মুঘল সম্রাট আকবরের প্রশাসনকে ঘিরে একটি গল্প প্রচলিত আছে। তিনি একবার তার মন্ত্রিপরিষদের সদস্য হিসেবে একজন তবলা বাদককে নিয়োগ দিয়েছিলেন। বলাবাহুল্য, সম্রাট আকবরের একটি নবরত্ন সভা ছিল যাতে তার সাম্রাজ্যের সবচেয়ে যোগ্য, অভিজ্ঞ ও গভীর পাণ্ডিত্যসম্পন্ন ব্যক্তিরা স্থান পেয়েছিলেন। তিনি ১৫৫৬ সাল থেকে ১৬০৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪৯ বছর ভারত শাসন করেছিলেন। তার সময়ে মুঘল সাম্রাজ্যের ব্যাপক সম্প্রসারণ হয়েছিল। তার নবরত্ন সভায় আবুল ফজল ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা ও আকবরনামা গ্রন্থের প্রণেতা, শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন ফয়েজি, তিনি একজন নামকরা কবিও ছিলেন। নওমুসলমান তানসেন ছিলেন সাংস্কৃতিকমন্ত্রী, মোল্লা দোপেয়াজা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বীরবল বৈদেশিকমন্ত্রী, টোডরমল অর্থমন্ত্রী, আবদুর রহীম খান এ খানা, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, ফকির আকিয়াজউদ্দিন ধর্মমন্ত্রী এবং মানসিংহ ছিলেন প্রধান সেনাপতি।

মন্ত্রিসভায় তবলা বাদককে নিয়োগ দেয়ায় নবরত্ন সভার সদস্যরা স্তম্ভিত হয়েছিলেন। সম্রাটের এ সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রতিবাদ করা তাদের জন্য কঠিন ছিল। তারা নিজেরা পরামর্শ করে একটা সিদ্ধান্ত নিলেন। সিদ্ধান্তটি হচ্ছে, একটি তাজিয়া মিছিল বের করা এবং যমুনায় তা বিসর্জন। তারা ঠিক করলেন সম্রাটের কাছ থেকে তারা মিছিলের অনুমতি নেবেন এবং তা করলেনও। নির্দিষ্ট দিনে যথারীতি তারা মিছিলটি বের করলেন। মিছিলে দিল্লীবাসী হাজার হাজার সাধারণ মানুষও যোগ দিল এবং রাজপ্রাসাদ অতিক্রম করে যখন যমুনার দিকে বিসর্জনের জন্য অগ্রসর হচ্ছিল তখন সম্রাট দূত পাঠিয়ে মিছিলটিকে থামতে বললেন। তিনি স্বয়ং মিছিল দেখতে হাজির হলেন এবং দেখলেন যে, মিছিলের সামনে শকটে কোনো লাশ বা শবদেহ নেই, আছে রাজসিংহাসন। সম্রাট-এর তাৎপর্য জানতে চাইলেন। তখন নবরত্ন সভার পক্ষ থেকে প্রধান উপদেষ্টা আবুল ফজল সম্রাটের অভয় নিয়ে বললেন, যে মহামান্য সম্রাট, গোস্তাকি মাফ করবেন। আপনার মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে একজন তবলা বাদককে নিয়োগ দেয়া হয়েছে যা যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার মাপকাঠিতে মেনে নেয়া যায় না বলে আমরা মনে করি। এতে রাজ সিংহাসনের অবমাননা হয়েছে। এজন্য আমরা সিংহাসনের মর্যাদা রক্ষার লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিক শোভাযাত্রার মাধ্যমে এটাকে অর্থাৎ রাজ সিংহাসনকে যমুনায় বিসর্জন দিতে যাচ্ছি। সম্রাট আকবর তার ব্যাখ্যায় সম্বিত ফিরে পেলেন এবং তাৎক্ষণিক আদেশ দিলেন যে, তোমরা মিছিল নিয়ে আর এগোবে না। আমি মন্ত্রী নিয়োগের আদেশ প্রত্যাহার করছি।

গল্পটি মনে পড়লো সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে একজন গার্মেন্টস ব্যবসায়ী নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্কের প্রেক্ষাপটে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশে বিএনপি কর্তৃক সরকার গঠনের বলতে গেলে ঊষালগ্নে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক নিয়োগকৃত একজন গভর্নরকে কোনোরকম কারণ দর্শানোর নোটিশ ব্যতিরেকে বাদ দিয়ে একজন দলীয় ব্যক্তিকে তার স্থলে নিয়োগ দেয়ায় সারা দেশ; বিশেষ করে ব্যাংক ব্যবস্থার বোদ্ধা মহল, শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও মূলধন বাজার বিশেষজ্ঞরা এর তীব্র বিরোধিতা করেছেন। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী নতুন নিয়োগকৃত গভর্নর অর্থনৈতিক বা ব্যাংকিং জগতে সম্পূর্ণ অচেনা একজন ব্যক্তি। তিনি শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে একজন চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট হলেও পেশাজীবী হিসেবে এ ক্ষেত্রে তার কোনো অভিজ্ঞতা নেই এবং গার্মেন্টস ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি বিভিন্ন ব্যাংকের অবৈধ সুবিধাভোগী, প্রায় ৮৯ কোটি টাকার ঋণ খেলাপী। নিয়োগপত্র পাবার পর তিনি গভর্নর হিসেবে তার কাজে যোগদানও করেছেন। তার আগের গভর্নর সম্পূর্ণ নীরবে নিভৃতে বাড়ি ফিরে গেছেন; সহকর্মীদের কাছ থেকে বিদায় নেয়ারও সুযোগ পাননি। যেকোনো দেশেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার সামগ্রিক অর্থ ব্যবস্থার অভিভাবক হিসেবে নিজস্ব মুদ্রা প্রবর্তন, প্রচলন, নোট ছাপা, দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য মুদ্রানীতি প্রণয়ন, আমদানি-রফতানির ভারসাম্য বজায় রাখার লক্ষ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা, ব্যাংক ও ব্যাংক বহির্ভূত অর্থ প্রতিষ্ঠানসমূহের তদারকও সরকারের ব্যাংকার এবং ঋণের সর্বশেষ আশ্রয় Lender of lastresort হিসেবে কাজ করে থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে একটি গতিশীল মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রচলিত মুদ্রার ব্যবস্থাপনা। এক, দুই ও পাঁচ টাকা ছাড়া সকল ব্যাংক নোট ইস্যুর পূর্ণ কর্তৃত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের। সরকারি হিসাব পরিচালনা করা, বাজেট ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে সরকারকে ঋণ দান এবং সরকারি খাতে সামগ্রিক ঋণ ব্যবস্থাপনা তার কাজ। আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা ও ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তফসিলি ব্যাংক ও অর্থ প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যাবলীও তাকে তদারক করতে হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সোনা, বৈদেশিক মুদ্রা ও এসডিআর (Special Drawing Rights) এর আন্তর্জাতিক রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও পালন করে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সংক্রান্ত নিয়মনীতি এবং বিধিবিধান তৈরিও তার দায়িত্ব। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেমনি সরকারকে ব্যাংকিং সেবা দেয়ার একটি প্রতিষ্ঠান তেমনি তাকে অপরাপর ব্যাংকসমূহের ব্যাংকার হিসাবেও কাজ করতে হয়। যেমন তাদের দুঃসময়ে মূলধন ও নগদ অর্থের আকারে সহযোগিতা প্রদান ইত্যাদি। এ ছাড়াও আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ক্লিয়ারিং হাউসের দায়িত্ব পালন এবং দেশের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিবান্ধব আগাম ও ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও মানি সাপ্লাই ব্যবস্থাপনাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ। দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নকে সামনে রেখে যাবতীয় কার্যাবলী পরিচালনার জন্য ১৯৭২ সালে জারিকৃত বাংলাদেশ ব্যাংক আইন অনুযায়ী ব্যাংকটি পরিচালিত হয়। এ আইনটি নতুন হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান নয়, এটি অবিভক্ত ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া ও পাকিস্তানের স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের উত্তরসূরী। যে ভবনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সদর দফতর অবস্থিত তা স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের জন্য নির্মিত হয়েছিল।

বলাবাহুল্য, বাংলাদেশ ব্যাংক আইনে গভর্নর নিয়োগের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো শর্ত বা যোগ্যতার মাপকাঠি বর্ণিত না থাকলেও তার অতীত প্রাকটিসের গর্বিত রেকর্ড ছিল এবং তার ভিত্তিতে গত অর্ধশতাব্দী ধরে গভর্নর নিয়োগ চলে এসেছে। এ সময়ে Conventional Banking-এর পাশাপাশি দেশে Islamic Banking ও অর্থ প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যাপক আবির্ভাব ঘটেছে। এখন সমগ্র ব্যাংক ব্যবস্থার প্রায় এক চতুর্থাংশ ইসলামী ব্যাংকিং-এর আওতায় চলে এসেছে। ডেপজিট ও বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে এই ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাফল্য ঈর্ষাতীত হলেও বিনিয়োগ ক্ষেত্রে শরীয়া পদ্ধতিকে কাজে লাগানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গতিশীল নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে SUKUK শকুকের মতো পদ্ধতির কার্যকরী প্রয়োগের চিন্তাভাবনা চলছে। এ অবস্থায় এ ব্যাংকের নেতৃত্বে যোগ্য লোক আসা জরুরি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, যিনি অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেবেন তার শিক্ষাগত যোগ্যতা বা মেধাশক্তি ও অভিজ্ঞতার বিষয়। বাণিজ্যিক ব্যাংক ও অর্থ প্রতিষ্ঠানসমূহের তদারকী ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থার প্রধান হিসেবে তাকে অবশ্যই উক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যপ্রণালী বিশেষ করে আমানত সংগ্রহ, আগাম ও ঋণ দাদন প্রক্রিয়া, ওভার ড্রাফট ও বিল ডিসকাউন্টিং, এলসি ব্যবস্থাপনা, স্বর্ণসহ মূল্যবান সম্পত্তির তত্ত্বাবধান ও জিম্মাদারি এবং ব্যাংক ব্যবস্থার ৭টি ‘সি’ (Jcs of Banking Prudence) সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান ও ধারণা থাকতে হবে। বস যদি অজ্ঞ হয় তাহলে প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে গর্তে পড়ার আশঙ্কা তার জন্য খুবই বেশি। এজন্য জাতীয় স্বার্থ ও তার নিয়োগে প্রধান নিযামক দলীয় বা স্বজনপ্রীতি নয়।

শেখ হাসিনার আমলে আমাদের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানসমূহের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহও ধ্বংসের প্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। বিদেশে লাখ লাখ কোটি টাকা পাচার, লাখ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ, অর্থ অপচয় ও দুর্নীতি আমাদের সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছিল। বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বের দায়িত্ব যোগ্য ও সঠিক ব্যক্তির ওপর অর্পণ করা না হলে অযোগ্য ব্যক্তিকে সামনে রেখে মূল নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা ‘দাদারা’ পালন করে কিনা তা নিয়ে দেশবাসী শংকিত।