ঢাকা-স্বপ্নের শহর, কর্মসংস্থানের শহর, আবার একই সঙ্গে ভোগান্তির শহর। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই শহরের সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্য হলো যানজট। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী, ব্যবসায়ী-সবাই কোনো না কোনোভাবে এই যানজটের শিকার। প্রশ্ন হলো, রাজধানীতে এত যানজট কেন? আমরা কি উন্নয়ন করছি, নাকি কেবল অব্যবস্থাপনাকে বড় করছি? উন্নয়নের নামে ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে-সবই হচ্ছে, তবু কেন যানজট কমছে না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আমাদের আজকের আলোচনা-রাজধানীতে যানজট: উন্নয়ন না ব্যবস্থাপনার সংকট।

রাজধানীর যানজট : একটি নিত্যদিনের বাস্তবতা : ঢাকার রাস্তায় বের হলেই বোঝা যায়, যানজট এখন আর বিশেষ কোনো ঘটনা নয়-এটা নিত্যদিনের সঙ্গী। সকাল আটটা থেকে অফিস সময়, দুপুরে স্কুল ছুটি, সন্ধ্যায় অফিস ফেরা-প্রায় সারাদিনই রাস্তা যেন স্থবির। কখনো একটি সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ২০-৩০ মিনিট, কখনো আবার অল্প দূরত্ব পাড়ি দিতে লেগে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

এই যানজট শুধু সময় নষ্ট করে না, বরং মানুষের মানসিক চাপ, শারীরিক ক্লান্তি ও আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একজন শিক্ষার্থী ক্লাসে দেরি করে, একজন রোগী সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারে না, একজন শ্রমজীবী মানুষ কাজ হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে।

উন্নয়নের ছোঁয়া : আমরা কী কী করেছি : গত এক দশকে রাজধানীতে দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়েছে-এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, নতুন রাস্তা সম্প্রসারণ-সবই উন্নয়নের অংশ।

মেট্রোরেল চালুর ফলে কিছু রুটে যাতায়াত সময় কমেছে, মানুষ স্বস্তি পেয়েছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে বিমানবন্দর থেকে শহরের এক অংশে দ্রুত যাতায়াত সম্ভব হচ্ছে। কাগজে-কলমে এসব উন্নয়ন যানজট কমানোরই কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

কারণ উন্নয়ন যদি পরিকল্পিত ও সমন্বিত না হয়, তাহলে সেটি সমস্যার সমাধান না হয়ে উল্টো নতুন সমস্যা তৈরি করে।

ব্যবস্থাপনার অভাব : মূল সংকট কোথায় : রাজধানীর যানজটের সবচেয়ে বড় কারণ হলো দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। উন্নয়ন কাঠামো থাকলেও সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়নি।

১. ট্রাফিক আইন প্রয়োগের দুর্বলতা : ঢাকার রাস্তায় ট্রাফিক আইন প্রায়ই উপেক্ষিত। যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্কিং, ইউটার্নে অবৈধ ঘুরে যাওয়া, সিগন্যাল না মানা-এসব নিত্যদিনের ঘটনা। আইন থাকলেও প্রয়োগ না হলে সেটি কেবল কাগজে বন্দি থাকে।

২. সড়কের অপ্রতুল ব্যবহার : অনেক জায়গায় রাস্তার একাংশ দখল করে দোকান, হকার বা নির্মাণসামগ্রী রাখা হয়। এতে রাস্তার প্রকৃত প্রস্থ কমে যায় এবং যান চলাচল ব্যাহত হয়।

৩. সমন্বয়হীন উন্নয়ন : এক জায়গায় রাস্তা খোঁড়া হচ্ছে, আরেক জায়গায় ড্রেন নির্মাণ সবকিছু আলাদা সংস্থা আলাদা সময়ে করছে। কোনো সমন্বয় নেই। ফলে একটি রাস্তা সারাতে সারাতেই আবার ভেঙে ফেলা হচ্ছে।

জনসংখ্যার চাপ ও যানবাহনের সংখ্যা : ঢাকার আরেক বড় সমস্যা হলো অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও যানবাহন। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ কাজের সন্ধানে রাজধানীতে আসছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা।

একটি পরিবারের একাধিক গাড়ি থাকাটা এখন অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু রাস্তা তো আর সে অনুযায়ী বাড়েনি। ফলে সীমিত রাস্তায় অতিরিক্ত গাড়ির চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

গণপরিবহন ব্যবস্থা : দুর্বলতা ও বিশৃঙ্খলা : রাজধানীতে গণপরিবহন ব্যবস্থার মান অত্যন্ত নিম্নমানের। বাসগুলো নির্দিষ্ট স্টপেজ মানে না, যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানামা করায়। অনেক বাস প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ে।

বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজিংয়ের কথা বহুবার শোনা গেলেও বাস্তবে তার পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে বিশৃঙ্খল বাস চলাচল যানজটকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

উন্নয়ন প্রকল্প ও সাময়িক ভোগান্তি : যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প চলাকালীন কিছু ভোগান্তি স্বাভাবিক। কিন্তু ঢাকায় এই সাময়িক ভোগান্তি যেন স্থায়ী রূপ নিয়েছে।

রাস্তা খোঁড়া হয়, মাসের পর মাস কাজ বন্ধ থাকে। বিকল্প রাস্তা বা নির্দেশনা না থাকায় মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়ে। এতে উন্নয়নের প্রতি সাধারণ মানুষের বিরক্তি বাড়ে।

অর্থনৈতিক ক্ষতি ও সামাজিক প্রভাব : যানজট শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়-এটি একটি বড় অর্থনৈতিক সংকট। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। পণ্য পরিবহনে দেরি হওয়ায় ব্যবসায় ক্ষতি হয়।

সামাজিক দিক থেকেও যানজট নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। মানুষ ধৈর্য হারায়, রাগ বাড়ে, সামাজিক সহনশীলতা কমে যায়। দুর্ঘটনা ও সংঘর্ষের ঘটনাও বাড়ে।

উন্নয়ন বনাম ব্যবস্থাপনা : কোনটি বেশি দায়ী : প্রশ্ন আসে-যানজটের জন্য উন্নয়ন দায়ী, নাকি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা? আসলে উন্নয়ন নিজেই সমস্যা নয়। সমস্যা হলো পরিকল্পনাহীন ও সমন্বয়হীন উন্নয়ন।

যদি উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে দক্ষ ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতা বাড়ানো যেত, তাহলে আজকের চিত্র ভিন্ন হতে পারত।

সমাধানের পথ : কী করা প্রয়োজন : রাজধানীর যানজট নিরসনে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি-

ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ

গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ

ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা

উন্নয়ন প্রকল্পে সংস্থাগুলোর সমন্বয়

হকার ও অবৈধ দখল উচ্ছেদ

জনসচেতনতা বৃদ্ধি

শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ও নাগরিক দায়িত্ব : আমরা অনেক সময় সব দোষ সরকারের ওপর চাপিয়ে দিই। কিন্তু নাগরিক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব আছে। ট্রাফিক আইন মানা, ফুটপাত ব্যবহার করা, রাস্তা দখল না করা-এসব ছোট বিষয়ই বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

রাজধানীর যানজট আজ আর শুধু একটি পরিবহন সমস্যা নয়-এটি একটি ব্যবস্থাপনার সংকট। উন্নয়ন হয়েছে, হচ্ছে, হবে-কিন্তু যদি সেই উন্নয়ন মানুষের জীবন সহজ না করে, তাহলে তার মূল্য কতটুকু?

ঢাকাকে বাসযোগ্য শহর করতে হলে কেবল কংক্রিট নয়, প্রয়োজন পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা ও সচেতনতা। উন্নয়ন তখনই সার্থক হবে, যখন মানুষ স্বস্তিতে রাস্তায় চলতে পারবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।