রিয়াদ হোসেন
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জনপদ দীর্ঘকাল ধরে নানাবিধ সমস্যা ও সংকটের সম্মুখীন হয়ে আসছে। একের পর পর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বছরজুড়ে তীব্র খাবার পানির সংকট, বেড়িবাঁধ ভাঙনে দীর্ঘমেয়াদী পানিবদ্ধতাসহ নানা বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে তারা। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে এসব সংকট দিনদিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে। একটা সময় পর এখানে বসবাসরত পরিবারগুলো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে স্থানান্তর হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চল থেকে তারা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে কাজের খোঁজে তারা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরে গিয়ে বসবাস করছে। এতে শহরের নিরাপত্তাসহ অবকাঠামোগত নানা অসুবিধা তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি যেসব পরিবার বাস্তুচ্যুত হচ্ছে তারাও তাদের নাগরিক অধিকার থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছে। কারণ তারা উপকূলের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের নাগরিক হওয়ায় অন্য কোথাও গিয়ে নাগরিক অধিকার সংক্রান্ত পরিষেবাগুলো পাচ্ছে না। আর ভোটার আইডি কার্ড স্থানান্তর করতেও নানা জটিলতায় পড়ছে। এভাবে উপকূলীয় জনপদের মানুষ বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে দুর্গতির জীবন-যাপন করছে।
এজন্য তাদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানো খুব জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছরের পর বছর উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের দুঃখের কথা নীতিনির্ধারণী মহলে উঠে আসলেও প্রতিবারই তা কেবল প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। স্বল্প মেয়াদী উন্নয়ন প্রকল্পে উপকূলীয় মানুষের জীবনযাত্রার মানের কোনো গুণগত পরিবর্তন হয়নি। বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারের পরিবর্তন হলেও তাদের সমস্যাগুলো স্থায়ী হয়ে ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। এজন্য আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উপকূলীয় জনপদ থেকে যারা সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করবেন তাদের এসব সমস্যা নিয়ে কাজ করতে হবে। আর তার জন্য তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে উপকূল সুরক্ষার যাবতীয় পদক্ষেপগুলো রাখতে হবে। উপকূলে টেকসই বেড়িবাঁধ, সুপেয় খাবার পানি নিশ্চিত, সুন্দরবন সুরক্ষা এবং সার্বিকভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ সকল সংকট নিরসনে জনগনের দাবিদাওয়াগুলো ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
সচারাচর দেখা যায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচন বা উপজেলা কিংবা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যারা ভোট করতে আসেন তারা বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন। তাদের ইশতেহারে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, সেতু নির্মাণ, বেকারত্ব দূরীকরণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবার মান বাড়ানোর কথা উল্লেখ থাকে। বিশেষ করে ভোটারদের মন জয় করতে বা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে তারা এমন অনেক প্রতিশ্রুতি দেন। অনেকে আবার বাড়িয়ে বাড়িয়ে অতিরঞ্জিত কথাবার্তাও এরমধ্যে তুলে ধরেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, তারা একবার নির্বাচিত হওয়ার পর সবকিছু ভুলে যান। নির্বাচনের আগে তারা যেসব কর্মপরিকল্পনা সাধারণ ভোটারদের সামনে উপস্থাপন করেছিলেন সে অনুযায়ী তারা কোন কাজই করে না।
ফলে সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন বাঁধাগ্রস্ত হয়। আমরা দেখেছি, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাতক্ষীরার শ্যামনগর-আশাশুনি, বাগেরহাটের শরণখোলা-মোংলা এবং খুলনার পাইকগাছা-কয়রা উপজেলায় বসবাসরত নাগরিকরা সবচেয়ে বেশি জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর প্রায় ৫ লাখ মানুষ উপকূলীয় অঞ্চল থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। যাদের অধিকাংশ পরিবার এখনো নিজ গ্রামে ফিরতে পারিনি। অনেক পরিবারের আর ফেরার সম্ভবনাও নেই। পৈত্রিক বসতবাড়ি হারিয়ে তারা অনেকটা যাযাবরের মতো জীবন-যাপন করছে।
এজন্য এ অঞ্চলে যারা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনপ্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে আসবেন তাদেরকে শুধু রাস্তাঘাট বা অবকাঠামো উন্নয়নে জোর দিলে হবে না বরং এখানকার সমস্যা, সংকটের দিকে তাকিয়ে ইশতিহার তৈরী করতে হবে। দেশের অনান্য আসনের মতো গতানুগতিক বিষয় যেন ইশতিহারে অন্তর্ভুক্ত না হয় সেটা খেয়াল করতে হবে। তাদের ইশতেহারে থাকতে হবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সচেতনতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা দূরীকরণ, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণসহ জলবায়ু উদ্বাস্তু ঠেকাতে করণীয় মতো আলোচ্য বিষয়। পাশাপাশি নির্বাচনী পোস্টার বা লিফলেটের মধ্যে তাদের প্রতিশ্রুতিগুলো যাতে সীমাবদ্ধ না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। ইশতেহার অনুযায়ী ভুক্তভোগী জনগণকে সাথে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সময়মতো কাজের বাস্তবায়নও করতে হবে।
আমাদের দেশের বিরাট সংখ্যক জনগোষ্ঠী উপকূলে বসবাস করে তাই একবারে বা স্বল্প সময়ের মধ্যে তাদের সকল সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে না। এজন্য সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে ধীরে ধীরে সব সংকট কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করতে হবে। আমরা জানি, আমাদের দেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন পাঁচ বছরের জন্য অনুষ্ঠিত হয়। সেক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিরা যদি তাদের ইশতেহারে সমস্যাগুলো বছর ভিত্তিক ভাগ করে ফেলে তাহলে কাজ করতে সুবিধা হবে। এখানে বুঝতে হবে কোন কোন কাজ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। সেই কাজগুলো সময়সীমা নির্ধারণ করে একের পর এক করে যেতে হবে। তাদের ইশতেহারে শুধু পরিকল্পনা নয়, প্রতিটি কাজের মাসিক বা ত্রৈমাসিক অগ্রগতি সম্পর্কে জনগনের সাথে বসে আলোচনার জায়গাটি অন্তর্ভুক্ত রাখতে হবে। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। তবে সার্বিক দিক বিবেচনায় বলা যায়, উপকূলীয় আসনের প্রার্থীরা যদি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে উপকূলীয় অঞ্চলের সুরক্ষা ও উন্নয়নের জন্য উপকূলীয় উন্নয়ন বোর্ড গঠনের কথা উল্লেখ করে তাহলে বাকি কাজগুলো করা অনেক সহজ হয়ে যাবে।
কারণ এর মধ্যে দিয়েই ছোট-বড় অনেক সংকট থেকে বেরিয়ে আসা যাবে। পাশাপাশি আমাদের বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে গেছে। এ বিষয়টি অবশ্যই ইশতেহারের ভিতরে রাখতে হবে। কারণ উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষায় সুন্দরবন অনস্বীকার্য ভূমিকা পালন করে থাকে। এ জনপদের মানুষ যেহেতু সুন্দরবনের ওপর জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে থাকে; সেহেতু তাদের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থার কথা উল্লেখ থাকতে হবে। তাহলে সুন্দরবনের ওপর চাপ কমলে, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় থাকবে। আমাদের জোর দাবি থাকবে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উপকূলীয় আসন থেকে যেসব প্রার্থী ভোটের মাঠে আসবে তারা যেন উপকূলকে বাঁচাতে একটি মোটা দাগের ‘উপকূল সুরক্ষা কর্মপরিকল্পনা’ ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করে এবং নির্বাচন পরবর্তী সেসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে জোরালো ভূমিকা রাখে।
লেখক : শিক্ষার্থী, সরকারি বিএল কলেজ, খুলনা।