জাতীয় সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকার পরিষদের প্রতিটির কর্মপরিধি মোটামোটি নির্ধারিত থাকলেও সংসদ সদস্যরা অলিখিত কিছু ক্ষমতা চর্চা করার সুযোগ পান। ফলে স্থানীয় সরকারের সাথে এসব আইন প্রণেতাদের মাঝে মধ্যেই টানাপড়েন সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, সংসদ সদস্যরা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অনাকাক্সিক্ষত খবরদারি করেন। সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা আইন সভার সদস্য হলেও তাদের কর্মপরিধি সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকে না বরং তারা স্থানীয় সরকারের ক্ষেত্রেও নানাবিধ কাজ করার সুযোগ পান। বিশেষ করে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে তারাই রীতিমত দ্বণ্ডমুণ্ডের কর্তা। ফলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সংসদ সদস্যদের শুরু হয় অনাকাক্সিক্ষত দ্বন্দ্ব। অভিযোগ রয়েছে, সংসদ সদস্যরা ‘জুতা সেলাই থেকে চণ্ডিপাঠ’ সবকিছুই করতে চান। এতে ব্যাহত হয় স্থানীয় সরকার পরিষদের কর্মপরিধি ও উন্নয়ন কার্যক্রম।

বস্তুত, জাতীয় সংসদ সদস্য বা এমপি হলেন সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান জাতীয় সংসদের একজন সম্মানিত সদস্য। সংসদ সদস্যকে ইংরেজিতে ‘মেম্বার অব পার্লামেন্ট’ (এমপি) বলা হয়। আমাদের দেশে এক কক্ষবিশিষ্ট সংসদ বিদ্যমান। যদিও জুলাই সনদে দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পর ক্ষমতাসীনদের ‘উল্টে গেলিরে রাম’ অবস্থা। যা শুধু অনাকাক্সিক্ষতই নয় স্ববিরোধীতাও। উল্লেখ্য, আমাদের এক কক্ষ বিশিষ্ট এ আইনসভার সদস্য সংখ্যা ৩৫০; যার মধ্যে ৩০০ জন সংসদ সদস্য জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে থাকেন এবং অবশিষ্ট ৫০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত। সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যগণ নির্বাচিত ৩০০ সংসদ সদস্যের ভোটে নির্বাচিত হন। সংসদ সদস্যদের মেয়াদকাল ৫ বছর।

জাতীয় সংসদে ৩০০ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন যারা জনগণের সরাসরি ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে নির্বাচিত। নারী কোটায় মনোনীত নারী সংসদ সদস্যের সংখ্যা পঞ্চাশ। দলীয় মানদণ্ডে মহিলা সংসদ সদস্যের কোটা নির্ধারিত হয়। সংসদ সদস্যরা নিয়মিতভাবে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে যোগ দেবেন এবং জাতীয় সংসদের কার্যবিধি অনুযায়ী স্বীয় দায়িত্ব পালন করবেন। একজন সংসদ সদস্য আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে যথাযথ পদ্ধতি অবলম্বনপূর্বক বিল উত্থাপন করতে পারবেন এবং তিনি অন্য কোন সংসদ সদস্য কর্তৃক উত্থাপিত বিলের ওপর ভোট দিতে পরবেন। ১৫ দিনের নোটিশ সাপেক্ষে তিনি জাতীয় সংসদের অধিবেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবেন। স্পীকারের অনুমোদনসাপেক্ষে তিনি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণমূলক বক্তব্য প্রদান করতে পারবেন। বাংলাদেশের পদমর্যাদা ক্রম অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের পদমর্যাদা ১৩ নম্বরে।

পক্ষান্তরে বাংলাদেশে তিন স্তর বিশিষ্ট স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সরকার বিদ্যমান। এখানে প্রথম স্তরের প্রশাসনিক একক বিভাগ পর্যায়ে কোন স্থানীয় সরকার নেই। দ্বিতীয় স্তরের প্রশাসনিক একক জেলা পর্যায়ে স্থানীয় সরকার (৬৪টি জেলায় জেলা পরিষদ), উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা পরিষদ এবং গ্রাম এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদ, ছোট শহর এলাকায় পৌরসভা ও বড় শহরে সিটি কর্পোরেশন হল স্থানীয় সরকারের একটি অংশ। বর্তমানে স্থানীয় সরকার কাঠামোতে তিনজন মহিলা সদস্যের জন্য আসন সংরক্ষিত রয়েছে, যা ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমানের সরকার চালু করে। বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারগুলো হলো-জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, সিটি কর্পোরেশন/পৌরসভা /ইউনিয়ন পরিষদ। এছাড়াও বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলায় জেলা পরিষদের পাশাপাশি রয়েছে পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ। জেলা পরিষদ ও পার্বত্য স্থানীয় সরকার পরিষদের কাজ ভিন্ন।

জেলা পরিষদ হল বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার একটি একক, যা রাষ্ট্রে বিদ্যমান তিন ধরনের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার জেলা পর্যায়ে কাজ করে। এর প্রধান হলেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এবং এ সংস্থা ৮টি খাত নিয়ে কাজ করে। বাংলাদেশে ৬১ টি জেলা পরিষদ ও ৩ টি পার্বত্য জেলা পরিষদ রয়েছে। উপজেলা পরিষদ বাংলাদেশের প্রসাশনিক ব্যবস্থার একটি একক অংশ । একটি উপজেলার প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত স্থানীয় জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত পরিষদ উপজেলা পরিষদ নামে পরিচিত।

ইউনিয়ন পরিষদ বা ইউনিয়ন হল বাংলাদেশের পল্লী অঞ্চলের সর্বনিম্ন প্রশাসনিক ইউনিট । গ্রাম চৌকিদারী আইনের ১৮৭০ এর অধীনে ১৮৭০ সালে কিছু পল্লী সংস্থা গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলে ইউনিয়নের সৃষ্টি হয়। কতগুলো গ্রাম নিয়ে একটি করে ইউনিয়ন গঠিত হয়। ইউনিয়ন গঠনের বিস্তারিত দিকনির্দেশনা লিপিবদ্ধ রয়েছে বেঙ্গল চৌকিদারী ম্যানুয়েলের দ্বিতীয় ও তৃতীয় অনুচ্ছেদে। এ প্রক্রিয়ার বিকাশের মধ্য দিয়ে একটি স্থানীয় সরকার ইউনিটের ধারণার সৃষ্টি হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে এর ভূমিকা নিরাপত্তামূলক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকলে ও পরবর্তীকালে এটিই স্থানীয় সরকারের প্রাথমিক ইউনিটের ভিত্তিরুপে গড়ে উঠে। বাংলাদেশে বর্তমানে ৪৫৫৪টি ইউনিয়ন আছে।

আইন ও প্রচলিত বিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকার পরিষদের ক্ষমতার আওতা প্রায় আলাদা। কিন্তু আমাদের দেশের শাসনব্যবস্থায় সংসদ সদস্য (এমপি) এবং স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের প্রধান কাজ আইন প্রণয়ন, জাতীয় নীতি নির্ধারণ এবং নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন-সরাসরি স্থানীয় উন্নয়ন ও জনসেবামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে। তবে বাস্তবে দেখা যায়, এ দু’স্তরের ক্ষমতার সীমারেখা প্রায়ই অস্পষ্ট হয়ে যায়। সংসদ সদস্যরা প্রায়ই স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, এমনকি স্থানীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয়ভাবে প্রভাব বিস্তার করেন। ফলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার কার্যকারিতা, স্বায়ত্তশাসন এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল দায়িত্ব হলো-জনগণের দৈনন্দিন সেবা ও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা। রাস্তাঘাট নির্মাণ, পরিচ্ছন্নতা, স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে স্থানীয় উদ্যোগ-এসব বিষয়েই তাদের কাজ কেন্দ্রীভূত থাকে। অন্যদিকে সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়ন, বাজেট প্রণয়ন ও জাতীয় নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেন। তারা নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্ব করলেও তাদের সিদ্ধান্ত কার্যত পুরো দেশের জন্য প্রযোজ্য। অর্থাৎ স্থানীয় সরকার প্রধানরা সরাসরি স্থানীয় শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করেন। সংসদ সদস্যরা জাতীয় আইনপ্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রাখেন। তবে উভয়েই জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হওয়ায় অনেক সময় ক্ষমতার ক্ষেত্র নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।

নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন প্রকল্পে সংসদ সদস্যদের প্রভাব এবং তহবিল ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে। সংসদ সদস্যদের দলীয় সমর্থকদের মতে, সংসদ সদস্যদের সরাসরি তদারকি উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নে সহায়ক এবং এতে জনগণের কাছে জবাবদিহি বাড়ে। কিন্তু সমালোচকদের মতে, এ হস্তক্ষেপ স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা খর্ব করে এবং দুর্নীতি ও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করে। এতে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং স্থানীয় সরকারের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, কিভাবে অনেক সংসদ সদস্য অধিকাংশ সময় ঢাকায় বসবাস করলেও নিজ এলাকায় শক্তিশালী প্রভাব বজায় রাখেন? অনেক ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা-স্থানীয় ঠিকাদারী ও ইজারাদারি নিয়ন্ত্রণ করেন; স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের পদ নিজেদের অনুগতদের মাধ্যমে দখলে রাখেন; স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা বোর্ডে আধিপত্য বিস্তার করেন। তারা মনে করেন, অনেকেই সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করেন এবং নির্বাচিত হওয়ার পর সে পদ ব্যবহার করে বহুগুণ সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন। অথচ সংসদে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। স্বাধীনভাবে কোনো বিল উত্থাপনের উদাহরণও তেমন দেখা যায় না।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, সংসদ সদস্যদের ভূমিকা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়েছে। তারা উল্লেখ করেন ‘এখন অনেক সংসদ সদস্যের প্রধান কাজ আইন প্রণয়ন নয়; বরং রাস্তা, টেন্ডার, প্রকল্প, পুলিশ ও প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার করা। ভোটাররাও তাদের কাছ থেকে নীতি নয়, বরং ব্যক্তিগত সমস্যা সমাধান আশা করেন। ফলে সংসদ সদস্যরা জাতীয় নীতিনির্ধারক না হয়ে স্থানীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছেন’। যা কোন ভাবেই কাক্সিক্ষত নয়।

সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন প্রণয়নের একচ্ছত্র ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে ন্যস্ত। অর্থাৎ জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান মঞ্চ হওয়া উচিত সংসদ। অন্যদিকে ৫৯(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর স্থানীয় শাসনের দায়িত্ব ন্যস্ত থাকবে। কিন্তু বাস্তবে এ সাংবিধানিক কাঠামোর পূর্ণ প্রতিফলন দেখা যায় না। অনেক বিশ্লেষকের মতে, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা অনেকটা কাজীর গরুর মত ‘কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই’। রাজনৈতিক বোদ্ধারা মনে করেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, এসব প্রতিষ্ঠান সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছাতে পারে এবং তাদের প্রয়োজন ও সমস্যাগুলো দ্রুত শনাক্ত করতে সক্ষম। তবে তারা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেন-স্থানীয় সরকার কর্মকর্তারা কতটা প্রশাসনিক সহযোগিতা পাচ্ছেন? স্থানীয় সরকার পরিষদ ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব কতটা? স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জনগণের অংশগ্রহণ কতটা? নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারীদের তার মতে, বিশ্বজুড়ে স্থানীয় সরকার কাঠামোয় পরিবর্তন এলেও বাংলাদেশে দলীয়করণ ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তেমন পরিবর্তন আসেনি।

এশীয় প্রবৃদ্ধি গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক এবং জাতিসঙ্ঘের উন্নয়ন গবেষণার সাবেক প্রধান ড. নজরুল ইসলাম ভিন্ন একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। তার মতে, সংসদ সদস্যদের কোনো নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকার সাথে যুক্ত না রেখে তাদের নির্বাচনী এলাকা পুরো দেশ হওয়া উচিত। তিনি উল্লেখ করেন- ‘সংসদ সদস্যরা আইন প্রণয়ন করেন গোটা দেশের জন্য, কোনো নির্দিষ্ট এলাকার জন্য নয়। তাই তাদের দায়িত্বও জাতীয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত।’ তিনি মনে করেন, এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হলে সংসদ সদস্যদের স্থানীয় প্রভাব কমবে এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পাবে।

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অন্যতম বড় সঙ্কট সংসদ সদস্যদের অতিরিক্ত প্রভাব। তিনি উল্লেখ করেন- ‘অনেক ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা শুধু সুপারিশই করেন না; উন্নয়ন প্রকল্পসহ স্থানীয় প্রায় সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করেন।’ তার মতে, অনেক প্রভাবশালী সংসদ সদস্য উপজেলা পরিষদ পরিচালনায় সরাসরি ভূমিকা রাখেন এবং ইউনিয়ন পরিষদের কাজেও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হস্তক্ষেপ করেন। তার ভাষায়, বাস্তবে এমন কোনো উদাহরণ খুব কমই পাওয়া যায় যেখানে কোনো কর্মকর্তা সংসদ সদস্যের সুপারিশ উপেক্ষা করার সাহস দেখিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংসদ সদস্যরা এক ধরনের দ্বৈত ক্ষমতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। তারা একই সাথে জাতীয় আইনপ্রণেতা এবং স্থানীয় ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছেন। এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

তাই বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় কার্যকর ভারসাম্য আনতে হলে সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকারের ভূমিকার স্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। সংসদ সদস্যদের যদি প্রধানত জাতীয় আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণে মনোনিবেশ করানো যায় এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রকৃত অর্থে ক্ষমতায়ন করা যায়, তাহলে স্থানীয় উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা আরো শক্তিশালী হতে পারে। অন্যথায় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক প্রভাবের দ্বন্দ্ব ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

আমরা জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান কোনো পক্ষকে একেবারে ঠুটো জগন্নাথ বানানোর পক্ষে নই বরং দেশ ও জাতির কল্যাণে স্ব স্ব অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ও কার্যকর দেখতে চাই। তাই এজন্য উভয় পক্ষের কর্মপরিধি সুনির্দিষ্ট হওয়া উচিত। আর সংসদ সদস্য উচিত আইন প্রণয়নসহ জাতীয় বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা। তবে সংসদ সদস্যের কাছে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতার বিষয়টি উপেক্ষা করা যায় না।

www.syedmasud.com