পবিত্র রমযান মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য এক বড় নেয়ামত। দীর্ঘ এগারটি মাসের পাপ পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত হওয়ার অপূর্ব সুযোগ এনে দিয়েছে পবিত্র রমযান। পবিত্র রমযান মাসেই আমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে। এ মাসের আগমনে মুসলিম সমাজ ও ইসলামী জীবন ধারায় এক বিরাট সাফল্যের সৃষ্টি হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরয করা হয়েছে যেমন করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যাতে করে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সুরা বাকারা-১৮৩)
এ আয়াত প্রমাণ করে রোজা আমাদের পূর্ববর্তীদের উপরও ফরয ছিল। রমযান আরবী শব্দ। অর্থ দহন। ইসলামী বিশ্বকোষে রমযান অর্থ গ্রীষ্মের উত্তাপ উল্লেখ করা হয়েছে। আরবী বছরের নবম মাস হিসেবেই এর পরিচয় রয়েছে। রমযান মাসেই পবিত্র কুরআন নাযিল হয়েছে মানুষের জন্য, হেদায়েতেদের জন্য।
রোজার ঐতিহাসিক তাৎপর্য : রোজা মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। রোজা পূর্ববর্তী যুগেও ফরজ ছিল। তবে তা রমযান মাসের মতো পুরো মাস ব্যাপী ছিল না। হযরত আদম (আ.) এর সময়ও রোজা ছিল। পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম কে রোজা রেখেছিলেন? এ প্রশ্নের জবাবে হযরত খিযির ইবনে হুবাইশ (রহ.) বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)এর বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম- আইয়্যামে বীজ কী? উত্তরে তিনি বললেন-আল্লাহ পাকের নিষিদ্ধ ফল খেয়ে হযরত আদম (আ.) জান্নাত থেকে দুনিয়ায় প্রেরিত হন এবং তাঁর দেহের রং পরিবর্তন হয়ে যায়। তাঁর এ অবস্থায় ফেরেশতাগণ আল্লাহর সমীপে কান্নাকাটি করে হযরত আদম (আ.)-এর মুক্তি কামনা করেন। ফলে আল্লাহ পাক হযরত আদম (আ.)-এর নিকট এই মর্মে ওহী পাঠালেন যে, আপনি চন্দ্রমাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখে রোজা রাখুন। হযরত আদম (আ.) তা-ই করলেন। ফলে তাঁর দেহের রং আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠল। একারণে এ তিনটি আইয়্যামে বীজ বা উজ্জ্বল দিন বলা হয়।
হাদিস শরীফে হযরত নূহ (আ.)-এর যুগে রোজার প্রমাণ পাওয়া যায়। হযরত রাসুল (সা.) ইশরাদ করেন- “ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন ছাড়া হযরত নূহ (আ.) সারা বছর রোজা রাখতেন।” (ইবনে মাজাহ্ )
মুসা আ. এর সময় রোজা পালন করার বিধানও হাদিসে পাওয়া গেছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) হিজরত করে মদীনায় আগমণ করার পর দেখলেন যে, ইয়াহুদীরা আশুরার দিন রোজা পালন করছে। তখন তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন- এটি কী ধরনের রোজা? জবাবে তারা বলল, এটি আমাদের জন্য একটি পবিত্র দিন। এদিনে আল্লাহ তা’আলা তাঁর দুশমন ফির’আউনকে তার দলবলসহ ডুবিয়ে হত্যা করে বনী ইসরাঈলকে নাজাত দিয়েছেন। তাই এ দিনে শুকরিয়াস্বরূপ হযরত মুসা (আ.) রোজা রাখতেন। (বোখারী শরীফ) এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, হযরত মুসা (আ.)-এর যুগেও রোজা ছিল এবং সে ধারা বনি ইসরাইল ও ইয়াহুদীদের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সা.)এর যুগ পর্যন্ত বজায় ছিল।
ইমাম বোখারী (রহ.) একটি হাদীস উদ্ধৃত করেছেন যে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.) কে নবী করীম (সা.) বললেন-তুমি হযরত দাউদ (আ.)-এর অনুরূপ রোজা রাখ। তিনি [হযরত দাউদ (আ.)] একদিন রোজা রাখতেন এবং একদিন বিরতি দিতেন।” (বোখারী শরীফ) হযরত ঈসা (আ.)-এর জন্মের সময় কৌতুহলী জনতা তাঁর মাতা মারইয়ামকে তার জন্ম সম্পর্কে প্রশ্ন করতে থাকলে, উত্তরে তিনি বললেন -আমি দয়াময় আল্লাহর উদ্দেশ্যে মান্নত করে রোজা রেখেছি। সুতরাং আমি কোন কিছুতেই কোন মানুষের সঙ্গে বাক্যলাপ করবো না। (সুরাহ্ মারইয়াম, ২৬) জাহেলী যুগে কুরাইশ ও মুশরিকরাও রোজা রাখতো। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-জাহেলী যুগে কুরাইশরা আশূরার দিনে রোজা রাখত। (বোখারী শরীফ) সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, রামাযানের একমাস সিয়াম সাধনা নির্দিষ্ট হবার পূর্বে বিশ্বের সকল জাতিই কম-বেশি রোজার সাথে পরিচিত।
তাক্বওয়া অর্জন : তাক্বওয়া অর্জনে অনন্য সুযোগ পবিত্র রমযান মাস। মানুষের আত্মিক উন্নতি সাধনের জন্য আল্লাহ রোজা ফরজ করেছেন। রোজার মাধ্যমে মানুষ তাকওয়ার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবে। রমযান মাসে তাই তাকওয়া অর্জনের সুন্দর পরিবেশ তৈরি হয়। এ মাসে প্রত্যেক সৎকর্মের ফলও অনেক বেশি। আর রোজাদার বান্দাহ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়। রোজাদারের মুখের গন্ধও আল্লাহর কাছে সুগন্ধীর চেয়েও প্রিয়। এ সম্পর্কে সিহাহ সিত্তার অন্যতম গ্রন্থ ইবনে মাজাতে হযরত আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, “বনী আদমের প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব দশগুণ হতে সাতশত গুণ পর্যন্ত বর্ধিত করা হয় রোজা ব্যতিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, বান্দা একমাত্র আমার সন্তুষ্টির জন্যই রোজা রাখে, তাই আমি নিজেই এর পুরস্কার দিবো। বান্দাহ একমাত্র আমার সন্তুষ্টির অনে¦ষায় কামাচার ও খাওয়া-দাওয়া পরিহার করে। রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে, একটি আনন্দ হলো ইফতারের সময়, দ্বিতীয় আনন্দ হলো তার প্রভুর সাথে সাক্ষাতের সময়। রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহ তায়ালার নিকট মিশক আম্বরের চেয়ে অতীব উৎকৃষ্ট।” রমযানের গুরুত্ব সর্ম্পকে বিভিন্ন হাদিসে নানা বিষয় উদ্ধৃত হয়েছে। হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন : যে লোক রমযান মাসে রোজা রাখবে ঈমান ও চেতনা সহকারে তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। (বুখারী ও মুসলিম) হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)কে বলতে শুনেছি, যে লোক একটি দিন রোজা রাখবে, আল্লাহ তার মুখমন্ডল জাহান্নাম হতে সত্তর বছর দূরে সরিয়ে রাখবেন। (বুখারী ও মুসলিম) হযরত সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত নবী কারীম (সা.) বলেন, জান্নাতে রাইয়ান নামক একটি বিশেষ দরজা রয়েছে। সে দরজা দিয়ে শুধুই রোজাদাররাই প্রবেশ করবে।
হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের নিকট রমযান মাস সমুপস্থিত। তা এক অত্যান্ত রবকতময় মাস। আল্লাহ এ মাসে তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করেছেন। এ মাসে আকাশের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়, শয়তানগুলো আকট করে রাখা হয়। এ মাসে একটি রাত আছে যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। যে লোক এ মাসে তার মহাকল্যাণ লাভ হতে বঞ্চিত থাকল, সে সত্যিই হতভাগা। (নাসাঈ ও বায়হাকী) সুতরাং পবিত্র রমযানে তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে প্রত্যেককেই মহাকল্যাণ লাভ করা প্রয়োজন।
রোজা পালন : ‘আস-সউম’ শব্দের অর্থ হলোÑ রোজা বা একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিরত থাকা। এটা হলো সাধারণ অর্থ। বাহ্যিক অর্থ এবং এ বাহ্যিক শব্দের মধ্যে তাকওয়া খুঁজে পাওয়া যাবে না, শুধু রোজা রাখা হবে, ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত থাকা হবে। কিন্তু এ শব্দের আরেকটি অর্থ আছে, যাকে বলে অভ্যন্তরীণ বা ভেতরের অর্থ অথবা বলা যায় কুরআনিক অর্থ। যার মানে হলোÑ আল্লাহর জন্য রমজানের ফরজ রোজার নিয়তে সেহরি খাবেন। তারপর, ফজরের আজান থেকে নিয়ে মাগরিবের আজান পর্যন্ত কোনো প্রকার খাদ্য গ্রহণ না করা, স্ত্রীর কাছে না যাওয়া, খারাপ কথা না বলার নাম হলো রোজা।
সে তাকওয়া অর্জন করার জন্য রোজা রাখার নিয়ম আল্লাহর রাসূল সা: এভাবে বলেছেন, যে রোজা আমাদের তাকওয়া দিবে, সংশোধন করবে, পরহেজগার বানাবে ও সম্মানের সাথে পৃথক দরজা দিয়ে জান্নাতে যাওয়ার সুযোগ করে দেবে; সেই ধরনের রোজা রাখতে হলে প্রথমে আমাদের রোজা রাখার নিয়তে সেহরির সময়ে সেহরি খেতে হবে। আল্লাহর রাসূল সা. বলেছেনÑ ‘তোমরা সেহরি খাও, কেননা সেহরি খাওয়ার মধ্যে বরকত রয়েছে’(বুখারি-মুসলিম)। সেহরি না খেলে আপনার রোজা হয়ে যাবে কিন্তু সেহরির সওয়াব থেকে আপনি বঞ্চিত হবেন। সুতরাং, সেহরির সময় সেহরি খেয়ে আপনি নিয়ত করেন।
সেহরি খাওয়া : রমযান মাসের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য সেহরী খাওয়া। রোজা রাখার জন্য শেষ রাতে ফজরের পূর্বক্ষণে কিছু খাওয়াই হলো সেহরী। ইফতার করার মধ্যে যেমনি বরকত ও সওয়াব রয়েছে, তেমনি সেহরীর মধ্যেও বরকত ও সওয়াব রয়েছে। এ বিষয়ে মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে রাসূলে মকবুল (সা.) বলেছেন, সেহরী খাওয়ায় নিশ্চয়ই বরকত রয়েছে। অপর হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে, নবী করীম (সা.) তাগিদ করে বলেছেন “যে লোক রোজা রাখতে চায় তার কোন কিছু খেয়ে সেহরী পালন করা কর্তব্য।” অপর এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- মুসলমানদের এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের রোজা রাখার মধ্যে পার্থক্য হলো সেহরী খাওয়া। অর্থাৎ মুসলমানরা সেহরী খেয়ে রোজা থাকে আর অমুসলিমরা সেহরী না খেয়ে রোজা থাকে। এই পার্থক্য সুস্পষ্ট।
সেহরী খাওয়া বিলম্বিত করার জন্য হাদীসে তাকিদ এসেছে। সেহরী দেরি করে গ্রহণ করাকে কল্যাণের প্রতীক বলা হয়েছে। হযরত আবু যর গিফারী (রা.)-এর থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন, রাসূলে করীম (সা.) ইরশাদ করেছেন, “আমার উম্মত যতদিন পর্যন্ত ইফতার ত্বরানি¦ত করবে এবং সেহরী বিলম্বিত করবে, ততদিন তারা কল্যাণময় হয়ে থাকবে।”
সেহরী খাওয়ার শেষ সময় হলো সুবহে সাদিক উদয় হওয়া। এ শেষ সময় পর্যন্ত সেহরী খাওয়া বিলম্বিত করাই সুন্নাত। তিনি সেহরী খাবার জন্য যেমন তাগিদ দিয়েছেন তেমনি ইহা বিলম্বিত করে শেষ মুহূর্তে খাবার জন্যও উৎসাহ প্রদান করেছেন। সুবহে সাদিক উদয় হবার বহু পূর্বে প্রায় মধ্য রাতে সেহরী খাওয়া ইসলামে পছন্দনীয় কাজ নয়। এতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)এর সন্তুষ্টি নিহিত নেই। এতে রাসূল (সা.) ও সাহাবীদের অনুসৃত ও আচরিত রীতি অনুসরণ হয় না। রাসূল (সা.) তাগিদ করেছেন, “তাছাহহারু ফি আমেরীল লাইলে” অর্থাৎ তোমরা রাত্রির শেষ দিকে সেহরী গ্রহণ করো। মহাগ্রন্থ আল কুরআনের সূরা আল বাকারার ১৮৭নং আয়াতে রাতের অন্ধকারকে কাল রেখা এবং ভোরের আলোকে সাদা রেখার সাথে তুলনা করে রোজা শুরু এবং খানাপিনা হারাম হওয়ার সঠিক সময়টি বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ সুবহে সাদেকের উদয় হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত পানাহার বন্ধ করা যেমন জায়েজ নয়, তেমনি সুবহে সাদেক হওয়ার পর খানাপিনা করাও হারাম।
ইফতার : ইফতার অর্থ ভঙ্গ করা, সারাদিন রোজা রাখা শেষে সূর্যাস্তের সাথে সাথে মুমিন রোজাদারগণ খাবার খেয়ে ঐ দিনের রোজা ভেঙে ফেলেন। রোজাদারের জন্য ইফতার হলো সবচেয়ে আনন্দের বিষয়। আর ইফতারের সময় দোয়া কবুল হওয়ার কথাও হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। যথাসময়ে ইফতার করা এবং অন্যকে ইফতার করানোর মধ্যে অনেক নেকী অর্জিত হয়। মুসনাদে আহমাদে হযরত আবুযর গিফারী (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে- তিনি বলেছেন, রাসূলে কারীম (সা.) এরশাদ করেছেন, “আমার উম্মত যতদিন পর্যন্ত ইফতার ত্বরানি¦ত করবে এবং সাহরী বিলম্বিত করবে, ততদিন তারা কল্যাণময় হয়ে থাকবে। ইফতার করার নির্দিষ্ট সময় সূর্যাস্ত হওয়ার পর মুহূর্ত। এই মুহূর্ত উপস্থিত হওয়া মাত্রই রোজা খোলে ফেলা কর্তব্য। এতে কোনরূপ বিলম্ব করা উচিত নয়। ইফতার ত্বরানি¦ত করা কেবল রাসূল (সা.) এরই পছন্দ নয়। আল্লাহর নিকটও ইহা অধিকতর প্রিয়। হাদীসে কুদসীতে উদ্ধৃত হয়েছে- আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ইফতার ত্বরানি¦তকারী বান্দাগণই আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয়।
সহীহাইন গ্রন্থে সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী হযরত আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রোজাদারের জন্য দু’টি আনন্দ। একটি আনন্দ ইফতার করার সময় এবং দ্বিতীয়টি তার মনিব আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ লাভের সময়। আর জেনে রাখ, রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মিশকের সুগন্ধি হতেও অনেক উত্তম। আর রোজা ঢাল স্বরূপ। তোমাদের একজন যখন রোজা রাখবে, তখন সে যেন বেহুদা ও অশ্লীল কথা-বার্তা না বলে এবং চিৎকার ও হট্টগোল না করে। অন্য কেউ যদি তাকে গালি দেয় কিংবা তার সাথে ঝগড়া-বিবাদ করতে আসে, তখন সে যেন বলে, আমি রোজাদার। একটানা ১২-১৪ ঘন্টা ক্ষুধা-পিপাসার দুঃসহ জ্বালা সহ্য করার পর পানাহার করার অবাধ সুযোগ আসে ইফতারের মুহূর্তে। এ মুহূর্তের জন্য বাড়ির ছোট কচি ছেলেমেয়েরা পর্যন্ত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে এবং ইফতারের মুহূর্তে আনন্দ-ফূর্তি প্রকাশ করে। ইফতারের পূর্ব মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ (সা.) অনেক দোয়া পড়তেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, “ইফতারের সময় রোজাদারের দোয়া কবুল হয় (আবু দাউদ)।” সে জন্যই হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) ইফতারের সময় বাড়ির সবাইকে সমবেত করে দোয়া করতেন।
ফিতরা আদায়
পবিত্র রমযান মাসে অন্যতম একটি আর্থিক ইবাদাত হলো ফিতরা আদায় করা। এ মাসে গরীবদের জন্য ধনীদের উপর সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব করা হয়েছে। ইসলামে ধনী-গরীব সকলে সমান। দুই ঈদের সময় শুধু ধনীরা আনন্দ-ফুর্তি উপভোগ করবে তা ইসলাম কখনোই সমর্থন করেনি। ধনীদের পাশাপাশি গরীবরাও যেন আনন্দ করতে পারে সে জন্য ইসলামী শরীয়তে ঈদুল ফিতরে ধনীদের উপর সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা পরিশোধ করা ওয়াজিব করেছে। বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) মুসলমানদের প্রত্যেক গোলাম, স্বাধীন ব্যক্তি, নারী-পুরুষ, ছোট-বড় সবার উপরে সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব করে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) সাদাকাতুল ফিতরের এ দান ধনীদেরকে ঈদুল ফিতরের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার আগেই বণ্টন করার নির্দেশ দিয়েছেন। যেন গরীব মিসকিনরা এ সাদকা দ্বারা ঈদবস্ত্র ও মিষ্টি খাদ্য ক্রয় করে ঈদের খুশিতে অংশীদার হতে পারে। এবারের মাথাপিছু সর্বনিম্ন ফিতরা সর্বনিম্ন ১১০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২ হাজার ৮০৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সাদাকাহ অর্থ দান করা, প্রদান করা। আর ফিতরা অর্থ ভঙ্গ করা। দীর্ঘ একমাস রোজাব্রত পালন করার পর ঈদের দিন সকালে খাবার গ্রহণের মাধ্যমে ত্রিশ দিনের গড়ে উঠা ঐতিহ্যকে ভেঙে পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরে আসার যে প্রয়াস তাই ফিতরা, আর এ রোজাব্রত পালন করতে যে ছোটখাট অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে যাওয়া একেবারেই স্বাভাবিক। ত্রুটি বিচ্যুতিকে যেন রোজার শেষের প্রথম দিনেই ঝেড়ে মুছে ফেলা যায় তার জন্য যে দান নির্ধারিত করা হয়েছে তাই সাদাকাতুল ফিতর। এ দানের মাধ্যমে দীর্ঘ রোজাব্রত পালনে কোন ঘাটতি থাকলে তাকে পরিশুদ্ধ করে সকল রোজা আল্লাহ পরিপূর্ণ করে দিবেন। অন্য হাদীসে বলা হয়েছে, রোজার মাসের শেষ দিকে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা অবশ্য কর্তব্য।
লাইলাতুল ক্বদর : পবিত্র রমযানে লাইলাতুল ক্বদর একটি নেয়ামতপূর্ণ রাত। লাইলাতুল অর্থ রাত আর ক্বদর অর্থ ভাগ্য। তাই লাইলাতুল ক্বদর অর্থ অতি উচ্চমর্যাদা ও মাহাত্ম্য। এ রাতকে ভাগ্য রজনীও বলা হয়। এ রাতে প্রত্যেক বান্দা গোটা বছর কখন কি খাবে বা কি করবে এসব বাজেট নির্ধারণ করা হয় বলে বলা হয়ে থাকে। তাই এ রাতে আল্ল¬াহর ইবাদাত করে আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজনীয় বিষয় চেয়ে নিতে বলা হয়েছে। আর এ রাত হাজার মাসের চেয়ে উত্তম হিসেবে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন। মূলত এ রাতে পবিত্র কুরআ্ন মজিদ নাযিল হয়েছে বলেই এ রাতের এ মর্যাদা। আর এ রাতের কারণেই পবিত্র রমযান মাসের মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে।
মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) মহিমান্বিত রজনী বা লাইলাতুল কদর তালাশ করার জন্য রমযানের শেষ দশকের বেজোড় রাত্রিগুলোকে বেছে নেয়ার জন্য বলেছেন। এসব রাত্রির মধ্যে যে কোন একদিন লাইলাতুল ক্বদর।
রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি রহস্যময় কারণে তারিখটি সুনির্দিষ্ট করেননি। ইমাম বুখারি, ইমাম মুসলিম, ইমাম আহমদ ও ইমাম তিরমিজি কর্তৃক বর্র্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে- হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘কদরের রাতকে রমযানের শেষ দশ রাতের কোন বেজোড় রাতে খোঁজ করো।’
সবদিক মিলিয়ে পবিত্র মাহে রমযানের অসংখ্য ফজীলত রয়েছে। গোটা বছরের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্ববহনকারী মাস হলো মাহে রমযান। তাই এ মাসকে অত্যাধিক গুরুত্ব দিয়ে সকল ইবাদাত করা প্রয়োজন।
লেখক : সদস্য সচিব, জার্নালিস্ট কমিউনিটি অব বাংলাদেশ।