॥ অ্যাডভোকেট আবু হাসিন ॥
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের পথচলা খুব একটা স্বস্তিদায়ক হচ্ছে না। নতুন সরকার এখন ঘরে বাইরে নানাবিধ চাপের মধ্যে রয়েছে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষক মহল। শুরুতেই বিএনপি জোট সরকার বড় ধরনের হোঁচট খেয়েছে। একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন হলেও ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর অভিযোগ উঠেছে ক্ষমতাসীন এবং তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে। প্রথমে এ অভিযোগ তুলেছিলো জামায়াত জোট সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। সে আগুনে ঘি ঢেলে দেওয়া হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ করে। এ বিষয়ে রীতিমত হাটেহাঁড়ি ভেঙে দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রেজওয়ানা হাসান। গ্রাম দেশে একটা কথা প্রচলিত আছে, ‘মেয়েদের পেট পঁচা, তাই তারা কোনো কথা গোপন রাখতে পারে না’। জনাবা রেজওয়ানার ক্ষেত্রেও বোধহয় সে ঘটনায় ঘটেছে। তিনি ফ্রুটিকা খেয়ে সবকিছু অবললীলায় ফাঁস করে দিয়ে যেমন ক্ষতিগ্রস্তদের বিরাগভাজন হয়েছেন; ঠিক তেমনিভাবে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছেন ক্ষমতাসীনদের। বিষয়টি নিয়ে সরকারি পক্ষের রহস্যজনক নিরবতা ঘটনার সত্যতাকে কিছুটা হলেও সত্যায়ন করে। যা সরকারকে অনেকটা ব্যাকফুটে ফেলে দিয়েছে।
এখানেই শেষ নয় বরং বিভিন্ন মহল থেকেই প্রতিনিয়ত ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর অভিযোগ হচ্ছে। টকশো’র ময়দান তো বিষয়টি নিয়ে এখনো সরগরম। এমনটি দাবির পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি, তর্ক ও প্রামাণ্য-ডকুমেন্ট উপস্থাপন করা হচ্ছে। শুধু তাই নয় প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীসহ জোটের শরীকরা নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে বিভিন্ন আসনে ইতোমধ্যেই মামলা ঠুকে দিয়েছে। ফলে বিষয়টি এখন আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। যা নতুন সরকারের জন্য কোন ভাবেই স্বস্তিদায়ক নয় বরং বড় ধরনের ধাক্কা বলেই বিবেচনা করা হচ্ছে। এদিকে জুলাই সনদে বিএনপি জোট স্বাক্ষর করলেও তারা এখন তা বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে না বরং একেক সময় একেক কথা বলে পুরো বিপ্লবের প্রতিই অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে শুরু করেছে। তারা ইতোমধ্যেই ভুলে যেতে বসেছে যে, জুলাই বিপ্লব না হলে তাদের পুনর্জন্ম হতো না। যা তাদের জন্য আত্মঘাতি হবে বলে মনে করেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল।
সার্বিক দিক বিবেচনায় মনে হচ্ছে, নতুন সরকার শুরুতেই নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিও তাদের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজি নির্মূলও সরকারের জন্য সহজসাধ্য হচ্ছে না। মূলত, নতুন সরকারের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ যেমন কম নয়; আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জও এখন রীতিমত গোঁদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দিয়েছে। এখনও সংসদের প্রথম অধিবেশন চলমান রয়েছে। বিরোধী দল শুরুতেই বিভিন্ন ইস্যুতে সংসদ সরগরম করার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এমনকি জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা প্রয়োজনে রাজপথ উত্তপ্ত করার ঘোষণা দিয়ে নতুন সরকাকে সতর্ক করে দিয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ইস্যু। জুলাই সনদে বিএনপি সহ প্রায় সকল দল স্বাক্ষর এবং নির্বাচনের সময় বর্তমান ক্ষমতাসীনদের পক্ষে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ক্যাম্পেইন করা হলেও তারা এখন ভিন্ন সুরে কথা বলতে শুরু করেছেন। গণভোট এবং জুলাই সনদকে তারা অসাংবিধানিক বলতে কসুর করছেন না। কিন্তু একই দিনে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হওয়াকে তারা সাংবিধানিক বলছেন। বিষয়টিকে ক্ষমতাসীনদের স্ববিরোধীতা ও আদর্শিক দেউলিয়াত্ব বললে ভুল হওয়ার কথা নয়।
তবে এসব করে তারা খুব একটা সুবিধা করতে পারছে বলে মনে হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে সকল মহলেই সমালোচনার ঝর উঠেছে। এমনকি সরকারের মন্ত্রীরা বিষয়টি নিয়ে গলাবাজি করলে তা খুব একটা হালে পাচ্ছে না। বিষয়টি ক্ষমতাসীনদের জন্য উপর দিকে থু থু দেয়ার মতই মনে হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে থু থু নিক্ষেপ করে যে তা নিজের ওপরই ফিরে আসে তা তারা বেমালুম ভুলে যেতে বসেছে। এমন আত্মবিস্মৃতি সরকারের জন্য বুমেরাং হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বোদ্ধামহল।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে নতুন সরকার। এক দিকে চীন থেকে অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে দূরত্ব বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যেই বাংলাদেশকে তাগাদা দিচ্ছে। এ চাপ মোকাবেলা করে বাংলাদেশের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক ধরে রাখতে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে চীন। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী মাসে বাংলাদেশ-চীন কূটনৈতিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচনের ঠিক আগে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্ক কমিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তি সই করেছে। এ চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের চাইতে বেশি সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের ব্যবসার সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। বর্তমান সরকার ও বিরোধী দল উভয়ই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সই হওয়া বাণিজ্য চুক্তি সংসদে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পর্যালোচনার পক্ষে।
এমন প্রেক্ষাপটে বিদেশী পণ্যের ওপর নতুন করে আমদানি শুল্ক আরোপের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র যে তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করেছে, তাতে বাংলাদেশকেও অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় (ইউএসটিআর) জানিয়েছে, ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১ অনুযায়ী বিদেশে উৎপাদন ব্যবস্থা, সরকারি নীতি এবং বাণিজ্যিক আচরণ পর্যালোচনার জন্য এ তদন্ত শুরু করা হয়েছে। তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পণ্যের ওপর নতুন আমদানি শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে।
এর আগে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্র বিদ্যমান শুল্কের অতিরিক্ত হিসেবে পাল্টা শুল্ক (রিসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ) আরোপ করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একক বৃহত্তম বাজার। এ বাজারে পণ্য রফতানির জন্য বাংলাদেশ আগে থেকেই প্রায় ১৬ শতাংশ শুল্ক দিয়ে আসছিল। তার ওপর রিসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ হিসেবে আরো ৩৭ শতাংশ শুল্ক বসানোর ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, যা বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এ পাল্টা শুল্কের আদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে অবৈধ ঘোষিত হলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের সব দেশের ওপর গড়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক বসিয়ে দেন। ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, এ সব শুল্ক আরোপের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা।
তবে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের চাপকে মোকাবেলা করতে ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জ্বালানিমন্ত্রীসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সাথে ধারাবাহিক বৈঠক করছেন। বাংলাদেশ-চীন কূটনৈতিক সংলাপে যোগ দিতে চীনের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সান ওয়েই দং ২ এপ্রিল ঢাকা সফর করার কথা রয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর এটা হবে চীনের সাথে উচ্চ পর্যায়ের প্রথম সংলাপ। এর আগে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর ঢাকা সফর করে বাণিজ্য চুক্তির বিধানগুলো বাস্তবায়নের তাগাদা দিয়ে গেছেন। বিষয়টি নতুন সরকারকে অনেকটা বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।
এ দিকে ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ উভয় সঙ্কটে রয়েছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এ চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ অনৈতিক হলেও বাংলাদেশ তার সরাসরি নিন্দা জানাতে পারছে না। কারণ, ইসরাইলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ইরান বিরামহীনভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। এর ফলে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন ও ওমানকে নিয়ে গঠিত গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলোতে প্রবাসী বাংলাদেশীসহ বেসামরিক নাগরিক হতাহত এবং স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনা ঘটছে। এ জিসিসিভুক্ত দেশগুলোতেই বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের একটি বড় অংশের বসবাস।
গণ-অভ্যুত্থানের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেয়া এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু ইস্যুতে ক্রমাগত প্রোপাগান্ডা চালানোর কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর এ সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে শুরু করলেও উভয় দেশের মধ্যে আস্থার সঙ্কটটা এখনো কেটে যায় নি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সঙ্কট মোকাবেলায় ভারতের কাছ থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহ চেয়েছে বাংলাদেশ, যা দেশটি ইতিবাচকভাবে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে। এ ছাড়া ইনকিলাব মঞ্চের নেতা ওসমান হাদি হত্যার মূল দুই আসামিকে ভারতীয় পুলিশ গ্রেফতার করেছে, যাদের তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের জন্য কনস্যুলার অ্যাকসেস চেয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু কর্তৃপক্ষ গ্রেফতারকৃতদের বাংলাদেশে হস্তান্তর করার বিষয়টি নিশ্চিত নয় বরং তারা এদের নিয়ে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা নেয়া থেকে বাংলাদেশকে দূরত্ব বজায় রাখার যুক্তরাষ্ট্রের তাগাদা সম্পর্কে সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদের বক্তব্য হলো, নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ঢাকা এসেই সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে চীন থেকে দূরত্ব বজায় রাখার কথা বলেছিলেন। তিনি মনে করেন, এটা অত্যন্ত অবিবেচক মন্তব্য। কোনো দেশ সংবেদনশীল ইস্যুতে বাংলাদেশকে যদি কিছু বলতে চায় বা আমাদের দিয়ে কিছু করিয়ে নিতে চায়, তবে তা প্রকাশ্যে বলার কথা না। যুক্তরাষ্ট্রের এ অবস্থানে বাংলাদেশ সরকার বা জনগণ নিশ্চয়ই খুশি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র যা বলবে, বাংলাদেশ সরকার সেভাবেই চলবে, এটা প্রত্যাশা করা ঠিক না।
তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আমরা উড়োজাহাজ বা সামরিক সরঞ্জাম কিনতে পারি। কিন্তু সেগুলোর দাম অনেক বেশি। বাংলাদেশের ওপর আরোপিত যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক কমিয়ে আনতে অন্তর্বর্তী সরকার চুক্তি সই করেছিল। এখন নির্বাচিত সরকার এ চুক্তি পর্যালোচনা করতে পারে। চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কোনো শর্ত থাকলে তা পরিবর্তনের জন্য নতুন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলাপ-আলোচনা করতে পারে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সময় লাগতে পারে, কিন্তু তা অসম্ভব নয়। সম্পর্ক ভালো রাখতে হলে দুই পক্ষকেই ছাড় দিতে হবে।
প্রতিযোগিতামূলক দামের কারণেই চীন থেকে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করে থাকে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ভারতের প্রতি বাংলাদেশ নতজানু নীতি গ্রহণ করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তা সত্ত্বেও ওই সময়ে চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীনের অবস্থান ভারতের অনেক উপরে। এ বিষয়টা বিবেচনায় নিয়ে আমরা বলতে পারি, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ভালো করার জন্য চীন থেকে দূরত্ব বজায় রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। বরং বাংলাদেশের স্বার্থেই চীনের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখতে হবে এবং সহযোগিতা বাড়াতে হবে। বর্তমান সরকার সমমর্যাদার ভিত্তিতে সব দেশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার নীতি ঘোষণা করেছে।
নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে মন্তব্য করে কূটনীতিক মহল থেকে বলা হচ্ছে, এ অগ্রগতির চিত্র আমরা ভারত থেকে জ্বালানি তেল আমদানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখতে পাচ্ছি। ভারতকে আমাদের যেমন দরকার, বাংলাদেশকেও ভারতের তেমনি প্রয়োজন। তাই ভারতের সাথে সম্পর্ক একটা স্বাভাবিক ও মর্যাদাপূর্ণ জায়গায় নিয়ে যাওয়াটা খুব জরুরি। পাশাপাশি জাপান, রাশিয়া, ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ অন্যদের সাথে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে আমাদের সম্পর্ক ভালো রাখতে হবে। কিন্তু ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সবকিছুকে সমন্বয় করে চলা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। আর এ ক্ষেত্রে কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জটাই বড় চ্যালেঞ্জ।
এমতাবস্থায় নতুন সরকারকে অত্যন্ত সন্তর্পণে এগুতে হবে। সরকার আগে গুরুত্ব দিতে হবে অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলোকে। সবকিছু বিরোধী দলকে আস্থায় নিয়ে কাজ করতে হবে। সরকারকে মনে রাখা উচিত জুলাই বিপ্লব তাদের পুনরুত্থান ঘটিয়েছে। তাই তাদের পক্ষে এমন কোন কাজ করা সঠিক হবে না যা জুলাই বিপ্লবকে আঘাত করে। একই সাথে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারকে অতিমাত্রায় সুচিন্তিতভাবে এগুতে হবে। কারো প্রতি বৈরিতা বা দাসত্ব নয় বরং রাষ্ট্রের স্বাধীন স্বত্ত্বাকে উচ্চকিত করে আগামী দিনের করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। দেশের আত্মসচেতন জনগণ নতুন সরকারের কাছে সকল ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল আচরণ আশা করে।
লেখক : আইনজীবী ও প্রাবন্ধিক।