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। এর একটি কারণ হচ্ছে,আমরা মূল্যস্ফীতি নিয়ে নানা ধরনের কথাবার্তা বলছি কিন্তু অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে স্থানীয় বাজারে পণ্যের যোগান বৃদ্ধির বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে। ভোক্তার চাহিদাকৃত পণ্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদন ও যোগান দিতে না পারল মূল্যস্ফীতি টেকসইভাবে কমবে না।
বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হবার দাবি রাখে। বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে শুরু করে বেশ কিছু দেশে থেকে শুল্কমুক্ত পণ্য রপ্তানি সুবিধা পেয়ে থাকে। তাই এখানে শিল্প স্থাপন করা স্থানীয় এবং বিদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য খুবই লাভজনক। কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারছি না। পণ্য উৎপাদন বাড়ানো না গেলে রপ্তানি করবেই। একই সঙ্গে স্থানীয় বাজারে মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে। পৃথিবীর আর কোন দেশে রপ্তানি বাণিজ্য এতটা অপরিকল্পতভাবে চলে কিনা আমাদের জানা নেই। বাংলাদেশের উদ্যোক্তাগণ মূলত তৈরি পোশাক শিল্প নিয়ে মেতে আছে। আরো অনেক ধরনের শিল্প কারখানা স্থাপন করে অর্থনীতিকে সচল করা যায় এটা আমরা বুঝতে চাচ্ছি না।
বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে আমরা সামান্য কিছু পণ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় নিয়োজিত রয়েছি। বাংলাদেশ অন্তত ২০০ টি পণ্য রপ্তানি করে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক রপ্তানি বাবদ অর্জিত হয় মোট রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশের মতো। অথচ তৈরি পোশাক রপ্তানি বাবদ যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয় তার অন্তত ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য এবং ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানি বাবদ ব্যয় হয়। ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে এ খাতের মূল্য সংযোজনে হার ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ। অথচ এমন অনেক পণ্য আছে যা প্রায় শতভাগ মূল্য সংযোজন করে। এসব পণ্য রপ্তানি বাড়ানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন হলেও এ ব্যাপারে তেমন কোন কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে না। পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত পণ্য, চা ইত্যাদি পণ্য রপ্তানি করা হলে জাতীয় অর্থনীতিতে অধিক মূল্য সংযোজন হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে অনেক দিন ধরেই অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞগণ পরামর্শ দিলেও কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কোন কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। বাংলাদেশ বর্তমানে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে যেভাবে আত্মনিয়োগ করেছে তাতে যে কোনো সময় এ খাতে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের আর একটি সমস্যা হচ্ছে সীমিত সংখ্যক দেশের উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়া। বাংলাদেশ দেড় শতাধিক দেশের পণ্য রপ্তানি করে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ প্রায় ৫০ শতাংশ পণ্য রপ্তানি করা হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৭টি দেশে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১৯৭৬ সাল থেকে বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা সম্বলিত জিএসপি সুবিধা দিচ্ছে। এ সুবিধা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকগণ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে পণ্য রপ্তানি করছে। একক দেশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে বাংলাদেশি পণ্যের সবচেয়ে বড় গন্তব্যস্থল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশকে কোটা সুবিধা দিয়েছে। কোটা সুবিধার আওতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য আমদানি করতো। পরবর্তীতে মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু হবার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে দেয়া কোটা সুবিধা বাতিল করে এবং তদস্থলে সীমিত পরিসরে জিএসপি সুবিধা প্রদান করতে থাকে। পরবর্তীতে শ্রম আইন প্রশ্নে মতান্তরের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি সুবিধা স্থগিত করে। যে সামান্য কিছু দেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভারসাম্য বাংলাদেশের অনুকূূলে রয়েছে তার মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন সবার শীর্ষে অবস্থান করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি বাণিজ্য ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা প্রদান না করতো তাহলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য এতটি বিকশিত হতে পারতো না।
বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের একটি বড় দুর্বলতা হচ্ছে আমরা যেসব দেশে সবচেয়ে বেশি পণ্য রপ্তানি করি সেই সব দেশ থেকে আমদানি করি সীমিত সংখ্যক পণ্য। আবার যেসব দেশ থেকে বাংলাদেশ বেশি পরিমাণ পণ্য আমদানি করে সেই সব দেশে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ খুবই কম। উদাহরণস্বরূপ চীন এবং ভারতের কথা বলা যেতে পারে। বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পরিমাণ পণ্য আমদানি করে থাকে চীন থেকে। বাংলাদেশের মোট আমদানি পণ্যের প্রায় ২৯ শতাংশই আসে চীন থেকে। অথচ চীনে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির পরিমাণ খুবই কম। একই অবস্থা ভারতের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান দ্বিতীয়। কিন্তু ভারতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির পরিমাণ মোটও উল্লেখ করার মত নয়। রপ্তানি বাণিজ্যের এই অসমতা আমরা দূর করতে পারছিনা। একটি বিষয় স্মরণ রাখতে হবে তাহলো, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য কখনোই শুধু কূটনৈতিক সম্পর্কের উপর নির্ভর করে না। এমনকি ধর্মীয় মিল থাকলেও বাণিজ্য প্রসারিত হয় না। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য উদ্দীষ্ট গন্তব্যে স্থানীয় পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি করতে হয়। তুলনামূলক কম মূল্যে বিকল্প পণ্য রপ্তানি করা গেলেই কেবল দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধি পেতে পারে। যেমন চীন তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে প্রথম স্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। চীন এবং বাংলাদেশ উভয়ে যেহেতু তৈরি পোশাক রপ্তানি করে তাই এ দু’টি দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বিকশিত হবার খুব একটা সম্ভাবনা নেই।
বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল। কিন্তু সে উজ্জ্বলতাকে কাজে লাগাতে হলে পরিকল্পিত উদ্যোগ নিতে হবে। গতানুগতিক ধারায় চললে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কখনোই পরিপূর্ণ সফলতা অর্জন করা যাবে না। আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি বাণিজ্যে ভালো করতে হলে রপ্তানি পণ্য তালিকায় নতুন নতুন পণ্য স্থান দিতে হবে এবং একই সঙ্গে নতুন নতুন রপ্তানি গন্তব্য খুঁজে বের করতে হবে।
লেখক : সাবেক ব্যাংকার।