মোটরসাইকেল আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ইচ্ছে করলেও বাদ দেয়া যায় না। কারণ এটি শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়; সময় বাঁচানোর জন্যও প্রয়োজন। কী শহর, কী গ্রাম সর্বত্র মোটরসাইকেল এক অনিবার্য বাস্তবতা। কমখরচে একস্থান হতে অন্যস্থানে পৌঁছার দ্রুততম বাহন হিসেবে দুইচাকার মোটরসাইকেলের জনপ্রিয়তা এখন শীর্ষে। কিন্তু জনপ্রিয়তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুর্ঘটনা, কেড়ে নিচ্ছে প্রাণ। বাংলাদেশ সড়ক পরিহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এর তথ্যনুসারে দেশে মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রায় ৪৮ লাখ ১৬ হাজার ৫শ’ ৩১টি। অথচ নব্বই দশকের দিকে মোটরসাইকেল এতো বেশি ছিল না। রাজধানী ঢাকায় কিছু মোটরসাইকেল দেখা গেলেও উপজেলা পর্যায়ে হাতে গোনা কয়েকটি পরিবারে ছিল। কদাচিৎ রাস্তায় মোটরসাইকেল দেখা যেত। আর এখন গ্রামে সাইকেলের চাইতেও বেশি মোটরসাইকেল দেখা যায়। এসব মোটরসাইকেলের চালক উঠতি বয়সের তরুণ। তারা একটি বাইকে তিন-চারজন চড়ে বসে। অনেকে মাথায় হেলমেট পর্যন্ত পরে না। আবার কিছু বাইকের সাইলেন্সার পরিবর্তন করে বিকট শব্দ সৃষ্টি করে সড়ক দাপিয়ে বেড়ায়। এসব বিকট শব্দে রাস্তায় চলা দায়। সাধারণ মানুষ আৎকে ওঠে। কিন্তু বলার কেউ নাই। ঘরে ঘরে এখন সমাজ। শাসন করারও সুযোগ নেই। বেপরোয়ভাবে গাড়ি চালাতে গিয়ে অনেকের জীবন চলে যায়- না ফেরার দেশে। পত্রিকার পাতায় চোখ ভুলালেই দেখা যায় মোটরসাইকেল কেড়ে নিচ্ছে প্রাণ। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এর এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের ৩২.১৪ শতাংশই মোটরসাইকেল আরোহী। একজন যুবকের স্বপ্ন, একজন পিতার কষ্ট, একজন মায়ের আহাজারি-সবই ম্লান হয়ে যায় একটি মাত্র দুর্ঘটনায়। তারপরও অভিভাবকগণের টনক নড়েনি।

একটি দুর্ঘটনা শুধু কয়েক সেকেন্ডের ঘটনা নয়- এটি একটি পরিবারের সারাজীবনের কান্না। এক মুহূর্তের অসতর্কতা যে কত ঘর অন্ধকার করে দেয় তার হিসাব থাকে না কোনো ক্যালেন্ডারের পাতায়! থেকে যায় শুধু প্রিয়জন হারানোর বেদনা আর হারিয়ে যাওয়া পদচিহ্ন। দুর্ঘটনা যখন সংঘটিত হয়ে যায় তখন রাস্তায় শুধু লোহা আর রক্ত পড়ে থাকে না- পড়ে থাকে একটি পরিবারের স্বপ্ন আর দুঃখের চিৎকার। জীবনের মূল্য যে কত গভীর, তা বুঝা যায় একটি দুর্ঘটনার নিস্তব্ধ আর্তনাদে-যেখানে কান্না থামলেও শোক থামে না। পুরো পরিবারে দুঃখের আধাঁর নেমে আসে। এ দুঃখ-বেদনা হাহাকার ভুক্তভোগী পরিবার ছাড়া অন্য কেউ অনুধাবন করতে পারবে না। কারণ যার চলে যায় সে-ই বুঝে বিচ্ছেদের কী যন্ত্রণা! আমার পরিচিত দুটি পরিবারের স্বপ্ন মোটরসাইকেল কেড়ে নিয়েছে। প্রথম ঘটনাটি আমার এলাকায়। আমার এক পরিচিত ব্যক্তি তার একমাত্র ছেলেকে শখ করে মোটরসাইকেল কিনে দিয়েছিলেন। সন্তানের আবদার বাবা ফেলতে পারেননি। কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই একমাত্র ছেলে এক মর্মান্তিক মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যায়। একজন বাবার জীবনে এর চেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা আর কী হতে পারে! বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ পাহাড়ের চেয়ে ভারি হয়ে উঠে। তারপরও ভুক্তভোগী পরিবার ধৈর্য্যধারণ করে আরশের মালিকের সন্তুষ্টির প্রত্যাশা করে। দ্বিতীয় ঘটনা আমার এক বন্ধুর ভাগিনা। পরিবারের একমাত্র ছেলে সন্তান ছিল সে। ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর মামার চেম্বারে সময় দিত। মামাও চেয়েছিলেন তাকে আইন বিষয়ে পড়াবেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস সে-ও এক মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়। এমন countless ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। আমরা সব জানি না- যা পত্রিকার পাতা বা সোশ্যাল মিডিয়ায় আসে, শুধু সেটুকুই জানতে পারি।

আমাদের দেশে যত সমস্যা আছে তার মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অন্যতম। এটি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি প্রতিদিনের মৃত্যুর মিছিল, যেখানে প্রতিটি লাশের পেছনে থাকে একটি বিধ্বস্ত পরিবার। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ঘর থেকে বের হয় ফিরবে আশা করে। কিন্তু অনেকের ভাগ্যে আর প্রিয়জনের কাছে ফিরে আসা হয় না। কারণ একটি ত্রুটিপূর্ণ যান কিংবা চালকের অসতর্কতা কেড়ে নেয় পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ। ফলে পরিবারটি পথে বসার উপক্রম হয়। একটি সড়ক দুর্ঘটনায় শুধু একজন মানুষ নয়, তার সঙ্গে মারা যায় তার স্বপ্ন, তার দায়িত্ব, তার পরিবারের হাসি। দুর্ঘটনায় আহত অনেকেই ফিরে পান না স্বাভাবিক জীবন। কারও পা নেই, কারও হাত নেই, কারও চোখের দৃষ্টিশক্তি নেই- বিশ্ব তাদের কাছে হয়ে যায় নতুন লড়াইয়ের মাঠ। বলতে দ্বিধা নেই- আমাদের সড়ক এক একটা মৃত্যুফাঁদ। যেখানে নিয়ম মানে না অনেকে, মানাতে পারে না কেউ-ফলাফল; প্রতিদিন নতুন শোক, নতুন অশ্রু, নতুন সংবাদ। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের গত ১২ মাসের প্রতিবেদন থেকে জানা যায় সড়ক দুর্ঘটনায় সবচে বেশি মৃত্যু হয়েছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। মোট ২৬৯৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২৪৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা মোট মৃত্যুর ৩৮.১৩ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ৫ জনের মধ্যে প্রায় ২ জনের মৃত্যু ঘটে মোটসাইকেল দুর্ঘটনায়। উক্ত ১২ মাসে আহত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার ৫২৮। ১২ মাসে মোট সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ৬ হাজার ৪৩৭ জন।

চলতি বছরের অক্টোবরে ৪৮৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৪১ জন মৃত্যৃবরণ করেছেন। এর মধ্যে ১৩৭ জন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছে। সেপ্টেম্বরে ১৫১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রায় ১৪৩ জন মৃত্যুবরণ করেছেন। অক্টোব (সূত্র: ৮ নভেম্বর ২০২৫, প্রথম আলো) সড়কে প্রতি ৫ জনের মধ্যে প্রায় ২ জনের মৃত্যু হয় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। বিআরটিএর ভাষ্যনুসারে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ১৩ মাসে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৫ হাজার ৫৯৫ জন মৃত্যুবরণ করেছেন। এসব নিহত মানুষের ভেতর প্রায় ১ হাজার ৭৯৮ জন মোটরসাইকেল আরোহী ছিলেন। অর্থাৎ নিহতের ৩২ দশমিক ১৪ শতাংশই মোটরসাইকেল আরোহী। বিআরটিএর তথ্য বলছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের ৭০ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। ৮০ শতাংশ চালকের কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই। অধিকাংশ চালক, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে হেলমেট ব্যবহার করেন না।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে গত পাঁচ বছরে দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ১১ হাজার ৮৬৪ জন মোটরসাইকেল আরোহী প্রাণ হারিয়েছেন, যা সড়ক দুর্ঘটনায় মোট প্রাণহানির ৩৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এ সময় আরও প্রায় ১০ হাজার মোটরসাইকেল আরোহী আহত হয়েছেন। বাংলাদেশে কত সংখ্যক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয় তার কিছুটা নমুনা দেখা যায় পঙ্গু হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন করলে। এসব হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগ ২৪ ঘণ্টা ব্যস্ত থাকে রোগীদের সেবায়। জরুরি বিভাগে অধিকাংশ রোগী সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে কাতরাচ্ছেন। নিটোর এর ভাষ্য থেকে জানা যায় ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালে জুন পর্যন্ত সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত প্রায় ২২ হাজার ৬৪৫ জন চিকিৎসা নিতে আসেন। এর ভেতর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার ১৫০ জন।

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল) দেশের অন্যতম প্রধান অর্থোপেডিক ও ট্রমা চিকিৎসা কেন্দ্র সারাদেশের দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের একমাত্র ঠিকনা। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত মানুষদের আর্তনাদ কিছুটা হলেও সেখানে দেখা যায়। এত মানুষের চিকিৎসা দেয়া অনেক সময় তাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠে না। সুতরাং জরুরিভিত্তিতে রাজধানী ঢাকার বাইরে জেলাশহরগুলোতে অর্থপেডিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। যেন রোগীদের ঢাকামুখী না হতে হয়। ঢাকায় আসতে আসতে রোগীর জীবন যায় যায় কাহিল অবস্থা হয়। এ অবস্থার পরির্বতন হওয়া প্রয়োজন। লেখক : প্রাবন্ধিক।