প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আহসান উল্লাহ মিয়া

১৮ ডিসেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব আরবি ভাষা দিবস। ২০২৫ সালের বিশ্ব আরবি ভাষা দিবসে উৎযাপনের থীম বা প্রতিপাদ্য-আরবি ভাষার জন্য উদ্ভাবনী দিগন্ত। যার মূল উদ্দেশ্য, বিশ্বব্যাপী আরবির নীতিমালা ও অনুশীলন তথা চর্চার মাধ্যমে মর্যাদাপূর্ণ আরবি ভাষাকে আরও অধিক অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাষাগত ভবিষ্যৎ গঠন করা। বাংলাদেশে আরবি ভাষা শিক্ষা ও চর্চার মানোন্নয়নে এ প্রতিপাদ্য কার্যকর করা সময়ের দাবী নিঃসন্দেহে। যার মাধ্যমে মুসলিম মেজরিটি আমাদের এ দেশে আরবি ভাষা শিক্ষা এবং এর সাংস্কৃতিক অবদানের জন্য শিক্ষা কার্যক্রম, ভাষা চর্চা, গবেষণা, প্রকাশনা ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জ্ঞানার্জনে নয়া দিগন্ত পাওয়া যাবে।

এদেশে আরবি ভাষা শিক্ষা ও চর্চার শুরু হয় দীনি প্রয়োজনে। পরবর্তীতে দীনি প্রয়োজনের পাশাপাশি আরব বিশ্বে চাকরি, পড়াশুনা, ব্যবসায়িক, কুটনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের প্রয়োজনে আরবি ভাষা শিক্ষার আগ্রহ উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। সে ধারাবাহিকতায় গণমাধ্যম কর্মী গঠন ও সাধারণ শিক্ষিতদের ভাষাগত উন্নয়নের জন্য আরবি ভাষা শিক্ষার চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে, বিগত দু’দশকে আরবি ভাষা শিক্ষাদানের অফলাইন-অনলাইন সুযোগের ফলে আরবি ভাষা শিক্ষার আগ্রহ ও চাহিদা অধিক হারে বৃদ্ধি পায়। এর পিছনে ব্যতিক্রমধর্মী অবদান রেখেছে আরব দেশের বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি থেকে আরবি ভাষায় উচ্চ শিক্ষায় ডিগ্রি অর্জনকারী বাংলাদেশীদের সক্রিয় উদ্যোগ। যার সুবাদে শুধু দেশে নয়, এমনকি প্রবাসে বসে বাংলাদেশী ও ভিনদেশীগণ আরবি ভাষা শেখার সুযোগ পাচ্ছে। যা প্রমাণ করে, বাংলাদেশে আরবি ভাষা শিক্ষা লাভের আগ্রহ দিন দিন বেড়ে চলছে।

বাংলাদেশে আরবি ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে আরবি ভাষা শিক্ষার মানসম্পন্ন সিলেবাসের অভাব, অনারব ভাষাভাষী পরিবেশে আরবি ভাষা শিক্ষার মানানসই কিতাব না থাকা এবং আরবি ভাষা শেখানোর ক্ষেত্রে গতানুগতিক পদ্ধতি প্রয়োগ অনুকরণ অন্যতম চ্যালেঞ্জ । চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় ও আরবি ভাষা শিক্ষায় সার্বিক মানোন্নয়ন চাহিদা পূরণে নতুনত্বের ধারণায় এসবের জন্য উদ্ভাবনী অনিবার্য। আর এসব চাহিদা পূরণে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে এবছর বিশ্ব আরবি ভাষা দিবস উৎযাপনের প্রতিপাদ্য উদ্ভাবনী দিগন্ত সহায়ক ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে বর্তমান ডিজিটাল যুগে আমাদের দেশে আরবি ভাষা শিক্ষার সুফল লাভের জন্য উদ্ভাবনকে সামনে রেখে অনারবদেরকে আরবি শেখানোর জন্য মানসম্পন্ন সিলেবাস, পাঠ্য কিতাব লেখা ও ভাষা শেখানোর প্রযুক্তিভিত্তিক আধুনিক পদ্ধতির প্রয়োগ করতে পারলে আরবি ভাষা শিক্ষা সহজতর ও আকর্ষণীয় করবে। এর মাধ্যমে আরবি ভাষা শিক্ষার্থীগণ উৎসাহিত হবে এবং এর শিখনফল অর্জনে ভবিষ্যতে ইনশাআল্লাহ মাইলফলক হতে পারবে। তাই কার্যকরী পদক্ষেপ হিসেবে আমাদের দেশে আরবি ভাষা শিক্ষা কার্যক্রমে যে ধরণের নতুনত্ব বা উদ্ভাবন জরুরী তা হলো:

প্রতিষ্ঠান কর্তৃক এবং গতানুগতিক অনুকরণীয় সিলেবাসের চলমান ভূমিকা গবেষণা ও পুনর্বিবেচনা করে উদ্ভাবন ও বিকশিত ধ্যান ধারণার আলোকে সিলেবাস ঢেলে সাজানো। উদ্ভাবন সমৃদ্ধ আরবি ভাষা শিক্ষা সিলেবাসের মানোয়ন্নয়ন করা। সিলেবাসে এমন মানানসই বিষয়বস্তু নির্বাচন করতে হবে যা বাংলাদেশীয় পরিবেশ ও দৈনন্দিন জীবনের সাথে ঘনিষ্ট ও শিক্ষার্থীদের নিকট পরিচিত এবং এমন প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করতে হবে যা আরব ঐতিহ্য এবং সমসাময়িক ঘটনাবলী প্রতিফলিত করে এবং শিক্ষার্থীদের আরবি ভাষায় বৈশ্বিক বিষয়াদির সাথে জড়িত হতে অনুপ্রাণিত করে। ভাষা ও তার সংস্কৃতি অবিচ্ছেদ্য, কারণ এটি একটি জাতির পরিচয় এবং ইতিহাসের প্রকৃত আয়না। তাই সিলেবাসে এমন দেশীয় পরিবেশ সংশ্লিষ্ট ও সুপরিচিত এবং প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করতে হবে যা শিক্ষার্থীদের আরবি ভাষার প্রতি আকর্ষণ তৈরি করে এবং আরব ঐতিহ্য ও সমসাময়িক ঘটনাবলী প্রতিফলিত করে শিক্ষার্থীদেরকে আরবি ভাষায় বৈশ্বিক বিষয়াদির সাথে জড়িত হতে অনুপ্রাণিত করে। যেমন, বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাস ও পরিবেশ পরিচিত শব্দ, বাক্য ও ঘটনা। আর বৈশ্বিক বিষয়াদি যেমন, মানবাধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা, প্রযুক্তি। যা এ বিষয়গুলোর সাথে শিক্ষার্থীদের সংযোগকে আরও গভীর করে এবং সেগুলি শেখা চালিয়ে যেতে তাদের মধ্যে নিজস্ব প্রেরণা তৈরি করে।

বাংলাদেশে আরবি ভাষা শিক্ষার বর্তমান পাঠ্য কিতাবগুলোর পরিবর্তনে উদ্ভাবন কাজে লাগিয়ে অনারব ভাষাভাষী পরিবেশে আরবি ভাষা শিক্ষার জন্য মানানসই কিতাব রচনা করা। যেহেতু বর্তমানে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কেন্দ্রে পাঠ্য কিতাবগুলোর অধিকাংশ আরব দেশে অনারব ভাষাভাষীদের আরবি ভাষা শেখানোর জন্য রচিত। দেশে রচিত পাঠ্য কিতাবগুলোর মধ্যেও কিছু রয়েছে যার ক্ষেত্রে অনারবদের ভাষা শিক্ষা সিলেবাসের রূপরেখা যথাযথ অনুসরণ করা হয়নি বা তা অনুসরণ করা হলেও আমার জানামতে অধিকাংশই বাংলা ভাষায় আরবি শেখানো পদ্ধতির উপর নির্ভরশীল। আল-আরাবিয়্যাহ বাইনা ইয়াদায়কা কিতাবের লেখকদের প্রধান ব্যক্তি ড. আব্দুর রহমান বিন ইবরাহিম আল-ফাওযানকে প্রায় দশ বছর পুর্বে জিজ্ঞেস করেছি, আপনারা আরব দেশে অনারব ভাষাভাষীদের আরবি ভাষা শেখানোর জন্য তো কিতাব রচনা করেছেন, কিন্তু অনারব দেশে অনারব ভাষাভাষীদের আরবি ভাষা শেখানোর জন্য কোন কিতাব রচনা করেছেন কি? উত্তরে বলেছেন, না । এমনকি, আল-আরাবিয়্যাহ লিননাশিয়্যিন বা আল-আরাবিয়্যাহ বাইনা ইয়াদায়কা কিতাব অনারব দেশে পাঠ্য করে আরবি ভাষা শিক্ষাদানকে তিনি ভুল হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়েছেন। সুতরাং আমাদের অনারব ভাষাভাষী পরিবেশে আরবি ভাষা শিক্ষাদান করার জন্য মানানসই পাঠ্য কিতাব রচনায় উদ্ভাবনীর প্রয়োজনীয়তা অতি গুরুত্বপূর্ণ।

দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের আরবি শিক্ষার্থীদের কাছে আরবি ভাষা শিক্ষাকে আকর্ষণীয়, মানসম্পন্ন ও সহজসাধ্য করে তোলার জন্য ভাষা শেখানোর ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্ভাবনীর আলোকে আধুনিক প্রযুক্তির নির্ভর পদ্ধতি প্রয়োগ করা জরুরি। শুধুমাত্র গ্রামার ও নির্ধারিত পাঠ্য বিষয় মুখস্থ করা পদ্ধতি যথেষ্ট মনে না করা অপরিহার্য।

আরবি ভাষা শিক্ষক ভাষা শিক্ষাদানের এ মহান যাত্রায় কিতাব থেকে শুধু তথ্য সরবরাহকারীর ভূমিকায় না থেকে শিক্ষার্থীর মানসিক ও মেধার মান বিবেচনায় রেখে বৈচিত্রময় কৌশল প্রয়োগ করে ভাষা শিক্ষাদানে সহায়ক হিসেবে রূপান্তরিত হওয়া।

ভাষা শিক্ষায় ব্যবহৃত শিক্ষা উপকরণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা। যেমন: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (অও) ভার্চুয়াল (ঠজ) ইন্টারেক্টিভ পাঠ এর মতো উন্নত প্রযুক্তির সরঞ্জাম ব্যবহার করা। যা শিক্ষার্থীদেরকে ভাষাটি উপভোগ করার সুযোগ প্রদানে নিমগ্নকারী অভিজ্ঞতা প্রদান করবে।

শিক্ষার্থীদের এবং ভাষার মধ্যে গভীর সংযোগ তৈরি করতে এবং ভাষার প্রতি তাদের মানসিক বাধা ভেঙ্গে ফেলতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার অভিজ্ঞতাকে বাস্তব জীবনের প্রেক্ষাপটে, পুনরাবৃতি, কথোপকথন, যোগাযোগ ও ভার্চুয়াল পরিস্থিতির মাধ্যমে ভাষা চর্চায় শিক্ষার্থীদেরকে সক্রিয় রাখা।

ভাষা শেখানোর কৌশলে ইন্টারেক্টিভ, সহযোগিতামূলক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)) ভিত্তিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা। যা শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম, গ্রুপ আলোচনা, ল্যাঙ্গুয়েজ গেমস বা খেলাধুলার মাধ্যমে শিক্ষায় একে অপরের কাছ থেকে ভাষা শিখতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি আরবি কথোপকথন ও যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি করবে এবং আলাদা আলাদা শেখাকে এক চমৎকার উপভোগ্য সমষ্টিগত অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করবে। অন্যদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-যদিও এর কিছু নেতিবাচক রয়েছে- ভাষা অর্জন ত্বরান্বিত করতে প্রতিটি শিক্ষার্থীর স্তরের সাথে মানানসই বিষয়বস্তু তৈরিতে এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া প্রদানে ভূমিকা রাখবে।

উদ্ভাবনের প্রতি আরবি ভাষা শিক্ষায় সংশ্লিষ্ট সকলের তীব্র ইচ্ছা ও আগ্রহ থাকা জরুরি প্রয়োজন। তাহলেই আরবি ভাষা শিক্ষার জন্য গুণগত মানের সিলেবাস ও মানানসই পাঠ্য কিতাব তৈরিতে উদ্ভাবনী দিগন্ত পাওয়া যাবে। আধুনিক পদ্ধতি ও কৌশলসমূহে প্রযুক্তি ভিত্তিক পাঠদানকারী শিক্ষক হওয়ার জন্য স্বউন্নয়নের সক্ষমতা দিবে এবং ভাষাগত দক্ষতাসম্পন্ন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ার কারিগরে রূপান্তরিত করবে। বিশ্ব আরবি ভাষা দিবস উৎযাপনে এবারের প্রতিপাদ্য বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশে পবিত্র কুরআনের ভাষা শিক্ষা, চর্চা ও প্রসারের মাধ্যমে আরবি ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধির করতে এবং আরও অধিক অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাষাগত ভবিষ্যৎ গঠন করতে একনিষ্ঠ ভূমিকা রাখার জন্য আরবি ভাষা প্রেমিকদের বিশেষ আহ্বান জানাই।

পরিশেষে, প্রত্যাশা থাকবে উদ্ভাবনী দিগন্তের এ প্রযুক্তি আমাদের শিক্ষার্থীদের অর্জিত আরবি ভাষাদক্ষতা কুরআন-হাদীস বুঝা, বাস্তব জীবনের পরিস্থিতিতে ভাষার ব্যবহার ও সাংস্কৃতিক বোঝাপড়ায় পারদর্শী করবে এবং পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক স্থাপনের সেতুতে রূপান্তরিত করবে।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক।