সুস্থ শরীর ও মন মানুষের জীবনের এক অমূল্য সম্পদ। শারীরিক সুস্থতা ছাড়া জীবন উপভোগ করা যায় না, সমাজ ও রাষ্ট্রে অবদান রাখার সুযোগ হয় না। স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্যসচেতনতা ও নির্ভরযোগ্য ওষুধ। দেশের বাজারে নকল ও ভেজাল ওষুধে সয়লাব। এ বিষয়টি প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে আসে। কিন্তু কার্যকর প্রতিকার দৃশ্যমান নয় ; বরং পাল্লা দিয়ে ভেজালের বিস্তার বেড়েই চলছে। গত ১৪ জুলাই ২০২৫ দৈনিক ইত্তেফাক শিরোনাম করেছিল- বাজারে প্রায় ৪০ শতাংশ ওষুধে ভেজাল। এ সংবাদটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কিন্তু এ নিয়ে কারও কোন মাথা ব্যাথা নেই। সবকিছুতেই ভেজাল। সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়? পানির অপর নাম জীবন তেমনিভাবে ওষুধের অপর নাম জীবনরক্ষাকারী। জীবনরক্ষাকারী ওষুধ এখন ভেজালে ভরপুর। অথচ আমাদের দেশের ওষুধ দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হচ্ছে, দিন দিন চাহিদা বাড়ছে। বিদেশে আমাদের ওষুধের যথেষ্ট সুনাম থাকলেও দেশীয় বাজারে চলছে ভয়াবহ নৈরাজ্য, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। নকল ও ভেজাল ওষুধ প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। ভেজাল প্রতিরোধে প্রায়ই আলোচনা হয়, সেমিনার হয়, সেম্পোজিয়াম হয়, লেখালেখি হয়, ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালায়। কিন্তু ভেজালের দৌরাত্ম কিছুতেই কমছে না। উল্টো প্রশাসনের নাকের ডগায় জাতি-বিনাশী এ অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে কিছু অসাধু অপরাধীরা। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১৫০০ কোটি টাকার ভেজাল ও নকল ওষুধ বিক্রি হচ্ছে। এভাবে যদি নকল ও ভেজাল ওষুধের বিক্রয় বাড়তে থাকে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে ভেজাল ওষুধের ভেতর মানসম্মত ওষুধ হারিয়ে যাবে। রোগীরা সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়বে। সুতরাং এখনই কঠোর হস্তে নকল ও ভেজাল ওষুধ উৎখাত করা প্রয়োজন।

পতিত স্বৈরাচার পালিয়ে যাওয়ার পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল দেশের সার্বিক পরিস্থিতি কিছুটা হলেও উন্নতি হবে। কিন্তু উন্নতির চাইতে অবনতির সূচক দিন দিন বাড়ছে। রাজনৈতিক দলগুলো দলীয় স্বার্থের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের স্বার্থে নিজেদের নিয়োজিত করতে পারছে না। ফলে সাধারণ মানুষের ভেতর এক ধরনের ক্ষোভের সৃষ্টি হচ্ছে, যা কারও জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না। ভেজাল ওষুধ প্রতিরোধে রাজনৈতিক দলগুলোরও এগিয়ে আসা প্রয়োজন। তা না হলে একা সরকারের পক্ষে ভেজাল ঠেকানো কঠিন। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় উৎপাদিত দশটি ওষুধের অন্তত একটি ওষুধ নকল বা ভেজাল। সংস্থাটির ভাষ্যমতে প্রতিবছর সারাবিশ্বে প্রায় ৭৫-২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার নকল ও ভেজাল ওষুধ বিক্রয় হয়। আমাদের রাজধানীতেও একই চিত্র। বাজারে প্রায় ৪০ শতাংশ ওষুধ ভেজাল। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি, মৃত্যুহার, মানসিক চাপ ও আর্থিক ক্ষতি বেড়ে যাচ্ছে। ভেজাল ওষুধ শুধু একজন মানুষকেই হত্যা করে না, হত্যা করছে পুরো জাতিকে। ভেজাল ওষুধ সেবনের ফলে কিডনি, লিভার, হৃদযন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্র বিকল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। হাসপাতালে গেলে বোঝা যায় কী পরিমাণ মানুষ অসুস্থ। আগে প্রায় হাসপাতালের বেড খালি থাকতো। এখন হাসপাতালে খালি বেড পাওয়া কঠিন। বন্যার বানের মতো রোগী আর রোগী। কিন্তু অনেকে সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছে না। কেউ কেউ বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করছেন। ভেজাল ওষুধের সমস্যা একটি জাতীয় সমস্যা।

২০২২ সালে ‘‘Scientific Reports’ জার্নালে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন ওষুধের দোকান থেকে সংগৃহীত ইসোমিপ্রাজল, সেফিক্সিম এবং অ্যামোক্সিসিলিন- ক্লাভুলানিক অ্যাসিড কম্বিনেশনের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ওষুধের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ ওষুধে নকল ও ভেজাল পাওয়া যায়। ২০২৪ সালে ভারত থেকে আমদানিকৃত নকল হ্যালোথেন ইনজেকশনের কারণে সারাদেশে কমপক্ষে ছয়জন রোগীর মৃত্যু হয়েছিল। জীবনরক্ষাকারী ওষুধ যেখানে শতভাগ ভেজালমুক্ত হওয়ার কথা সেখানে ভেজালে ভরপুর। আমদানিকৃত ওষুধ পর্যন্ত নকল ও ভেজাল। ইনসুলিন থেকে শুরু করে বিদেশি ইনজেকশন পর্যন্ত নকল পাওয়া যাচ্ছে। ২৮ মে ২০২৫ প্রকাশিত বিবিসি বাংলায় প্রকাশি ‘আটা-ময়দার ট্যাবলেট ও ভেজাল ওষুধের বিস্তারে অসহায় মানুষ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- শহর থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চল সবখানেই নকল ও ভেজাল ওষুধ ছড়িয়ে পড়েছে। ভেজাল ওষুধে প্রাণ কেড়ে নেয় তার তো ভুরি দৃষ্টান্ত আছে। ১৯৯১ সালে Adflame

Pharmaceuticals এর ভেজাল প্যারাসিটামল সিরাপে ৭৬ জন শিশু মারা যায়। এ নিয়ে মামলা হয়। ২০২৩ সালে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে প্রত্যেক শিশুর পরিবারকে ১৫ লক্ষ করে টাকা দিতে ওষুধ প্রশাসন কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন।

নকল ও ভেজাল ওষুধের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন- বেশির ভাগ কোম্পানির ওষুধ তৈরির কাঁচামাল নিম্নমানের। এসব ওষুধ স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক। শিশু হাসপাতালের সাবেক পরিচালক শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. শফি আহমেদ মোয়াজ বলেন- নকল ও ভেজাল ওষুধ ব্যবহারে শিশুদের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। জীবন রক্ষার বদলে জীবন কেড়ে নেবে। সে নকল ও ভেজাল ওষুধ আমদানিকারক কিংবা উৎপাদনকারীদের শক্ত হাতে মোকাবিলা করা উচিত। সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো ভেজাল ওষুধ সহজে চেনা যায় না। কোনটা নকল আর কোনটা আসল, বোঝার উপায় নেই। অন্য পণ্যের নকল চেনা গেলেও ওষুধের নকল সেভাবে চেনা যায় না। কারণ ওষুধের নকল প্রায় হুবহুব হয়। প্যাকেট দেখে আসল-নকল বোঝা সম্ভব নয়। অধিকাংশ মানুষ খুচরা এক পাতা বা তারও কম-ওষুধ কেনেন। ফলে অনেকে জালিয়াতির ফাঁদে পড়েন। জনপ্রিয় ওষুধের ব্র্যান্ডগুলো নকল করা হয়। সুতারাং নকল ওষুধ প্রতিরোধে কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে, যেমন- ওষুধের পাতায় কিউআর কোড ব্যবহার করা। এটা ব্যবহার করার জন্য শুধু প্রয়োজন একটি ডিজিটাল স্মার্টফোন। ডিজিটাল স্মার্টফোনের সাহায্যে ওষুধের নাম, উৎপাদনের তারিখ ও মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার তারিখ জানা সম্ভব। পাশাপাশি ওষুধের মোড়ক পরিবর্তন করা প্রয়োজন, যেন সহজে নকল করা না যায়। নকল ও ভেজাল ওষুধের দাম একটু কম হওয়ায় রোগীরা সেদিকে ঝুঁকছে। সে বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। সরকার ২০১৬ সালে ‘মডেল ফার্মেসি’ ও ‘মডেল মেডিসিন শপ’ চালুর উদ্যোগ নেয়। তখন দু হাজারের বেশি লাইসেন্স দেয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক মডেল ফার্মেসিতে প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্ট নেই। দেশের আনাচে-কানাচে বৈধ-অবৈধ ফার্মেসি ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে। এসব ফার্মেসি দ্রুত বন্ধ করা প্রয়োজন। ফার্মাসিস্ট ছাড়া ফার্মেসি দোকানের অনুমতি না দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। ভেজাল ওষুধ যে ফার্মেসি বিক্রি করবে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। যেন একজনের শাস্তি দেখে অন্যজন শিক্ষা পায়।

বিখ্যাত ওষুধ কোম্পানি Pfizer এর মতে, নকল ওষুধ চেনার কয়েকটি উপায় হলো- নিম্নমানের প্যাকেজিং, বানানে ভুল, আকারে পার্থক্য, ট্যাবলেটে গুড়া লেগে থাকা, রঙে অসামঞ্জস্যতা, উৎপাদন বা মেয়াদের তারিখ অনুপস্থিত থাকা ইত্যাদি। ১৯৮২ সালে ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ অনুযায়ী, নকল ও ভেজাল ওষুধ তৈরির শাস্তি ১০ বছরের সশ্রম কারাদন্ড অথবা ২ লক্ষ টাকা জরিমানা। আর বিক্রয়ের শাস্তি ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা ১ লক্ষ টাকা জরিমানার বিধান থাকা সত্ত্বেও ভেজাল ওষুধ ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ হচ্ছে না। শুধু আইন থাকলেই চলবে না। আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রয়োজন নিয়মিত ভেজাল বিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখা। বিশেষ করে লাইসেন্সবিহীন কোম্পানি যাতে নকল ওষুধ তৈরি করতে না পারে সে বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো দরকার। ওষুধ প্রশাসনের তৎপরতা বাড়ানো এবং ওষুধ কোম্পানিগুলোকে কিউআর কোড ব্যবহারে বাধ্য করা প্রয়োজন। ডিজিটাল যুগে কিউআর কোড থাকলে নকল ও আসল বোঝা সহজ হবে। নকল ও ভেজাল ওষুধ একটি জাতি-বিনাশী প্রবণতা। এটি শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজকেই ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কঠোর আইন প্রয়োগ, প্রশাসনের নজরদারি, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জনসচেতনতা বাড়াতে পারলেই জীবন বিনাশী ভেজাল ওষুধের ভয়াবহতার হাত থেকে জাতি মুক্তি পেতে পারে।

লেখক : প্রাবন্ধিক