জসিম উদ্দিন মনছুরি

সাম্প্রদায়িক ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর মুসলিম হৃদয়ে আঘাত হানে। বাবরি মসজিদকে মাটির সাথে গুড়িয়ে দেয়। প্রতিবাদে বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্র হুংকার দিলেও কোন তোয়াক্কা না করে বাবরি মসজিদে নজিরবিহীন আগ্রাসন চালিয়ে হিন্দুত্ববাদীরা ক্ষান্ত হননি। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রায় দু’হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলমানকেও হত্যা করে। অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের স্থাপনায় পুরাণ মিথ রামের জন্মস্থান আখ্যা দিয়ে ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত বাবরি মসজিদকে ধ্বংস করে দেয়। এরপর দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম করেও মুসলমানরা এই পবিত্র ভূমিকে উদ্ধার করতে পারেনি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ৬ ডিসেম্বর ২০২৫ পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে বাবরি মসজিদের আদলে নতুন বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপণ করা হয়েছে। যার নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। বিগত ৬ ডিসেম্বর ২০২৫ বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ৩২ বছর পূর্তিতে মুসলমানদের স্বপ্নের বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের দিন এক অনন্য ধর্মীয় অনুভূতির অনন্য দৃষ্টান্ত পরিলক্ষিত হয়। লক্ষাধিক মুসলমান নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী মসজিদের জন্য দান করে গেছেন। অনেককে একটি কিংবা দুইটি ইট মসজিদের জন্য নিয়ে আসতে দেখা যায়। প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বে বাবরি মসজিদের আদলে নতুন বাবরি মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ একটি বড় কমপ্লেক্সের অংশ হিসেবে নির্মিত হবে স্বপ্নের বাবরি মসজিদ। জনসাধারণের আর্থিক সহায়তায় নির্মাণকাজ চলবে বলে জানা গেছে।এই মসজিদ নির্মাণে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার মানুষ আর্থিক সহযোগিতা করবেন বলে জানানো হয়েছে।

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর তারিখে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং এর সহযোগী সংগঠনের হিন্দু কর্মীরা উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যাতে ষোড়শ শতাব্দীর বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে। ঐ স্থানে হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলো দ্বারা আয়োজিত এক রাজনৈতিক সমাবেশে আগত লোকজন সহিংস হয়ে উঠার পর ধ্বংসযজ্ঞটি সংঘটিত হয়।হিন্দুদের বিশ্বাস অনুযায়ী অযোধ্যা হল রামের জন্মভূমি। ষোড়শ শতাব্দীতে মুঘল সেনাপতি মির বাকি একটি মসজিদ নির্মাণ করেন, যা বাবরি মসজিদ নামে পরিচিত। তিনি যে স্থানে মসজিদটি নির্মাণ করেন তা কতিপয় হিন্দুর কাছে রাম জন্মভূমি বলে অভিহিত হয়ে থাকে। আশির দশকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) তাদের রাজনৈতিক সহযোগী ভারতীয় জনতা পার্টিকে সাথে নিয়ে ঐ স্থানে রাম মন্দির নির্মাণের জন্য প্রচারাভিযান চালায়। রাম মন্দির নির্মাণের জন্য শোভাযাত্রা ও মিছিল আয়োজন করা হয়েছিল। এসব শোভাযাত্রা ও মিছিলের মাঝে অন্তর্ভুক্ত ছিল রাম রথযাত্রা, যার নেতৃত্বে ছিলেন লাল কৃষ্ণ আদভানি। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাসের ১৬ তারিখে কেন্দ্রীয় সরকার মসজিদ ধ্বংসের বিষয়টি তদন্ত করার জব্য অবসরপ্রাপ্ত উচ্চ আদালতের বিচারক মনমোহন সিং লিবারহানের নেতৃত্বে লিবারহান কমিশন গঠন করে। ১৬ বছরে ৩৯৯ বার বৈঠকের পর ২০০৯ সালের ৩০ জুন কমিশন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে ১,০২৯ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদন অনুসারে ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বরের ঘটনা ছিলো পূর্বপরিকল্পিত । ২০১৫ সালের মার্চ মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পিটিশনে অভিযোগ করা হয়, বিজেপি সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সিবিআই এল. কে. আদভানি এবং রাজনাথ সিংয়ের মত প্রবীণ বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে না। আদালত সিবিআইকে তাদের কাজকর্মে দেরি হবার কারণ দর্শাতে অনুরোধ করে।

২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে মুরলি মনোহর জোশি, উমা ভারতী, বিনয় কাটিয়ার এবং অন্যান্য ব্যক্তিদের উপর আনীত অভিযোগের বিচার কার্যক্রম চালানোর জন্য একটি বিশেষ সেন্টার ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন আদালত গঠিত হয়।সে সময়ে বাবরি মসজিদ ও অন্যান্য স্থাপনার ধ্বংসযজ্ঞ সারা ভারতে মুসলমানবিরোধী সহিংসতা ছড়িয়ে দেয়। হিন্দু ও মুসলমানরা একে অপরের সাথে কয়েক মাস ধরে সাম্প্রদায়িক সংঘাতে লিপ্ত হয়। তারা মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের বাড়ি, দোকান এবং মসজিদ জ্বালিয়ে দেয় এবং লুটপাটে লিপ্ত হয়। কিছু বিজেপি নেতাকে কাস্ট্রোরিতে নেওয়া হয় এবং সরকার ভিএইচপিকে নিষিদ্ধ করে। তা সত্ত্বেও মুম্বাই, সুরাট, আহমেদাবাদ, কানপুর, দিল্লি ও ভোপালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থামাতে পারে নি। যে দাঙ্গায় দুই হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হন, যাদের অধিকাংশই ছিলেন মুসলমান। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে বোম্বে দাঙ্গা সৃষ্টি করার পেছনে শিব সেনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। দাঙ্গায় প্রায় ৯০০ জন নিহত এবং প্রায় ৯,০০০ কোটি ভারতীয় রুপির (৩৬০ কোটি মার্কিন ডলার) সম্পদ বিনষ্ট হয়। বিনষ্ট হওয়া সম্পদের অধিকাংশই মুসলমানদের সম্পদ। বাবরি মসজিদ ধ্বংসযজ্ঞ, ১৯৯৩ সালে বোম্বে বোমা হামলা এবং পরবর্তী সময়কালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটনের ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের মত সংগঠনগুলো তাদের হামলাগুলোর কারণ হিসেবে বাবরি মসজিদ ধ্বংসকে উল্লেখ করেছিলেন। সম্প্রীতির দোহাই দিয়ে সাম্প্রদায়িক ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে স্বাধীনতার পর থেকেই হস্তক্ষেপ করে আসছে। অথচ বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুরা বাংলাদেশে মায়ের কোলে বসবাসের মত শান্তিতে বসবাস করে আসছে। রাজনৈতিক কারণে দুই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও তাকে ভারত সব সময় সাম্প্রদায়িক বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। ভারতে মুসলমানদের নির্যাতনের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ঠুনকো অজুহাতে ভারতের মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে। শ্রীরাম বলাতে বাধ্য করে। বাংলাদেশ কিংবা পাকিস্তানে বা অন্যান্য মুসলিম দেশে এরকম হিন্দুদের আল্লাহ কিংবা রসূল বলতে কখনো বাধ্য করা হয়নি। মুসলিম ধর্ম মতে ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিম বা সংখ্যালঘু ধর্মের মানুষের সহঅবস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে। যার যার ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে সে ধর্ম পালন করবে এটা তার ধর্মীয় অধিকার। কিন্তু উগ্রবাদী সাম্প্রদায়িক ভারতীয়রা সব সময় মুসলমানদেরকে দমন পীড়নের লক্ষ্যে যখন ইচ্ছে মুসলমানদেরকে হেনেস্তা ও অপমান করে থাকেন। ভারত তার প্রতিবেশী রাষ্ট্র সমূহের ওপর সব সময় দাদাগিরি করে আসছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও ভারতের দাদাগিরি থামেনি। বিগত স্বৈরাচারী আওয়ামী সরকার ভারতের পৃষ্ঠপোষকতায় ধর্মপ্রাণ মুসলমানদেরকে কোণঠাসা করে রেখেছিল। ভারতের মদদপুষ্ট আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন অবৈধভাবে সরকারে টিকে থেকে মানুষের জান মালের নিরাপত্তার হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ফলশ্রুতিতে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী সরকারের পতন হলে ভারতের দাদাগিরি কিছুটা থেমে যায়।

ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ইতিহাস পুরনো। ব্রিটিশ শাসনামল থেকে ভারত স্বাধীন হবার আগে ও পরে বহু দাঙ্গা সংগঠিত হয়। এসব দাঙ্গায় হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। নিহতদের অধিকাংশই মুসলিম। উগ্রবাদী হিন্দুরা মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে আগ্রাসন চালায়। হিন্দুত্ববাদীদের আগ্রাসনে হাজার হাজার মুসলমান প্রাণ হারায়। ঘরবাড়ি ছাড়া হয়েছে অগণিত মুসলমান পরিবার। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় উগ্রবাদীদের লেলিয়ে দিয়ে মুসলিম নিধন ভারত সরকারের এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে। ভারতে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর অনুসারীদের দ্বারা অন্য ধর্মীয় গোষ্ঠীর অনুসারী এবং প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সহিংসতা, প্রায়শই দাঙ্গায় রূপ নিয়েছে।ভারতে ধর্মীয় সহিংসতায় সাধারণত হিন্দু ও মুসলমানরা জড়িত। ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান, সরকারসহ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক ধর্মীয় প্রতিনিধিত্ব, ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশনের মতো স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলির সক্রিয় ভূমিকা এবং বেসরকারী সংস্থাগুলির দ্বারা স্তর-স্তরের কাজ করা সত্ত্বেও গুরুতর ধর্মীয় সহিংসতার প্রবণতা প্রায়শই ভারতের ইতিহাসে সংঘঠিত হয়ে আসছে। এসব ধর্মীয় ক্রিয়াকলাপ রাজনীতিতেও গভীরভাবে চলে।দেশীয় সংস্থাগুলির পাশাপাশি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলি ভারতে ধর্মীয় সহিংসতার ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২০০৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত, সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় প্রতি বছর গড়ে ১৩০ জন লোক মারা যায় বা প্রতি ১০০০০০ জনসংখ্যায় প্রায় ০.০১ জন মারা যায়। সেই পাঁচ বছরের সময়কালে মহারাষ্ট্র রাজ্যে ধর্মীয় সহিংসতায় মৃত্যুর সংখ্যা সর্বাধিক। যেখানে মধ্যপ্রদেশে ২০০৫ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে প্রতি ১০০০০০ জনসংখ্যায় প্রতি বছর সর্বোচ্চ মৃত্যুর হার ছিল। ২০১২ সালে, ধর্মীয় সহিংসতায় বিভিন্ন দাঙ্গায় ভারত জুড়ে মোট ৯৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০১৮ সালের একটি প্রতিবেদনে, ইউ. এস. সি. আই. আর. এফ হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলিকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হিংসা, ভয় দেখানো এবং হয়রানির মাধ্যমে ভারতকে সহিংস করার জন্য অভিযুক্ত করেছে। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রাজ্য সরকার সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ধর্মান্তর বিরোধী অথবা গবাদি পশু হত্যা বিরোধী আইন প্রয়োগ করেছিল। মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় জড়িত জনতা যাদের পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দুগ্ধ, চামড়া বা গরুর মাংসের ব্যবসায় জড়িত ছিল। অভিযোগ করা হয় খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ধর্মান্তরিত করার জন্য। ২০১৭ সালে “গোরক্ষক” (গরু সুরক্ষা) গণপিটুনির ঘটনায় কমপক্ষে ১০ জনকে হত্যা করেছে। অনেক ইতিহাসবিদ যুক্তি দেন যে, স্বাধীন ভারতে ধর্মীয় সহিংসতা ভারতীয় উপমহাদেশের উপর ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণের যুগে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুসরণ করা বিভাজন ও শাসনের নীতির একটি উত্তরাধিকার।যেখানে স্থানীয় প্রশাসকরা হিন্দু ও মুসলমানদের একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিলেন। এটি একটি কৌশল যা শেষ পর্যন্ত ভারত বিভাজনে পরিণত হয়েছিল।পশ্চিমবঙ্গে নতুন বাবরি মসজিদের কাজ শুরু হওয়ার পর এবার লাখো কণ্ঠে কুরআন পাঠের আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন ভরতপুরের তৃণমূল কংগ্রেসের বহিষ্কৃত বিধায়ক হুমায়ুন কবির। আগামী বছরের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

এর আগে, গত ৬ ডিসেম্বর মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা ২ নম্বর ব্লকের ছেতিয়ানি এলাকায় নতুন বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন হুমায়ুন কবির। তিনি জানান, এই কাজের মাধ্যমে তিনি কোনো অসাংবিধানিক কার্যকলাপ করেননি এবং হাইকোর্টও এ বিষয়ে কোনো অসাংবিধানিকতার অভিযোগ স্বীকার করেনি।তৃণমূল কংগ্রেসের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে হুমায়ুন কবিরকে দল থেকে বরখাস্ত করা হয়। বরখাস্ত হওয়া বিধায়ক বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণ করেছেন, কিন্তু এর বিরুদ্ধে ভারতের মুসলিম সমাজ কোনো প্রতিবাদ করেনি। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাবরি মসজিদ আবারও তৈরি হবে এবং কোনো শক্তি এটিকে আটকে রাখতে পারবে না। হুমায়ুন কবিরের পক্ষ থেকে নতুন বাবরি মসজিদ নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত একটি বড় রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উদ্যোগ হিসেবে ধরা হচ্ছে। এ আয়োজনের মাধ্যমে তিনি রাজ্যের মুসলিম সমাজের ভোটরদের প্রতি প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছেন। একই সময়ে কলকাতার ব্রিগেড পারেড গ্রাউন্ডে সনাতন সংস্কৃতি সংসদের উদ্যোগে পাঁচ লক্ষ কণ্ঠে গীতা পাঠ অনুষ্ঠিত হয় । যা হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে আয়োজন করা হয়। এই দুই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে ধর্ম ও রাজনীতির সংযোগের প্রভাব নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সমগ্র ভারতে ২০২৩-২০২৪ সালে আনুমানিক ২০০ থেকে ২১০ মিলিয়ন মুসলমানের বসবাস। যা ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪.২। ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের পর ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ১৭.২২ কোটি (১৭২.২ মিলিয়ন) মুসলমানের বসবাস ছিল ভারতে।

ভারতের উত্তরপ্রদেশ সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য, এখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম রয়েছে। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে, উত্তর প্রদেশের মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২০ কোটি। এ রাজ্যে প্রায় ৩৮.৪ মিলিয়ন মুসলিমের বাস, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৯.২৬ শতাংশ। ভারতের যেকোনও রাজ্যের তুলনায় উত্তর প্রদেশে মুসলিমদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল লাক্ষাদ্বীপ, সেখানকার প্রায় পুরো জনসংখ্যা ইসলাম ধর্ম পালন করে। এই অঞ্চলে বসবাসকারী প্রতি ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ৯৭ জন ইসলাম পালন করে। যদিও মোট জনসংখ্যা খুবই কম। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে লাক্ষাদ্বীপে মানুষ ৬৪,৪৭৩ জন ছিল। এর মধ্যে ৬২,২৬৮ জন মুসলিম ছিলেন, যা জনসংখ্যার ৯৬.৫৮ শতাংশ। ভারতে মুসলিমদের বসবাসের নিরিখে লাক্ষাদ্বীপের পরেই হল কেন্দ্র শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরের স্থান। ২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুসারে জম্মু ও কাশ্মীরের মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ২৫ লক্ষ, যার মধ্যে ৮৫.৬৭ লক্ষ ছিল মুসলিম, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৮.৩১ শতাংশ।

বসবাসের নিরিখে অসমের মোট জমসংখ্যার ৩৪.২২ শতাংশই মুসলমান। মুসলিমদের বসবাসের নিরিখে দেশে তৃতীয় অসম। তার আগে পশ্চিমবঙ্গ ২৭.০১ এবং কেরালায় ২৬.৫৬ মুসলমান রয়েছে। মুসলমানদের বসবাসের শতাংশের নিরিখে উত্তরপ্রদেশ ১৯.২৬ বিহার ১৬.৮৭ ঝাড়খণ্ড ১৪.৫৩, উত্তরাখণ্ড ১৩.৯৫%, কর্নাটক ১২.৯২%, দিল্লি ১২.৮৬% এবং মহারাষ্ট্রে ১১.৫৪। এসব রাজ্যগুলিতে ১০ শতাংশের বেশি মুসলিম জনসংখ্যার বসবাস। দেশের অন্যান্য সমস্ত রাজ্যে, মুসলমানরা মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশেরও কম। ভারতে হিন্দু ধর্মের পর দ্বিতীয় সর্বাধিক জনসংখ্যা ইসলাম ধর্মাবলম্বী। তবুও উগ্র ভারতীয়রা সংখ্যালঘু মুসলমানদের উপর হর হামেশা জুলুম,নির্যাতনসহ ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে গৃহহীন করে রাখে মুসলমানদের। রাম মন্দিরে অস্তিত্ব আছে মর্মে বাবরি মসজিদকে ধ্বংস করে দেওয়া হলেও খননের পর বাবরি মসজিদের নিচে কথিত রাম মন্দিরের কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। মূলত মুসলমানদের কোণঠাসা করতে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা ছিল ধর্মীয় আগ্রাসনের চিত্র। দীর্ঘ ৩২ বছর আগে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হলেও এই প্রথম মুসলমানদের উদ্যোগে নতুন করে বাবরি মসজিদের ভিত্তপ্রস্তর স্থাপন করা হলো। সংখ্যালঘু নির্যাতনের কাল্পনিক অযুহাত দাড় করিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারত সব সময় আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। বাংলাদেশ সম্প্রীতির নজির স্থাপন করছে বিশ্ব দরবারে। আশা করি ভারতীয় আগ্রাসনীতির বিরুদ্ধে ভারতীয় মুসলমানরা সোচ্চার হবে এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত কিংবা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টিকরলে তার যথোচিত জবাব দেবে। ভারতের আগ্রাসী ভূমিকা এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি।

লেখক : গবেষক, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।