॥ সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা ॥
আওয়ামী ফ্যাসিবাদ বিদায় দিতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হলেও জুলাই পরবর্তী সময়ে তারা আর ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারেনি। বিপ্লব পরবর্তী সময়ে নিজেদের নানা রাজনৈতিক লাভক্ষতি এক্ষেত্রে অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে দেখা দিয়েছে। উপেক্ষিত হয়েছে দেশ ও জাতীয় স্বার্থ। পক্ষ বিশেষ আওয়ামী আদলে নতুন মোড়কে স্বৈরাচারি হয়ে ওঠার দিবাস্বপ্ন দেখতে শুরু করার কারণেই এ বিচ্যুতি ঘটেছে বলে মনে করার যথেষ্ঠ কারণ রয়েছে। জুলাই চেতনা স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ ও বৈষম্যবিরোধী হলেও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার হীন মানসিকতায় এ চেতনায় যতি পড়েছে। কারণ, মহল বিশেষ আবারো ফ্যাসিবাদী বৃত্তে বৃত্তাবদ্ধ হতে চাচ্ছে। তাদের কাছে দেশ, জাতি ও জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ক্ষমতাই মুখ্য হয়ে উঠেছে। শুধু ক্ষমতা নয় বরং ক্ষমতার যথেচ্ছ অপচর্চা করতেও তারা রীতিমত স্বপ্নবিলাসী হয়ে উঠেছেন। তাই তারা কোনভাবেই জুলাই চেতনা ধারণ করে না; চায় না রাষ্ট্র সংস্কারও। এমনকি তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়নেরও পুরোপুরি বিপরীত মুখী অবস্থান নিয়েছে। এ জন্য তারা আসন্ন গণভোটে ‘না’-এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। প্রকাশ্যে না বলতে পারলেও ইনিয়ে-বিনিয়ে তাদের মুখে সে কথাই উচ্চারিত হচ্ছে। ফলে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী করার জন্য যে জাতীয় ঐক্যমত প্রতিষ্ঠা জরুরি ছিলো, সে ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ থাকা সম্ভব হয়নি। যা জাতির জন্য খুবই দুর্ভাগ্যজনক।
এমতাবস্থায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আসন্ন গণভোটকে ঘিরে দেশের রাজনীতিতে নতুন করে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে মেরুকরণ; সর্বোপরি বিভাজনও। একদিকে গণভোটের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও তাদের দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক সহযোগী ও মিত্র জাতীয় পার্টি (জাপা); অন্যদিকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার এবং জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ১১ দলীয় জোট। এ দু’পক্ষের টানাপড়েনে এখনো অস্পষ্ট অবস্থানে রয়েছে দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি। মাঠ পর্যায়ে প্রচারণা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানাবিধ বয়ান তৈরি এবং বিভিন্ন এলাকায় বিব্রতকর পরিস্থিতি-সব মিলিয়ে গণভোটকে কেন্দ্র করে রাজনীতির উত্তাপ দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। তবে পরোক্ষভাবে তারা ‘না’-এর পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল।
অবশ্য এতদিন গণভোটের বিপক্ষে অবস্থান মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ ছিল আওয়ামী লীগ ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে। ফেসবুক, ইউটিউব ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তারা ধারাবাহিকভাবে গণভোটকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা চালিয়েছে বা এখনো চালিয়ে যাচ্ছে। জাতিকে বিভ্রান্ত করার জন্য পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তিকর নানা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। তারা প্রচার করছে-গণভোট হলে সংসদ নির্বাচন বাতিল হয়ে যাবে, গণভোটের মাধ্যমে দেশের সংবিধান পরিবর্তন করে ‘অরাজকতা’ সৃষ্টি করা হবে, কিংবা এটি বিদেশী শক্তির চাপিয়ে দেয়া কোনো এজেন্ডা। কোথাও কোথাও তারা দাবি করছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে পড়বে। ধর্মীয় কার্ডও খেলছে ইসলামবিরোধী আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগীরা। তাদের মধ্যে একটি পক্ষ অপপ্রচার করছে-গণভোট মানে স্বাধীনতার বিপক্ষে, সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকবে না, বিসমিল্লাহ থাকবে না, আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রাখা হবে না। অন্যদিকে গণভোট শুরু থেকেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। সময়ের সাথে সাথে এ অবস্থান আরো বিস্তৃত হয়ে ১১ দলীয় জোটে রূপ নিয়েছে, যা এখন মাঠে একটি সুসংগঠিত ও দৃঢ় গণভোট সমর্থক শিবির হিসেবে পরিচিত। এ জোট শুধু সংসদ নির্বাচনে নিজ নিজ দলীয় বা জোটের প্রতীকে ভোট চাইতেই সীমাবদ্ধ নয়, তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনমত গঠনের ক্ষেত্রেও সক্রিয়। তারা বিভিন্ন শহর ও গ্রামে সভা-সমাবেশ, উঠান বৈঠক, সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করছে। লিফলেট, প্রচারপত্র এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা সাধারণ মানুষকে সচেতন করছে, গণভোটকে শুধু আইনগত প্রক্রিয়া হিসেবে নয় বরং জুলাই ২০২৪-এর অর্জন ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে উপস্থাপন করছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র সারাদেশেই নির্বাচনী প্রচারণা জমে উঠেছে। জোটের এ প্রচারণা স্থানীয় পর্যায়ে বেশ তুঙ্গে উঠেছে। জুলাই বিপ্লবপন্থী শক্তি ও রাজনৈতিক দলগুলো জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়া মানে শুধু নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়া নয়, বরং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতা রক্ষা ও দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এছাড়া তারা শিক্ষিত তরুণ, নাগরিক সংগঠন এবং সম্প্রদায় ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সমন্বয় করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ জোটের সক্রিয় প্রচারণা জনগণের মধ্যে গণভোট সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করছে এবং ভোটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এবং ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হওয়ার উজ্জল সম্ভবনার সৃষ্টি হয়েছে। যা হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক।
তবে এ দু’শিবিরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে বিএনপি। পরোক্ষভাবে তাদের অবস্থান না হলেও এখন পর্যন্ত দলটির পক্ষ থেকে গণভোট প্রশ্নে কোনো সুস্পষ্ট ও আনুষ্ঠানিক অবস্থান ঘোষণা করা হয়নি। প্রচারণার মাঠে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের গণভোটের পক্ষে বা বিপক্ষে সরাসরি বক্তব্য প্রকাশিত হয়নি বরং কিছু এলাকায় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিপক্ষে প্রচারণার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর বিপক্ষে থাকার সুযোগ নেই। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানসহ কয়েকজন সিনিয়র নেতা ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান নিশ্চিত করেছেন। তবুও ভোটের মাঠে কিছু নেতার বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনা হচ্ছে। যা দলটির অস্বচ্ছ ও স্ববিরোধী অবস্থানের কথায় স্মরণ করিয়ে দেয়।
উল্লেখ্য, রাজশাহীর একজন বিএনপি নেত্রী ধানের শীষ প্রতীকে ভোট চাইতে গিয়ে গণভোটে ‘না’ ভোটের পক্ষে কথা বলেছেন। তার বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। তিনি বলেছেন, গণভোটে ‘না’ মানে বিএনপি এবং ‘হ্যাঁ’ মানে জামায়াত। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব) হাফিজ উদ্দিন আহমেদও ২১ জানুয়ারি লালমোহনে বলেছেন, গণভোটের আইনগত কোনো ভিত্তি নেই। একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী এটি জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। তিনি অবশ্য স্বীকার করেছেন যে, গণভোটের নৈতিক ভিত্তি রয়েছে।
অবশ্য অন্তর্বর্তী সরকার গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে মাঠে নেমেছে। কারণ, এ সরকার জুলাই বিপ্লবের ফসল। সঙ্গত কারণেই সরকারের পক্ষে নিজেদের জন্ম পরিচয়ের বাইরে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সঙ্গত কারণেই উপদেষ্টা, প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মহানগর, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ধারাবাহিক প্রচারণা ও মতবিনিময় সভা চলছে। শিল্প, গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেন, ‘সরকার গণভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। যারা প্রশ্ন তুলছে তারা মূলত পলাতক শক্তি। যারা জুলাই-আগস্টে আত্মহুতি দিয়েছেন, তাদের সহযোদ্ধাদের উদ্যোগেই জুলাই সনদ প্রণয়ন হয়েছে। এ সনদ বাস্তবায়নের জন্যই গণভোটের আয়োজন।’
এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজের বক্তব্য হলো, ‘গণভোটে ‘হ্যাঁ’ প্রচারণা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। যারা রক্ত দিয়েছেন, তাদের স্বজনদের স্বার্থে গণভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। সংবিধান বা জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত অধ্যাদেশে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা ইতিবাচক প্রচারণা করতে পারবে না এমন কোনো বিধান নেই।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বড় দল হিসেবে বিএনপির পক্ষ থেকে পরিষ্কার অবস্থান না থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, যদি বিএনপি প্রকাশ্যে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে কথা বলতো, তা হলে মাঠের চিত্র আরো স্পষ্ট হতো। আবার অনেকে মনে করছেন, বিএনপি কৌশলগতভাবে সময় নিচ্ছে-পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত জানাতে পারে। তবে এমন কৌশল তাদের জন্য বুমেরাং হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল।
সব মিলিয়ে, গণভোট প্রশ্নে রাজনীতির মাঠ এখন স্পষ্টভাবে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। যা কোন ভাবেই কাক্সিক্ষত ছিলো না। এক পাশে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে ‘না’ ভোটের প্রচারণা, অন্য পাশে অন্তর্বর্তী সরকার ও ১১ দলীয় জোটের ‘হ্যাঁ’ ভোটের ডাক। মধ্যবর্তী অবস্থান ও দ্বিধার কারণে বিএনপি গণভোটের রাজনীতিকে আরো জটিল ও অস্পষ্ট করে তুলেছে। জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর আইনিভিত্তি অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। পূর্ববর্তী দু’টি গণভোটে সরকারের অবস্থান সব সময় ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ছিল। গণভোটের মাধ্যমে জনগণের সরাসরি মতামত জানা যাবে এবং এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করবে। সরকার প্রচারণায় আইনগত বাধা নেই-শীর্ষ প্রশাসন ও উপদেষ্টারা সভা-সমাবেশে জনগণকে সচেতন করছেন।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ গণভোট। কারণ, এ গণভোটের মাধ্যমে আগামী দিনে দেশ ও জাতির ভাগ্য নির্ধারিত হবে। মূলত, এ গণভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে জনগণের মতামত নেওয়া হবে। সংসদ নির্বাচনের ভোটের বাইরে ভোটাররা আলাদা একটি ব্যালটে গণভোটে অংশ নেবেন, যেখানে মাত্র চারটি সংক্ষিপ্ত বিষয় উল্লেখ থাকবে। ব্যালটে একটি সরাসরি প্রশ্নের উত্তরে ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দিতে হবে।
অবশ্য গণভোটকে সামনে রেখে অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে সারাদেশে প্রচারণা শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে সরকার নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে গণভোট সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করার উদ্যোগ নিলেও পরবর্তীতে সে কৌশল বদলে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সরকার সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণায় নেমেছে। যা খুবই ইতিবাচক। এ প্রচারণার অংশ হিসেবে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস রেডিও ও টেলিভিশনে প্রচারিত একটি ভিডিও বার্তায় জনগণের প্রতি ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে দেশ বৈষম্য, শোষণ ও নিপীড়নের চক্র থেকে বেরিয়ে আসবে এবং একটি নতুন বাংলাদেশের পথ উন্মুক্ত হবে।
জুলাই সনদটি তৈরি হয়েছে সংস্কার কমিশনের সুপারিশ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনার ভিত্তিতে। এতে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৭টি সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং বাকি ৩৭টি সাধারণ আইন, অধ্যাদেশ কিংবা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। তবে এসব সংস্কার প্রস্তাবের সবগুলো নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হয়নি। বিএনপি, জামায়াতসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল বিভিন্ন প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত জানিয়েছে। শুরুতে একটি প্রস্তাব ছিল-যেসব প্রস্তাবে কোনো দল ভিন্নমত দেবে, তারা ক্ষমতায় গেলে সেসব সংস্কার বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে না। কিন্তু এ বিষয়ে সমাধানে পৌঁছাতে না পারায় সরকার শেষ পর্যন্ত গণভোটের পথ বেছে নেয়।
উল্লেখ্য যে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে আগামী সংসদ এ ৮৪টি সংস্কার বাস্তবায়নে সাংবিধানিকভাবে বাধ্য থাকবে। আর যদি ‘না’ ভোট জয়ী হয়, তাহলে পুরো জুলাই সনদ কার্যকর হবে না। সেক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া সংস্কার কাঠামো বাতিল বলে গণ্য হবে। ‘হ্যাঁ’ ভোটে জয় এলে আগামী সংসদের অধীনে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে। এ পরিষদকে ২৭০ দিনের মধ্যে বা নয় মাসের মধ্যে জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধন সম্পন্ন করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংস্কার না হলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তুত করা সংশোধনী বিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত বলে গণ্য হবে। তবে সমালোচকরা বলছেন, গণভোটের ব্যালটে মাত্র চারটি সংক্ষিপ্ত বিষয় উল্লেখ থাকায় সাধারণ ভোটারদের পক্ষে বোঝা কঠিন-‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিলে বাস্তবে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে। ফলে ভোটারদের অনেকেই প্রকৃত প্রভাব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা ছাড়াই ভোট দিতে পারেন।
‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হলে রাষ্ট্রের নানাবিধ সংস্কার ও পরিবর্তন সাধিত হবে এবং নতুন বাংলাদেশের জন্ম দেবে। বর্তমান সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে শুধুমাত্র বাংলার স্বীকৃতি রয়েছে। জুলাই সনদে বলা হয়েছে, বাংলা রাষ্ট্রভাষা থাকলেও অন্যান্য মাতৃভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হবে। পাশাপাশি ‘বাঙালি’ পরিচয়ের পরিবর্তে নাগরিকদের পরিচয় হবে ‘বাংলাদেশি’। সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে সংবিধান সংশোধন সম্ভব হলেও জুলাই সনদ অনুযায়ী কিছু গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার ক্ষেত্রে গণভোট বাধ্যতামূলক হবে। এছাড়া সংবিধান বাতিলের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান তুলে দেয়া, রাষ্ট্রের মূলনীতিতে পরিবর্তন আনা এবং মৌলিক অধিকারের তালিকায় ইন্টারনেট ব্যবহারের নিশ্চয়তা ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয় যুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
জুলাই সনদ অনুযায়ী জরুরি অবস্থা জারি করতে প্রধানমন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে মন্ত্রিসভার অনুমোদন প্রয়োজন হবে এবং সেখানে বিরোধী দলীয় নেতার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হবে। জরুরি অবস্থার সময়ও মৌলিক অধিকার খর্ব করা যাবে না। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে গোপন ব্যালটে এবং উচ্চকক্ষ ও নি¤œকক্ষের সংসদ সদস্যদের ভোটে। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দু’মেয়াদে সীমাবদ্ধ করা, একাধিক পদে থাকার সুযোগ বাতিল এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদানের ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের সম্মতি বাধ্যতামূলক করার কথাও বলা হয়েছে।
জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন, দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ গঠন, নারীদের সংরক্ষিত আসন সংখ্যা বাড়ানো এবং ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে নির্বাচনের প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া সংসদ সদস্যদের দলীয় হুইপের বাইরে ভোট দেয়ার সুযোগ, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত চুক্তিতে সংসদের অনুমোদন এবং নির্বাচন কমিশন গঠনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। এছাড়াও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ আপিল বিভাগ থেকে, বিচারক নিয়োগে স্বাধীন কমিশন, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, ন্যায়পাল ও দুদকের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে অংশগ্রহণমূলক নিয়োগ প্রক্রিয়া চালুর প্রস্তাব রয়েছে।
সংবিধান সংশোধনের বাইরে থাকা ৩৭টি সংস্কার আইন, অধ্যাদেশ ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে বিচার বিভাগ সংস্কার, জনপ্রশাসন পুনর্গঠন এবং নতুন প্রশাসনিক বিভাগ গঠনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত। তবে এসব বিস্তারিত সংস্কার বিষয় গণভোটের ব্যালটে উল্লেখ থাকবে না। মাত্র চারটি সংক্ষিপ্ত পয়েন্টের ওপর ভিত্তি করেই ভোটাররা ১২ ফেব্রুয়ারি ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেবেন-যার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে জুলাই সনদের ভাগ্য।
সার্বিক দিক বিবেচনায় মনে হচ্ছে, যারা আসন্ন গণভোটে ‘না’-এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তারা জাতীয় স্বার্থের বিপরীতে নিজেদের আত্মস্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থ, ব্যক্তিস্বার্থ, সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থ প্রাধান্য দিয়ে দেশকে নতুন করে স্বৈরাচারি ও ফ্যাসিবাদী বৃত্তে আবদ্ধ করতে চাচ্ছেন। মূলত, তারা পুরনো বন্দোবস্তে নতুন করে ফিরতে চাচ্ছেন। আর যারা ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তারা অপশাসন ও দুঃশাসন মুক্ত নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে প্রত্যয়ী। সঙ্গত কারণেই সারাদেশেই ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় জীবনের একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ দিন। একই সাথে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে সেদিন। যারা দেশকে অতীতের অশুভ বৃত্তে বৃত্তাবদ্ধ করতে চান তারাই সেদিন ‘না’-এর পক্ষে অবস্থান নেবেন। আর যারা ন্যায়-ইনসাফের একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন তাদেরকে অবশ্যই ‘হ্যাঁ’-কে বিজয়ী করার মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচার রুখতে হবে। এক্ষেত্রে দেশপ্রেমী জনতা দৃঢ় প্রত্যয়ী। www.syedmasud.com