মুঃ শফিকুল ইসলাম

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের সাম্প্রতিক মন্তব্যটি নিছক কোনো সমালোচনা নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা এক গভীর কাঠামোগত সংকটের দিকেই আঙুল তুলেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের তুলনায় আমলাতন্ত্রের একটি অংশ অধিক প্রভাবশালী এই মন্তব্য রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা-কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

সম্প্রতি রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে এক সংবাদিক সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দেওয়া এই বক্তব্য বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ অন্তর্বর্তী সরকার মূলত একটি রূপান্তরকালীন ব্যবস্থাপনা যার প্রধান দায়িত্ব নির্বাচন, প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সঠিক পথে ফেরানো। কিন্তু সেই সরকারের সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা যদি আমলাতন্ত্রের প্রভাববলয়ে আটকে পড়ে, তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রকৃত কর্তৃত্ব কোথায় অবস্থান করছে—সে প্রশ্ন অবধারিতভাবেই উঠে আসে।

আমলাতন্ত্রের শক্তি : প্রশাসনের অদৃশ্য কেন্দ্র : বাংলাদেশে আমলাতন্ত্র ঐতিহাসিকভাবে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। ঔপনিবেশিক আমলে গড়ে ওঠা প্রশাসনিক কাঠামো স্বাধীনতার পরও অনেকাংশে অপরিবর্তিত থেকে গেছে। জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকার আসা-যাওয়া করলেও প্রশাসনের স্থায়ী কাঠামো রয়ে গেছে একই জায়গায়। এই স্থায়িত্বই একদিকে যেমন রাষ্ট্র পরিচালনায় ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে, অন্যদিকে তা কখনো কখনো রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী কর্তৃত্বকে ছাপিয়ে যায়।

ড. ইফতেখারুজ্জামানের বক্তব্যে যে “আমলাতন্ত্রের একটি অংশ” কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি পুরো প্রশাসনকে অভিযুক্ত করে না, বরং সেই অংশটির দিকে ইঙ্গিত করে যারা নীতিনির্ধারণ, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন কিংবা তথ্য প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কার্যত রাষ্ট্রক্ষমতার চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।

অন্তর্বর্তী সরকার : কর্তৃত্ব না ব্যবস্থাপনা? : অন্তর্বর্তী সরকার মূলত একটি সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সমঝোতার ফল। এর উপদেষ্টারা নির্বাচিত নন, বরং গ্রহণযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে নিয়োজিত। ফলে এই সরকারের নৈতিক ও রাজনৈতিক বৈধতা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নয়, বরং আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।

এই বাস্তবতায় যদি আমলাতন্ত্রের একটি অংশ উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা কেবল ‘ব্যবস্থাপক’ পর্যায়ে সীমিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। নীতিনির্ধারণের পরিবর্তে তারা তখন প্রশাসনিক ফাইল চালাচালির মধ্যে আটকে যায়, আর প্রকৃত ক্ষমতা থাকে অদৃশ্য কাঠামোর হাতে।

জবাবদিহির সংকট ও গণতান্ত্রিক ঝুঁকি : আমলাতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জবাবদিহির সীমাবদ্ধতা। নির্বাচিত সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করে, সংসদের মুখোমুখি হয়, গণমাধ্যমের প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। কিন্তু প্রশাসনের স্থায়ী অংশের ক্ষেত্রে এই জবাবদিহি তুলনামূলকভাবে দুর্বল।

যখন একটি অন্তর্বর্তী সরকার দুর্বল রাজনৈতিক ভিত্তির কারণে আমলাতন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সেই জবাবদিহির ঘাটতি আরও প্রকট হয়। সিদ্ধান্ত হয়, কিন্তু সিদ্ধান্তের দায় কার সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মেলে না। এতে গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

টিআইবির সতর্কবার্তা : সময়োপযোগী না উপেক্ষণীয়? : টিআইবি দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা নিয়ে কাজ করে আসছে। তাদের পর্যবেক্ষণকে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে খাটো করার সুযোগ নেই। বরং এই মন্তব্যকে একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা উচিত যা রাষ্ট্রের ক্ষমতা ভারসাম্য ঠিক না থাকলে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, সে বিষয়ে আগাম সতর্ক করে।

এই বক্তব্য উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতে আরও বড় আকারে প্রশাসনিক কর্তৃত্ব বনাম রাজনৈতিক দায়িত্বের দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতা অনেকাংশেই নির্ভর করবে তারা কতটা দৃঢ়ভাবে নীতিগত নেতৃত্ব দিতে পারে এবং আমলাতন্ত্রকে সাংবিধানিক সীমার মধ্যে রাখতে পারে।

করণীয় : ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন : এই প্রেক্ষাপটে কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত জরুরি প্রথমত, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদকে নীতিগত বিষয়ে আরও দৃশ্যমান ও সক্রিয় হতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নেতৃত্ব না থাকলে সেই শূন্যস্থান স্বাভাবিকভাবেই অন্য কেউ পূরণ করবে।

দ্বিতীয়ত, আমলাতন্ত্রের ভেতরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া যত স্বচ্ছ হবে, প্রভাব খাটানোর সুযোগ তত কমবে।

তৃতীয়ত, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে আরও সচেতন ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা শনাক্ত ও প্রকাশ করা গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য।

উপসংহার : ড. ইফতেখারুজ্জামানের মন্তব্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি গভীর অসুখের উপসর্গ। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ে আমলাতন্ত্রের একটি অংশ যদি সত্যিই বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, তাহলে তা শুধু একটি সরকারের সমস্যা নয়তা পুরো গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্যই একটি সতর্ক সংকেত।

রাষ্ট্র পরিচালনায় আমলাতন্ত্র অপরিহার্য, কিন্তু চূড়ান্ত কর্তৃত্ব থাকতে হবে নীতিনির্ধারক ও জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী কাঠামোর হাতে। সেই ভারসাম্য হারালে গণতন্ত্র দুর্বল হয়, জবাবদিহি ঝাপসা হয় এবং রাষ্ট্র ধীরে ধীরে জনগণ থেকে দূরে সরে যায়। টিআইবির এই বক্তব্য সেই বিপদের দিকেই আমাদের দৃষ্টি ফেরাচ্ছে এখন দেখার বিষয়, রাষ্ট্র ও সমাজ সেই সতর্কবার্তা কতটা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে।

লেখক : প্রাবন্ধিক।