মো. মাঈন উদ্দীন

গণভোট হলো কোনো গুরুত্বপূর্ণ নীতি বা সাংবিধানিক বিষয়ে জনগণের সরাসরি মতামত যাচাইয়ের প্রক্রিয়া, যেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট মানে সেই প্রস্তাবের পক্ষে সম্মতি, যা সাধারণত একটি নতুন বা পরিবর্তিত শাসনব্যবস্থা, বৃহত্তর স্বাধীনতা, সুশাসন বা কাক্সিক্ষত সামাজিক পরিবর্তনের পক্ষে থাকে, যেমন বাংলাদেশে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট। ‘হ্যাঁ’ ভোটের মূল বার্তা হলো ‘হ্যাঁ, আমরা এই পরিবর্তন চাই’-যা গণতন্ত্র, সুশাসন, উন্নয়ন ও জনগণের সার্বভৌমত্বের পক্ষে একটি সুস্পষ্ট রায়। গণভোটের মূল বার্তা হলো জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে নয়, জনগণ সরাসরি সিদ্ধান্ত নেয়। এখানে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের সরাসরি প্রয়োগ, বিশেষত সংবিধান বা বড় নীতি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে। গণভোটে সরকার বা কোনো ব্যবস্থার পক্ষে জনমতের বৈধতা নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের মূল বার্তা সংস্কারের পক্ষ নেয়া। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবকে সমর্থন করা। গণভোটে হ্যাঁ দেয়া মানে স্বৈরাচার, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও লুটপাটের বিপক্ষে, গণতন্ত্র ও সুশাসনের পক্ষে রায় দেয়া। হ্যাঁ ভোট ঐক্যের প্রতীক। একটি সুন্দর দেশ গঠন এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। হ্যাঁ ভোট ভবিষ্যতের আশা জাগায়। এটি উন্নত জীবন ও সুশাসনের মাধ্যমে একটি উন্নত ভবিষ্যতের অঙ্গীকার। গণভোটে হ্যাঁ দেয়া মানে ‘আমরা চাই পরিবর্তনের এই প্রস্তাবটি গৃহীত হোক, যা একটি গণতান্ত্রিক, সুশাসিত ও উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবে’।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ করা হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। একই দিনে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোটও হবে। গণভোটে ‘না’ ভোট জয়ী হলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী দল জুলাই সনদ মেনে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে না। আর হ্যাঁ ভোট জয়ী হলে জুলাই সনদ মেনে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে নির্বাচিত সরকার বাধ্য থাকবে। তবে সরকার যেখানে গণভোটের আয়োজক, সেখানে তারা একটি পক্ষ নিয়ে প্রচারণা চালাতে পারে কি এ নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন। উপদেষ্টারা সহ সরকারের পক্ষসমূহ হ্যাঁ ভোটের পক্ষে কাজ করছে। উপদেষ্টারা হ্যাঁ ভোটের পক্ষে বলার মূল কারণ হচ্ছে এই সরকার হচ্ছে সংস্কারের সরকার। এই সরকার ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে এই সংস্কারকে একটি প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের চেষ্টা করেছে। এটাই এখন গণভোটে দেয়া হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার একটি আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটদানের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে, যা দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে এবং এর উদ্দেশ্য হলো স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আনা। এই গণভোটের মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে দেশের উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে প্রচার করা হচ্ছে।

গণভোট ও ‘হ্যাঁ’ ভোটের মূল বার্তাহল : রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রদানের মাধ্যমে একটি স্থায়ী ও কার্যকর সরকার কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের জন্য জরুরি।

অর্থনৈতিক গতি : নতুন অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়নের জন্য ‘হ্যাঁ’ ভোটকে প্রয়োজনীয় হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জনগণের অংশগ্রহণ : এই গণভোটকে জনগণের মতামতের প্রতিফলন হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে একটি উন্নত ভবিষ্যতের পক্ষে রায় দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক : অন্তর্বর্তী সরকার সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে, যা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলছেন যে এটি একটি নিরপেক্ষ গণভোটের পরিবেশ নষ্ট করছে কিনা।

গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই প্রচারণা নিয়ে আলোচনা চলছে, যেখানে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ উভয়ের পক্ষেই যুক্তি তুলে ধরা হচ্ছে এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। সংক্ষেপে, অন্তর্বর্তী সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চাইছে এবং এর সাফল্য নির্ভর করছে জনগণের মতামতের ওপর। ভোটারদের মাঝে হ্যাঁ ও না ভোট সম্পর্কে জানা-অজানা: শহরের শিক্ষিত ভোটার রা হ্যাঁ -না সম্পর্কে যতটুকু জানে জেলা বা গ্রামীণ জনগণ এখনো হ্যাঁ/না ভোট নিয়ে এতোটা সচেতন নয় বা জানার আগ্রহও দেখা যাচ্ছে না। তবে জনগন কতোটুকু বুঝে হ্যাঁ ভোট দেয়া মানে স্বৈরাচার কে না করা, হাসিনাকে না করা, আওয়ামী লীগকে না করা। সাধারণ জনগনের মাঝে যে বার্তা ঘোরপাক খাচ্ছে তা হলো ‘না’ ভোট মানে স্বৈরাচারকে ডাকা, হ্যাঁ ভোট মানে স্বৈরাচার চাইনা, সংষ্কার চাই। তবে আপাতত এ ধারনা থাকলেও হ্যাঁ ভোটের জন্য চলতে পারে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর কোন কোন দল মনের দিক দিয়ে হ্যাঁ ভোটের পক্ষ নিতে কষ্ট হচ্ছে। জুলাই বিপ্লবের ফল ভোগ করতে চায় কিন্তু হ্যাঁ ভোট দিতে, হ্যাঁ ভোটের পক্ষ নিতে কারো কারো কষ্ট হচ্ছে। আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতায় গিয়ে কমিটমেন্ট না রক্ষা করারই নজির রয়েছে। তাই এবারের হ্যাঁ ভোটে রাজনৈতিক দলগুলোর যদি কোন লেছন হয় তাহলে জনগণই উপকৃত হবে। জনগণকে জানতে হবে বর্তমান সরকার কেবল একটি নির্বাচন দিয়ে বিদায় নেয়ার মতো সাধারণ অর্ন্তবর্তী সরকার নয়; এটি জুলাই অভ্যুত্থানের গণ-আকাক্সক্ষার ফসল। এই সরকারের মূল কাজ হলো ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বিলোপের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো সম্পন্ন করা, যার মধ্যে রয়েছে সংসদে উচ্চকক্ষ গঠন, সংরক্ষিত নারী আসন বৃদ্ধি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা।

এক ব্যক্তির দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী না থাকা এবং দলীয় প্রধান ও সরকারপ্রধান এক না হওয়া। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের ‘কনস্ট্রাকটিভ’ বা গঠনমূলক দায়িত্ব নিতে হবে। ভোটারদের জানার অধিকার রয়েছে, কোন প্রার্থী সংস্কারের পক্ষে এবং কারা এর বিপক্ষে। আসন্ন গণভোটে সরকারের তরফে প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, যাঁরা দেশ চালান, বিদ্যমান ত্রুটিপূর্ণ সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্যই তাঁরা ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার সুযোগ পান। আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটকে জয়ী করে তাঁদের এই ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার পথ বন্ধ করতে হবে।

গণভোট আসলে কী বা কেন, এ নিয়ে কোনো সংশয়ের অবকাশ নেই উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টার এই বিশেষ সহকারী বলেন, অন্য সব সাধারণ নির্বাচনের মতোই হবে গণভোট। তবে গণভোটের মাধ্যমে জনগণ সিদ্ধান্ত দেবে যে আগামীর বাংলাদেশ কীভাবে চলবে। আসন্ন নির্বাচনে সব ভোটার ভোটকেন্দ্রে দুটি ব্যালট পাবেন। এর মধ্যে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যালটটি হবে সাদা আর গণভোটের ব্যালটটি হবে রঙিন।

গণভোটের বিষয়ে জনমত সৃষ্টি ও সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব সবার, এমনটা উল্লেখ করে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও বিগত সরকারের সময়ে যাঁরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণ দিয়েছেন, আত্মদানের মধ্য দিয়ে তাঁরা এই দায়িত্ব অন্তর্বর্তী সরকারকে দিয়ে গেছেন।’

প্রধান উপদেষ্টার এই বিশেষ সহকারী আরও বলেন, গণভোটে জনগণের সম্মতির মধ্য দিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পথ আরও সুগম হবে। ১৬ বছর ফ্যাসিস্ট শাসনামলে গুম, খুনসহ নানা ভয়াবহ অপরাধের মধ্য দিয়ে দেশ পরিচালিত হয়েছে। ভবিষ্যতে যেন এমন অপরাধ আর না ঘটে, সে জন্য আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিতে হবে এবং জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্বপ্ন ছিল একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ কে বিজয়ী করতে হবে। এটি শুধু একটি নির্বাচন নয়, এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের দিকনির্দেশনা নির্ধারণের গণরায়। গণভোট দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে, কারণ এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতি নির্ধারণের ওপর নির্ভর করে; একটি সুষ্ঠু গণভোট বিনিয়োগ ও আস্থা বাড়াতে পারে, আবার রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা থাকলে অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়ে, যেমনটা বর্তমানে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অভাব ও ব্যাংকিং খাতে দেখা যাচ্ছে, যদিও কেউ কেউ আশা করছেন সুষ্ঠু নির্বাচন অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।

লেখক : ব্যাংকার।