মুহাম্মদ আবুল হুসাইন

সংস্কৃতি জনগণের জীবনধারা, মূল্যবোধ ও বিশ্বাসকে ধারণ করে, যা রাজনৈতিক প্রতিরোধের প্রেরণা জোগায়, এবং যখন এই সংস্কৃতি হুমকির মুখে পড়ে, তখনই মানুষ রাজনৈতিক মুক্তির জন্য রুখে দাঁড়ায়। আর স্বকীয়তা (Authenticity/ Individuality) মানে নিজের বৈশিষ্ট্য, গুণ ও সত্তাকে চেনা ও প্রকাশ করা, যা আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা বাড়ায়। সুতরাং সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা (Cultural Identity) বলতে বোঝায় একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী বা জাতির নিজস্ব ঐতিহ্য, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, রীতিনীতি, শিল্পকলা, পোশাক-পরিচ্ছদ ও জীবনযাপনের ধরন, যা তাদের অন্যদের থেকে আলাদা করে এবং তাদের আত্মপরিচয়ের ভিত্তি তৈরি করে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বাহিত হয় ও সময়ের সাথে বিকশিত হয়। এটি একটি জাতির মৌলিক বৈশিষ্ট্য যা তার জনগণের আচরণ ও চেতনায় প্রতিফলিত হয়।

সংস্কৃতি শুধু ভাষাকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে না। একটি জনগোষ্ঠির সংস্কৃতিতে তাদের জীবনবোধ তথা ধর্মের প্রভাবও অত্যন্ত গভীর ও ব্যাপক; ভাষা সংস্কৃতির বাহন হতে পারে কিন্তু তার প্রাণচাঞ্চল্য মানুষের বোধ-বিশ্বাসকে ধারণ করেই গড়ে ওঠে। ধর্ম মানুষের মূল্যবোধ, আচার-আচরণ, শিল্পকলা, সাহিত্য, সামাজিক কাঠামো এবং জীবনযাপনের পদ্ধতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে, যেমন-ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে সৃষ্ট উৎসব (ঈদ, পূজা), স্থাপত্য (মসজিদ, মন্দির), নৈতিকতা এবং সামাজিক বন্ধন তৈরি করে, যা একটি সমাজের স্বতন্ত্র পরিচয়ের ভিত্তি স্থাপন করে। এটি কেবল বিশ্বাস নয়, বরং একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান যা ঐক্য, শৃঙ্খলা এবং জীবনের অর্থ প্রদান করে, যা সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ ও সংজ্ঞায়িত করে। যেমন-পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতীয় সংস্কৃতিও শুধু ভাষাকে আশ্রয় করেই বিকশিত হয়নি; সেখানকার সংস্কৃতিতেও ধর্মের প্রভাব গভীরভাবে প্রোথিত। এটি শুধু জীবনযাপনের পদ্ধতি নয়, বরং সামাজিক কাঠামো (যেমন বর্ণপ্রথা), উৎসব (দুর্গাপূজা), শিল্পকলা, স্থাপত্য (তাজমহল), ভাষা ও নীতিবোধকে (ভক্তি আন্দোলন, সুফিবাদ) প্রভাবিত করেছে। একইভাবে ইউরোপীয় সংস্কৃতিতে ধর্মের প্রভাব সুগভীর, বিশেষত খ্রিস্টধর্ম ইউরোপের সমাজ, শিল্পকলা, শিক্ষা, আইন ও নৈতিকতার ভিত্তি স্থাপন করেছে, যা মধ্যযুগীয় ক্যাথেড্রাল থেকে রেনেসাঁসের শিল্পকর্মে প্রতিফলিত হয়েছে এবং আজও ইউরোপীয় পরিচয় ও মূল্যবোধে তার প্রভাব বিদ্যমান। ইউরোপে শিল্প, স্থাপত্য, সাহিত্য, দর্শন, সঙ্গীত, লোককাহিনী, ধর্ম, এবং ঐতিহাসিক স্থান (যেমন স্টোনহেঞ্জ, গথিক ক্যাথেড্রাল) ও প্রথার এক বিশাল ও বৈচিত্র্যময় সমাহার নিয়ে গড়ে উঠেছে তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা হাজার বছরের ইতিহাস, গ্রিক-রোমান সভ্যতা, রেনেসাঁ, আলোকায়নের মতো যুগ থেকে গড়ে উঠেছে এবং আধুনিক ইউরোপের ভিত্তি তৈরি করেছে। এটি কেবল ভবন বা শিল্পকর্ম নয়, বরং জ্ঞান, প্রথা, ভাষা ও ঐতিহ্যর এক উত্তরাধিকার যা ইউরোপীয়দের মধ্যে ঐক্য ও পরিচয়ের অনুভূতি তৈরি করে। এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বা স্বকীয়তা নিয়ে তাদের মধ্যে কোন হীনমন্যতা নেই।

ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় গুরু পোপ ফ্রান্সিস মারা যাওয়ায় বিবিসি, সিএনএন, নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট সবার প্রথম পেইজে লিড নিউজ এটা। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী, আমেরিকার রাষ্ট্রপতি, কানাডার প্রধানমন্ত্রী, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট-সবাই শোক জানাচ্ছেন, স্মৃতিচারন করছেন। এ নিয়ে কারো মধ্যে কোন কুণ্ঠা নেই, হীনমন্যতা নেই। এসব পত্রিকা খুললে আপনার মনে হবে পুরো ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড মূলত খ্রিস্টান ওয়ার্ল্ড, সেকুলারিজমের নামগন্ধ নাই কোথাও! এইটাই স্বাভাবিক। মানুষের সমাজ আর সভ্যতা ধর্ম থেকে বিযুক্ত না। কয়েকশো বছরের সেকুলারিজম চর্চার পরও পুরো পাশ্চাত্য দিনের শেষে খ্রিস্টান ওয়ার্ল্ড, তাদের বছরের বড় আনন্দ উৎসব ক্রিসমাস।

শুধু আমাদের দেশের কিছু সেকুলার এবং ছায়ানট, উদীচীর মত কিছু প্রতিষ্ঠান মনে করে আমাদের সমাজে রাজনীতিতে সংস্কৃতিতে ইসলাম থাকতে পারবে না! এই হীনমন্যতা কেন? আমাদের ধর্ম আমাদের জীবনবোধ ও সংস্কৃতির অনিবার্য অনুষঙ্গ। সুতরাং আমাদের সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি বিনির্মাণে এর প্রভাব থাকবে এইটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সংস্কৃতির নামে যারা আধিপত্যবাদের এজেন্ট হয়ে কাজ করছেন তারা আমাদের ধর্মীয় সিম্বলকে সব সময় সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতা বলে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করে। তারা নানা কৌশলে বাঙালি সংস্কৃতি ও প্রগতিশীল চেতনার নামে বাংলাদেশে পশ্চিমবঙ্গের পৌত্তলিক সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলেও এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে খারিজ করে দিতে অত্যন্ত সচেষ্ট। আমাদের উদ্বেগের জায়গাটা এখানেই। কারণ, তারা আমাদের স্বকীয়তাবোধকে নষ্ট করতে চায়। অথচ স্বকীয়তাবোধই হলো স্বাধীনতাবোধের ভিত্তিভূমি। সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা (Cultural Identity) রাজনৈতিক স্বাধীনতার শিকড় বা মূল ভিত্তি। কারণ এটি জনগণের মধ্যে ঐক্য, চেতনা ও স্বাতন্ত্র্যবোধ জাগিয়ে তোলে, যা একটি জাতিরাষ্ট্রের আত্মপরিচয়ের ভিত্তিকে শক্তিশালী করে। বিশেষ করে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন যখন রাজনৈতিক আধিপত্যবাদের হাতিয়ার হয়ে উঠছে তখন সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা বজায় রাখা রাজনৈতিক স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রয়োজনেই অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কারণ আধিপত্যবাদী শক্তি সব সময় সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে। যখন সরাসরি রাজনৈতিক আগ্রাসন চালানো সম্ভব হয় না তখনই কৌশল হিসেবে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে বেছে নেয়া হয়।

সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ভিত্তি, যা মানুষের মূল্যবোধ, ভাষা, ঐতিহ্যের মাধ্যমে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে, শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে প্রেরণা জোগায়। অন্যদিকে হীনমন্যতা (Inferiority Complex) হলো নিজেকে অপরের চেয়ে কম যোগ্য, অপর্যাপ্ত বা অযোগ্য ভাবা, যা আত্মসম্মান কমিয়ে দেয় এবং অন্যদের অনুকরণে বাধ্য করে। স্বকীয়তা যেখানে ‘আমি যেমন আছি’ সেভাবেই নিজেকে গ্রহণ করতে শেখায়, হীনমন্যতা সেখানে ‘অন্যের মতো হওয়ার’ প্রবণতা তৈরি করে, ফলে ব্যক্তি নিজের স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে। সুতরাং আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে অক্ষুন্ন ও অটুট রাখতে হলে সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা জোরদার করা অপরিহার্য।

লেখক : সাংবাদিক।