একটি অভাবিতপূর্ব জানাযা প্রত্যক্ষ করলাম যে জানাযায় লোক সমাগম বিশ্ব রেকর্ড সৃষ্টি করেছে।

জুলাই ছাত্র অভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ ওসমান হাদির নামাযে জানাযায় কোটি মানুষের অংশগ্রহণ এ অনন্য রেকর্ড সৃষ্টি করেছে।

গত ১২ জুলাই শুক্রবার জুমার নামায শেষে বাসায় ফেরার পথে জনাব হাদি গুলিবিদ্ধ হন। বন্ধু-বান্ধবরা তাকে তৎক্ষণাৎ হাসপাতালে নিয়ে যান। তার চিকিৎসা অসম্ভব বিবেচিত হওয়ায় রাষ্ট্রীয় খরচে এয়ার এ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে সিঙ্গাপুরে মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রধান উপদেষ্টা তার জন্য দোয়া করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান এবং সারাদেশে দলমত নির্বিশেষে সকল স্তরের মানুষ বিপুল সাড়া দেন। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আবাল-বৃদ্ধ-বণিত সকলের দোয়া, ভালোবাসা ও অশ্রুকে উপেক্ষা করে মাত্র ৩৪ বছর বয়সি এ মর্দে মুমিন আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে দুনিয়া ত্যাগ করেছেন। এ বীর সন্তানকে সম্মানতা জানানো ও তার জন্য দোয়া করতে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কোটি কোটি মানুষ নামাযে জানাযায় শরীক হয়েছেন। বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদেরও এতে অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে থেকে মানুষের অধিকারের দাবিতে স্বোচ্ছার একজন যুবনেতা এত জনপ্রিয় হতে পারেন তা কখনো কল্পনা করা যায় না। ইতোপূর্বে ঢাকার বুকে আমি তিনটি জানাযা দেখেছি যা ছিল অবিস্মরণীয়। প্রেসিডেন্ট জিয়া, অধ্যাপক গোলাম আজম ও মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইনা সাঈদীর জানাযা। এ জানাযাগুলোতে ঢাকা শহর লোকে লোকারণ্য হয়ে গিয়েছিল। তারা খ্যাতিমান ব্যক্তি ছিলেন, বয়সের দিক থেকেও ছিলেন হাদির তুলনায় পরিপক্ক। হাদির জনপ্রিয়তা তাদের স্তরে পৌঁছে যাবে তা কেউ কল্পনা করেননি।

হাদি বিশ্বাস করতেন, গণতন্ত্রের সুষ্ঠু বিকাশ ও সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বার্থে রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতৃবৃন্দের জন্য বিশ্বজনীন গণতান্ত্রিক নীতিমালা মেনে চলা অপরিহার্য এবং এ প্রেক্ষিতে নিম্নোক্ত বিষয়সমূহের ব্যাপারে তাদের অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া আবশ্যক বলে তিনি মনে করতেন। তার দৃষ্টিতে আদর্শ ও কর্মসূচিভিত্তিক রাজনীতিই আমাদের প্রয়োজন, ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি নয়। ভোট কেনাবেচার রাজনীতিকে তিনি প্রচণ্ড ঘৃণা করতেন। শহীদ হাদি ঢাকার একটি সংসদীয় আসনে নির্বাচনেচ্ছুক ছিলেন এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ কর্তৃক তার বয়সের অপরিপক্কতা ও অভিজ্ঞতার স্বল্পতাকে ব্যাঙ্গ করে তার মাত্র ৫০০ ভোট পাবার ভবিষ্যদ্বাণী করায় তিনি সদম্ভে জবাব দিয়েছিলেন যে, বিনামূল্যে এবং ভোটার না কিনে যদি তিনি পাঁচশ ভোটও পান তাহলে সেটা তার জন্য বড় পাওনা। নমিনেশন বাণিজ্যকে তিনি প্রচণ্ড ঘৃণা করতেন। তিনি বলতেন, প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের নিজস্ব ঘোষিত আদর্শ থাকতে হবে। এর পাশাপাশি ঐ আদর্শের ভিত্তিতে দেশকে গড়ে তোলার উপযোগী কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে। তারা জনগণকে ঐ আদর্শ ও কর্মসূচির ভিত্তিতে সংগঠিত করে নির্বাচনে বিজয়ী হবার চেষ্টা করবে। তিনি বিশ্বাস করতেন ক্ষমতার রাজনীতি আদর্শের ধার ধারে না; ছলেবলে, কলে-কৌশলে কোনোরকমে ক্ষমতা দখল করার রাজনীতি মোটেই গঠনমূলক হতে পারে না। দলীয় আদর্শ কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রয়োজনে ক্ষমতা অবশ্যই প্রয়োজন।

তবে ক্ষমতা মাধ্যম মাত্র, চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়, চূড়ান্ত লক্ষ্য আদর্শ প্রতিষ্ঠা। এর আলোকে তিনি আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের অবস্থান ভেবে দেখা ও জনগণ বিশেষ করে ভোটারদের চাহিদা ও চরিত্র যাচাই করার আহ্বান জানাতেন। তিনি ছিলেন একজন বিপ্লবী বীর। ৩৬ জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে অন্যান্য সহযোদ্ধার সাথে লড়াই করে দেশ থেকে জালেম, স্বৈরাচারের উৎখাত করেছিলেন। আধিপত্যবাদ, জালেম, ফ্যাসিবাদ ও চাঁদাবাজ মুক্ত স্বাধীন-সার্বভৌম স্বদেশ ভূমি ছিল তার স্বপ্ন। একাধারে তিনি ছিলেন দার্শনিক, কবি, বিদ্রোহী। তিনি খোয়াব দেখতেন জীবন ও সমাজ বদলানোর। স্রষ্টার খালেছ বান্দা হিসেবে হক্কুল্লাহ ও হক্কুল এবাদের প্রতি দায়িত্ব পালনের। দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর তিনি কড়া সমালোচনা করতেন যার যেখানে ত্রুটি পেতেন, সরকারের কাণ্ডারিদেরও তিনি বাদ দিতেন না, অনেকটা জাতীয় অভিভাবকের ন্যায়। তিনি রাজনীতিতে শোষণ-নিপীড়ন ও চাঁদাবাজি, দখলবাজির বিরুদ্ধে যেমন সোচ্চার ছিলেন তেমনি মনে করতেন যে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে যদি সভ্যতা, ভদ্রতা, নম্রতা, শিষ্টাচার, সৌজন্যবোধ থাকে তাহলে তাদের কর্মীদের মধ্যে হানাহানি হতে পারে না।

রাজনৈতিক ময়দানে গুণ্ডামি, সন্ত্রাস ও ইতরামি চালু থাকার কারণেই ভদ্রলোকেরা এ ময়দানে আসতে ভয় পায়, আসলেও চরিত্র হারায়। মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করতে হলে মানুষকে শ্রদ্ধা করতে হয়। আক্ষেপের বিষয় হচ্ছে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অীধকাংশই পরস্পর পরস্পরকে বন্ধু নয় শত্রু মনে করে হাদি ছিলেন দ্বীনি ও দুনিয়াবী উভয় শিক্ষায় শিক্ষিত ইসলামী অনুশাসনের প্রকৃত অনুশীলনকারী এক মুসলিম যুবক; ঘরে বাইরে সর্বত্র তার চারিত্রিক মাধুর্য ছিল একই ধরনের। একজন মর্দে মুজাহিদের শহীদী মৃত্যু তিনি কামনা করতেন এবং আল্লাহ তাকে কবুল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। হাদি মৃত্যুঞ্জয়ী। কবির ভাষায় বলতে গেলে,

এনেছিলে সাথে করে

মৃত্যুহীন প্রাণ

মরণে তাই তুমি

করে গেলে দান।

হাদি চলে গেছেন। তার এবং তার বিপ্লবের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার দায়িত্ব আমাদের। তার খুনিদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনা আমাদের একান্ত দায়িত্ব। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরাবলী হাদির সন্দেহভাজন খুনি প্রতিবেশি একটি দেশে আশ্রয় নিয়েছে। এ বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে ব্যবস্থা নেয়া দরকার। যে মূল্যবোধ, জীবনাচার ও রাজনৈতিক শিষ্টাচার তিনি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন তা প্রতিষ্ঠা করাই হবে হাদির ন্যায় বীর সন্তানের প্রতি আমাদের সম্মান জানানোর প্রকৃত অভিব্যক্তি। গুণিজনকে সম্মান না করলে গুণিজনের জন্ম হয় না। এ গুণি ব্যক্তিদের নিরাপত্তা দেয়াও আমাদের কর্তব্য। হাদিকে হৃদয়ে ধারণ করা, তার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করা এবং পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণের অঙ্গীকার প্রধান উপদেষ্টা করেছেন। এটি একটি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার। দেশকে সন্ত্রাস, ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের মোকাবিলায় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে মাথা উঁচু করে টিকে থাকার সংগ্রামে আমাদের সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা অপরিহার্য। হাদির জীবন ধন্য হোক, এ দোয়া করি। কবির ভাষায়, সেই ধন্য নরকুলে লোকে যারে নাহি ভুলে, মনের মন্দিরে সদা সেবে সর্বজন।

এখন অন্য প্রসঙ্গে আসি।

রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা, বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান রাজনীতিক ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসর প্রাপ্ত মেজর জনাব আখতারুজ্জামান সম্প্রতি আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী ফরম পূরণ করে এ দলে যোগদানের ঘোষণা দিয়েছেন। তার এ যোগদান তাৎপর্যপূর্ণ। জনাব জামান একজন স্পষ্টভাষী রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘকাল ধরে তিনি একটি দলের সাথে কাজ করেছেন। দেশ ও সরকার পরিচালনায় জড়িত ছিলেন। তার স্পষ্টবাদিতার জন্য তিনি দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন; আবার তার বহিষ্কার প্রত্যাহারও করা হয়েছিল। এবার তিনি দল ত্যাগ করে জামায়াতে যোগ দিলেন। তার জামায়াতে যোগদানকে কেন্দ্র করে তার পূর্ববর্তী দলসহ বিভিন্ন মহল তাকে বিভিন্নভাবে তুলোধুেনা করতেও দেখা যাচ্ছে। তিনি জামায়াতে যোগদান পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে পরিষ্কার বলেছেন যে, একটি সৎ, স্বচ্ছ, জবাবদিহিভিত্তিক কল্যাণধর্মী রাজনীতির অন্বেষায় জামায়াতে যোগ দিয়েছেন, পদ-পদবির আশায় নয়। এর মধ্যে দুর্জনেরা বলতে শুরু করেছেন যে, মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান এমন এক বস্তু যাকে বিএনপি হজম করতে পারেনি, জামায়াতও পারবে না। আমি এ ধরনের আশঙ্কা করি না। জনাব জামানের অতীত রেকর্ড আমি যতদূর দেখেছি তাতে নীতিচ্যুতি বা স্বার্থ চিন্তার আধিক্য কোথাও দেখা যায়নি, সমাজকে দেয়ার স্পৃহা তার মধ্যে প্রবল। শিক্ষা প্রশিক্ষণের সিলেবাস মাড়িয়ে তিনি যদি ইলমি ও আমলি যোগ্যতার মাপকাঠি অর্জন করেন তাহলে জামায়াতের মধ্যে তিনি দেশ ও জাতির সেবার একটি বিরাট প্লাটফরম পাবেন বলে আমার বিশ্বাস।

একটা কথা বলে রাখি, বাংলাদেশে দল পরিবর্তনের ঘটনা নতুন নয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের দল পরিবর্তন করে অনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে ােগদানের ঘটনা খুবই কম। সামরিক অফিসারদের বেলায় এটা তো নেই বললেই চলে।

পাকিস্তান আমলে কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তি নিজস্ব অবস্থান পরিবর্তন করে জামায়াতে যোগদান করার বা জামায়াতের আদর্শ অনুসরণ অথবা সমর্থনের নগণ্য কয়েকটি ঘটনা আছে। পাকিস্তানের এটর্নি জেনারেল ছিলেন জনাব এ কে ব্রোহী (আল্লাহ বক্স করি বক্স ব্রোহী), তিনি পরে দেশীটর আইনমন্ত্রীও হয়েছিলেন। তার সময়ে পাকিস্তান শাসনতন্ত্র প্রণীত হয়েছিল এবং জামায়াতসহ সারাদেশের আলেম-ওলামাদের তরফ থেকে ইসলামী অনুশাসনের ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র তৈরির দাবি উঠেছিল, এ প্রেক্ষিতে করাচিতে (তখন পাকিস্তানের রাজধানী করাচি) তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বললেন যে, কুরআনে ইসলামী শাসনতন্ত্রের কোনো রূপরেখা নেই, যদি কেউ তা দেখাতে পারেন তিনি তাকে পুরস্কৃত করবেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের আমীর মাওলানা আবদুর রহীম তার এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে মাওলানা মওদুদী প্রণীত ইসলামী শাসনতন্ত্র শীর্ষক বইটিসহ বেশ কিছু বই ইসলামী সাহিত্য তাকে উপহার দিয়ে পূর্ব ধারণা মুক্ত হয়ে অন্তত এক সপ্তাহ অধ্যয়নের অনুরোধ করেন। জনাব ব্রোহী মাওলানা রহীমের অনুরোধ রক্ষা করেন এবং বাকী জীবনের ইসলামী আইনে পারদর্শী একজন আইনজ্ঞ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

একজন জেনারেল, মেজর জেনারেল ওমরাও খান, পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জিওসি (General officer commanding) ছিলেন। অবসর গ্রহণের পর তিনি জামায়াতে যোগ দিয়ে ইসলামী আন্দোলনের একজন দায়ীতে পরিণত হয়েছিলেন। একইভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের গভর্নর ও পরবর্তীকালে পাকিস্তানের ইন্টেরিয়র মিনিস্টার মোস্তাক আহমদ গুরমানীও জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়ে দ্বীনের খেদমতে নিয়োজিত হয়েছিলেন। এদের কেউই রাজনৈতিক কোনো উচ্চাকাক্সক্ষা নিয়ে জামায়াতে যোগ দেননি, দ্বীনের খেদমত ও ইসলামী অনুশাসন কায়েমের প্রচেষ্টা চালানোর জন্যই যোগ দিয়েছিলেন।