তামান্না ইসলাম

এক কেজি আলুর দাম ৭ টাকা (উত্তরবঙ্গে) । অথচ একজন পুরুষ কৃষিশ্রমিকের দিনমজুরি প্রায় ৭০০ টাকা। দুই বিঘা জমিতে উৎপাদিত আলু বিক্রি করেও অনেক কৃষক সেই শ্রমিকের মজুরি পর্যন্ত মেটাতে পারছেন না। মাঠে ফসল আছে, গোলা ভরা আলু আছে- কিন্তু কৃষকের মুখে হাসি নেই। বরং আছে হতাশা, দুশ্চিন্তা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা।

আলু চাষ বহু বছর ধরে কৃষকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের জেলা- রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, জয়পুরহাট, ঠাকুরগাঁও- এসব এলাকায় আলু চাষ কৃষকদের জীবিকার বড় ভরসা।বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ মাঠে এখন আলুর মৌসুম শেষের পথে। কিছুদিন আগেও যেসব মাঠ সবুজ পাতায় ভরে ছিল, সেখানে আলুর বস্তা সারি সারি করে সাজানো। কিন্তু সেই বস্তাগুলো যেন কৃষকের পরিশ্রমের নয়, বরং তার লোকসানের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশে আলু অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্য। ভাতের পর অনেক মানুষের কাছে আলুই দ্বিতীয় প্রধান খাবার। ফলে আলুর চাহিদা সব সময়ই থাকে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো- চাহিদা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় কৃষক ন্যায্য দাম পান না।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এক কেজি আলু উৎপাদনে গড়ে প্রায় ১৭ থেকে ২২ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। কিন্তু অনেক সময় কৃষক সেই আলু বিক্রি করতে বাধ্য হন ৭ থেকে ১০ টাকার মধ্যে। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে প্রায় অর্ধেকেরও বেশি লোকসান গুনতে হয়।এই লোকসান শুধু একটি মৌসুমের নয়,অনেক কৃষকের জন্য এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কৃষিকাজ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। জমি প্রস্তুত করা, উন্নত বীজ কেনা, সার ও কীটনাশক ব্যবহার, সেচ দেওয়া-সবকিছুতেই খরচ বেড়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিকের মজুরি। একসময় যে কাজগুলো পরিবার বা গ্রামের মানুষ মিলে করত, এখন তার জন্য আলাদা শ্রমিক নিয়োগ করতে হয়। ফলে একজন কৃষক যখন আলু চাষ করেন, তখন শুরু থেকেই তাকে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। যেমন- দুই বিঘা জমিতে আলু চাষ করতে একজন কৃষকের হাজার হাজার থেকে লক্ষাধিক টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে- বীজ, সার, সেচ, শ্রমিক, পরিবহন- সব মিলিয়ে। কিন্তু ফসল বিক্রি করে সেই খরচের অর্ধেকও যদি না ওঠে, তাহলে কৃষকের অবস্থা কী দাঁড়ায়, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে আলুর উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে আলুর উৎপাদন এক কোটিরও বেশি টনে পৌঁছেছে। উৎপাদন বাড়া অবশ্যই একটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু সমস্যা হলো-এই অতিরিক্ত উৎপাদনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজারব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। যখন একসাথে বিপুল পরিমাণ আলু বাজারে আসে, তখন সরবরাহ বেড়ে যায় এবং দাম দ্রুত পড়ে যায়। ফলে কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে আলু বিক্রি করেন।একদিকে উৎপাদন বাড়ছে, অন্যদিকে কৃষকের আয় কমছে- এই বৈপরীত্যই আজকের বড় সংকট।

গ্রামের মাঠে যে আলু ৭ বা ৮ টাকায় বিক্রি হয়, সেই একই আলু শহরের বাজারে গিয়ে অনেক সময় ২০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হয়। প্রশ্ন হলো এই বাড়তি টাকা কোথায় যায়? এর বড় অংশই যায় মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালদের হাতে। কৃষক সাধারণত সরাসরি শহরের বাজারে আলু বিক্রি করতে পারেন না। তিনি স্থানীয় পাইকার বা আড়তদারের কাছে আলু বিক্রি করেন। এরপর সেই আলু বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে খুচরা বাজারে পৌঁছায়।এই পুরো প্রক্রিয়ায় কৃষক সবচেয়ে কম দাম পান, অথচ উৎপাদনের পুরো ঝুঁকিটাই তাকে নিতে হয়।

আলুর দাম কমে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো সংরক্ষণ সমস্যাও। দেশে অনেক কোল্ড স্টোরেজ থাকলেও সব কৃষক সেখানে আলু রাখতে পারেন না। কারণ কোল্ড স্টোরেজে আলু রাখতে হলে ভাড়া দিতে হয়, যা অনেক কৃষকের পক্ষে দেওয়া কঠিন। ফলে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে মৌসুমের শুরুতেই আলু বিক্রি করে দেন। এতে বাজারে একসাথে প্রচুর আলু চলে আসে এবং দাম আরও কমে যায়।যদি সংরক্ষণব্যবস্থা আরও সহজ ও সাশ্রয়ী হতো, তাহলে কৃষক সময়মতো ভালো দামে আলু বিক্রি করার সুযোগ পেতেন।

তবে বাস্তবতা হলো- এই সংকট শুধু আলুর ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের কৃষক প্রায় প্রতিটি মৌসুমি ফসলেই একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হন। কখনো টমেটো বা বাঁধাকপির দাম এত কমে যায় যে কৃষক বাজারে না নিয়ে জমিতেই ফসল ফেলে রাখেন। কখনো দেখা যায়, টমেটো বিক্রি করার চেয়ে গরুকে খাওয়ানোই সহজ হয়ে যায়। আবার কখনো ধান বা গমের দাম উৎপাদন খরচের তুলনায় এত কম থাকে যে কৃষক প্রকৃত লাভের মুখ দেখেন না। এই পরিস্থিতি কৃষকের মনে ধীরে ধীরে হতাশা তৈরি করছে। বছরের পর বছর লোকসানের অভিজ্ঞতা অনেক কৃষককে কৃষিকাজ থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের কৃষক শুধু অর্থনৈতিক কারণে চাষাবাদ করেন না, জমির সঙ্গে তাদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ফসল ফলানো তাদের জীবনের অংশ। কিন্তু যখন বছরের পর বছর লোকসান হয়, তখন সেই সম্পর্কও দুর্বল হয়ে যায়। অনেক কৃষক এখন বলতে শুরু করেছেন-এভাবে চলতে থাকলে তারা আর আলু চাষ করবেন না। কেউ কেউ অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকছেন, আবার কেউ কৃষিকাজ ছেড়ে শহরে কাজ খুঁজতে যাচ্ছেন।যদি এই প্রবণতা বাড়তে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে দেশের কৃষি খাত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

এই সংকটের মধ্যেও সমাধানের পথ অবশ্যই থাকবে যদি সঠিক সময়ে সঠিক পরিকল্পনা নেওয়া যায়। প্রথমত, কৃষকের জন্য ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। সরকার যদি সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে আলু কিনে, তাহলে বাজারে একটি স্থিতিশীল দাম তৈরি হবে।

দ্বিতীয়ত, আলু প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তুলতে হবে। চিপস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, আলুর গুঁড়া- এসব পণ্যের চাহিদা দেশে ও বিদেশে অনেক বেশি। এসব শিল্প বাড়লে অতিরিক্ত আলুর ব্যবহারও বাড়বে।

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারে আলু রপ্তানির সুযোগ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশে উৎপাদিত আলুর মান অনেক ক্ষেত্রে ভালো। সঠিক বিপণন ও মাননিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিদেশে বড় বাজার তৈরি করা সম্ভব।

চতুর্থত, কোল্ড স্টোরেজ ব্যবস্থাকে কৃষকবান্ধব করতে হবে- যাতে ছোট কৃষকরাও সহজে সেখানে আলু সংরক্ষণ করতে পারেন।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির ভূমিকা এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষকের বিকল্প নেই। কিন্তু সেই কৃষক যদি প্রতিনিয়ত লোকসানের মুখে পড়েন, তাহলে কৃষির ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।আজ শহরের মানুষ হয়তো কম দামে আলু কিনে খুশি। কিন্তু সেই কম দামের পেছনে যে একজন কৃষকের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম আর কষ্ট লুকিয়ে আছে, তা আমরা অনেক সময় বুঝতে পারি না।আলুর দামে পোড়া কৃষকের স্বপ্ন যেন আজ নীরব প্রতিবাদের মতো দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের মাঠে মাঠে। গোলা ভরা ফসল থাকলেও কৃষকের ঘরে নিশ্চিন্ত ঘুম নেই। এই পরিস্থিতিতে অনেক কৃষকের জন্য সামনের ঈদ যেন আনন্দের উৎসবের চেয়ে বাস্তবতার কঠিন হিসাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।

৭ টাকা কেজির আলু দিয়ে যখন ৭০০ টাকার শ্রমিকের মজুরি মেটানো যায় না, তখন প্রশ্নটা আরও তীব্র হয়ে ওঠে-

বাংলার কৃষক আর কতদিন লোকসানে চাষ করবে? এই প্রশ্ন কৃষকের পুরো দেশের কাছে। কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, আর কৃষি বাঁচলেই টিকে থাকবে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতি।

এই বাস্তবতার প্রেক্ষিতে নতুন সরকার কাঠামোর কাছে একটি আন্তরিক অনুরোধ রয়ে যায়- দেশের কৃষকদের দিকে আরও গভীরভাবে নজর দেওয়া হোক। মাঠে যারা দিনরাত পরিশ্রম করে দেশের খাদ্য চাহিদা নিশ্চিত করেন, তাদের ন্যায্য অধিকার ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন।

লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।