আসিফ আরসালান
আজ রবিবার ৮ ফেব্রুয়ারি। নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য মাঝখানে আর ৩ দিন অবশিষ্ট আছে। এর মধ্যেই প্রধান রাজনৈতিক দলসমূহ, যথা বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি এবং ইসলামী আন্দোলন তাদের নির্বাচনী মেনিফেস্টো প্রকাশ করেছে। কারো ৩৬ দফা, কারো ৩১ দফা ইত্যাদি রয়েছে। শিক্ষিত ভোটাররা এগুলো অবশ্যই পড়বেন। তবে মুশকিল হলো, পূর্ণাঙ্গ মেনিফেস্টো পত্রিকার এক পৃষ্ঠারও অনেক বেশি হয়। সে কারণে একদিনের পত্রিকায় নয়, বরং ধারাবাহিকভাবে সেগুলো প্রকাশিত হয়। তাই অনেকের পক্ষে সম্পূর্ণটা পড়া সম্ভব হয় না।
এর মধ্যে বড় নেতারা বিশেষ করে বিএনপির তারেক রহমান এবং জামায়াতের ড. শফিকুর রহমান দায়িত্ব পেলে কোন কোন বিষয়ের ওপর অগ্রাধিকার দেবেন সেগুলোর আউটলাইন দিয়েছেন। আমি চেষ্টা করি সবগুলোই পড়তে, যাতে করে দলগুলোর আদর্শ ও লক্ষ্য সম্পর্কে একটি নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ ধারণা করা যায়। কারণ এর মধ্যেই দেখছি, বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে মধ্যম পর্যায় পর্যন্ত জামায়াতের বিরুদ্ধে অলীক এবং আজগুবি অপপ্রচার শুরু করেছেন। এর একটি হলো জামায়াত নাকি নারী বিদ্বেষী। তারা নাকি মেয়েদেরকে ঘরে তুলতে চায়। কিন্তু গত ৪ ফেব্রুয়ারি নওগাঁতে আমীরে জামায়াত ড. শফিকুর রহমান নারীদের শিক্ষার ব্যাপারে যে দ্ব্যার্থহীণ ঘোষণা দিয়েছেন তার চেয়ে বেশি মানবতাবাদী এবং প্রগতিবাদী বক্তব্য বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে আর কেউ দিয়েছেন বলে শোনা যায়নি। “একটা মায়ের শিশুকেও লেখাপড়ার বাইরে থাকতে দেব না। মাস্টার্স পর্যন্ত ছাত্রীরা সরকারি খরচে পড়ালেখা করবেন।” নওগাঁর জনসভায় বিপুল করতালির মধ্যে এই দ্ব্যার্থহীন ঘোষণা দেন আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, “যে মায়ের সামর্থ্য নেই, সেই শিশুর দায়িত্ব রাষ্ট্র নেবে। যার নুন আনতে পান্তা ফুরায়, তারও যদি মেধাবী ছেলে থাকে; তার মেধাকে বিকশিত করা হবে। যাতে সে আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রী হতে পারে। এদেশের মানুষের প্রতি তার দায়-দরদ থাকবে, সে বুঝবে এদেশের মানুষ কত কষ্টে জীবন যাপন করে।” জুলাই বিপ্লবে মেয়েদের অবদান তুলে ধরে ড. শফিকুর রহমান বলেন, এক মেয়ে ট্যাংকের সামনে দাঁড়িয়ে বললো, পিছনে পুলিশ, সামনে স্বাধীনতা। মা তার দশ মাসের শিশু কোলে নিয়ে রাস্তায় নেমে বলেছিল। আজকে আমার শিশু একটা নয় লক্ষ কোটি তরুণ যুবক যারা আন্দোলনে নেমেছে সবাই আমাদের সন্তান। সে মায়েদের নিয়ে অপমানজনক আচরণ ইদানীং অনেকে করছেন। আমি বিনয়ের সাথে বলবো, প্লিজ, এগুলো করবেন না। আমরা মায়ের বুকের দুধ খেয়ে বড় হয়েছি, তাদের বিছানায় লালিত পালিত হয়েছি। মায়ের জাতিকে যত সম্মান দিব, আল্লাহ এ জাতিকে তত সম্মানিত করবেন।
যেদিন ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের গায়ে হাত দিয়েছিল সেদিন সাথে সাথে সারাদেশ স্ফুলিঙ্গের ন্যায় ফেটে পড়েছিলো। তার পরের দিনই আপনাদের সন্তান, পার্শ্ববর্তী রংপুরের পীরগঞ্জের যুবক, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবু সাঈদ, আমাদের অহংকার, জুলাইয়ের আইকন রাস্তায় নেমে বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিল। সে বলেছিল, হয় আমার অধিকার দে, নয় একটি গুলি দে। ডানা মেলে বলেছিল, ‘বুকের ভিতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’।
ওপরে ড. শফিকুর রহমানের যে বক্তব্যের উল্লেখ করা হলো এর বাইরেও তিনি অনেক মানবতাবাদী ও কল্যাণবাদী বক্তব্য দিয়েছেন। সেগুলো প্রতিদিনই খবরের কাগজে কম বেশি আসছে। একটি কথা ঠিক যে, ড. ইউনূসের ইন্টারিম সরকার জুলাই বিপ্লবের মূল স্পিরিটকে সমুন্নত রেখেছেন। আর সেটি হলো, কথা বলা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা। যার যা ইচ্ছা তিনি তাই বলছেন। যার যা ইচ্ছা তিনি তাই লিখছেন। কোথাও কোনো রেস্ট্রিকশন নেই। যদিও বল্গাহীন স্বাধীনতা কাম্য নয়। তবে এ স্বাধীনতা দিতে গিয়ে সংবিধান এবং প্রচলিত আইন কানুনও ভঙ্গ করা হচ্ছে। ঋণখেলাপী এবং বিদেশী নাগরিকদেরকেও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেয়া হচ্ছে। এব্যাপারে প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল অব. ইকবাল করিম ভূঁইয়ার বক্তব্য প্রণিধান যোগ্য। তিনি লিখেছেন, “পুরোনো বন্দবস্ত বহাল থাকছে মনে হচ্ছে। বিশাল এ রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান আমাদের শাসক, প্রশাসক ও বিচারকদের মানসিকতার কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি। না হলে কিভাবে খেলাপি ঋণগ্রস্ত ৪৫ জন, দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা ২২ জন প্রশ্নবিদ্ধ প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। ৩০০ আসনে ৬৭ জন প্রশ্নবিদ্ধ এমপি প্রার্থী। ওরা এক পঞ্চমাংশের বেশি”।
ঋণখেলাপি এবং দ্বৈত নাগরিকদেরকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অযোগ্য ঘোষণা করার দাবি করেছিলো জামায়াতে ইসলামী। জামায়াতের নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এতদূরও বলেছিলেন যে, জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যেও যদি ঋণখেলাপি এবং দ্বৈত নাগরিক থাকে তাহলে তাদেরকেও অযোগ্য ঘোষণা করা হোক। কিন্তু নির্বাচন কমিশন তথা সরকার জামায়াতের কথায় কর্ণপাত করেনি। দেখা গেছে প্রতিটি ব্যাপারেই এ সরকার এবং নির্বাচন কমিশন বিএনপির কথায় সায় দিচ্ছে। মনে হচ্ছে যে, ১২ তারিখ পর্যন্ত আসার প্রয়োজন নেই। তার আগেই বিএনপি ক্ষমতায় এসে গেছে। তার আগেই তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেছেন। বিএনপির অন্তত ৩ জন ঋণখেলাপি আছেন যাদের ঋণখেলাপের পরিমাণ ৭শত কোটি টাকারও বেশি। অথচ বগুড়ার একজন প্রার্থীর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিলো ২০ কোটি টাকা যেটি সুদে আসলে হয়েছিলো ৩৮ কোটি টাকা। সে প্রার্থীকে নিয়ম অনুযায়ী ২ শতাংশ অর্থাৎ ২ কোটি টাকা পরিশোধ করে তবেই নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে হয়েছে। কিন্তু ৭শত কোটি টাকা ঋণখেলাপি বিএনপি প্রার্থীদের বেলায় এ নিয়ম প্রযোজ্য হচ্ছে না কেনো? নির্বাচন কমিশনের এ দ্বিচারিতা ইতোমধ্যেই বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে।
এ নির্বাচনে বিএনপির বলার কিছু নেই। আর জনগণকেও দেয়ার কিছু নাই। তাই তারা ৫৪ বছর আগের জাবর কাটছেন। গত ২৯ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁয়ে এক জনসভায় বক্তৃতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীকে ’৭১-এর কৃতকর্মের জন্য মাফ চেয়ে তবেই জনগণের কাছে ভোটের জন্য আসতে হবে। ’৭১-এর বিষয়ে জামায়াত ইতোপূর্বে ৪ বার বক্তব্য দিয়েছে। জনগণ সে বক্তব্য গ্রহণ করেছেন এবং বিষয়টি ইতোমধ্যেই চূড়ান্তভাবে ফয়সালা হয়ে গেছে। কিন্তু এব্যাপারে মির্জা ফখরুলকে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রেসিডেন্ট হিসাবে মনোনীত করেছিলো বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে। তখন জাতীয় সংসদে জামায়াতের সদস্য সংখ্যা ছিলো ১৮ জন। শুধু আওয়ামী লীগ নয়, বিএনপিও এব্যাপারে জামায়াত সদস্যদের সমর্থন চেয়েছিলো। সেদিন জামায়াত বিএনপি প্রার্থী আব্দুর রহমান বিশ্বাসকে সমর্থন করেছিলো।
২০০১ সালে বিএনপি এবং জামায়াত একসাথে নির্বাচন করেছিলো। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ামন্ত্রী সভায় ২ জন জামায়াত সদস্য অন্তভুূক্ত করেছিলেন। এরা হলেন তৎকালীন আমীর মওলানা মতিউর রহমান নিজামী এবং জেনারেল সেক্রেটারি আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। ৯১ এবং ২০০১ এ জামায়াতের সমর্থন নিতে বিএনপির খুব মজা লেগেছিলো। আর ২০২৬ এ সে একই জামায়াত সম্পর্কে বিএনপি আওয়ামী লীগের ন্যারেটিভ উগরে দিচ্ছে। বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়া হলে এমনই হয়।
বিএনপি কোনো দিন নিজের ন্যারেটিভ বানাতে পারেনি। তাই তারা প্রায়শই আওয়ামী লীগের বয়ান এবং তথাকথিত সুশীলদের বয়ান ধার করে। আওয়ামী লীগ এবং সিপিবি জামায়াতের কোনো দোষ খুঁজে বের করতে না পেরে তাদের বিরুদ্ধে এক নতুন তকমা লাগিয়ে দেয়। সেটি হলো, ‘গুপ্ত’। জামায়াত বা শিবির কোনো দিন গুপ্ত রাজনীতি করেনি। শহীদ জিয়া এবং বেগম খালেদা জিয়ার আমল ছাড়া বাংলাদেশের অবশিষ্ট পুরো সময়টাতেই জামায়াত এবং বিশেষ করে শিবিরকে প্রকাশ্য রাজনীতি করতে দেয়া হয়নি। এমনকি আওয়ামী লীগ তো দূরের কথা, ভারতের বিরুদ্ধে কথা বললেও তাকে শিবির ট্যাগ দিয়ে শুধু নির্যাতন নয়, নির্যাতন করে একেবারে মেরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। মেধাবী বুয়েট ছাত্র আবরার আহমেদের হত্যাকাণ্ড তার জ¦লন্ত প্রমাণ।
গুপ্ত রাজনীতি তো চালু করেছে কমিউনিস্টরা। ’৪৭ সালের পর তারা প্রথমে আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং পরে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করে। তারপর জার্সি বদল করে আওয়ামী লীগ হয়ে যায়। মহিউদ্দিন আহমেদ এবং মতিয়া চৌধুরী তার জ¦লন্ত প্রমাণ। এই রকম আরো অনেকেই আছেন। আমরা আর নাম বাড়াতে চাই না। তবে আফসোস হয়, তারেক রহমানের মতো একটি বড় দলের চেয়ারম্যান যখন জামায়াতকে গুপ্ত বলেন এবং বলেন যে, গুপ্তরা নাকি জালেম হয়েছে, তখন তাকে সরাসরি প্রশ্ন করতে চাই-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েট তথা বাংলাদেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিবিরের নাম করলে যে জুলুম করা হতো সেটা তো আপনাদের ছাত্র দল এবং হাসিনার ছাত্রলীগ একসাথে মিলে সে জুলুম নির্যাতন করতো। আপনারা ‘সর্প হইয়া দংশন করবেন আর ওঝা হইয়া ঝাড়বেন’, এমন ভানুমতির খেল দেখিয়ে জনগণকে আর বোকা বানাতে পারবেন না।
বলেছেন যে, গুপ্তরা (আপনাদের ভাষায়) নাকি জালেম। জামায়াত ও শিবিরের একটি জুলুমের নজির দেখান। যদি পারেন তাহলে আমরা আপনাদের অভিযোগ মেনে নেবো। কিন্তু জুলুম তো আপনারাই করেছেন। শেরপুরের শ্রীবর্দীতে জামায়াত নেতা রেজাউল করিমকে তো হত্যা করেছেন আপনরাই। আর এ হত্যাকাণ্ডে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মাহমুদুল হাসানকে পুলিশ ইতোমধ্যেই গ্রেফতার করেছে।
বিএনপির শীর্ষ নেতা, মহাসচিবসহ অন্যদের বলবো, কাচের ঘরে বসে অন্যদের প্রতি ঢিল ছুঁড়বেন না। কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়বে। এ তো সেদিনের কথা, আওয়ামী লীগের ভোট পাওয়ার আশায় মির্জা ফখরুল বলেছেন, শেখ হাসিনা পালিয়ে গিয়ে দেশবাসীকে নাকি বিপদে ফেলেছেন। তিনি থাকলে নাকি অন্তত গণতান্ত্রিক পরিবেশটা বজায় থাকতো।
আহারে গণতন্ত্রের দরদী! হ্যাঁ, শেখ হাসিনা থাকলে আরো অনেক আয়নাঘর প্রতিষ্ঠিত হতো। আরো অনেক গুম খুন হতো। আরো অনেক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হতো। আরো ১৪ শত ছাত্রজনতা খুন হতো। আরো ২৮ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হতো। আরো ১৫ বছর তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারতেন না। মির্জা ফখরুলের ভাষায় এসব লোমহর্ষক ঘটনা যদি গণতান্ত্রিক পরিবেশ হয় তাহলে দোহাই লাগে, জনগণ সে গণতান্ত্রিক পরিবেশ চায় না।