মুহাম্মদ ছফিউল্লাহ হাশেমী
হিজরি বর্ষপঞ্জির সপ্তম মাস রজব। হিজরি ১২ মাসের মধ্যে একটি বিশেষ ও মহিমান্বিত মাসের নাম রজব। এ মাসের বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এ মাস আল্লাহ প্রদত্ত চারটি সম্মানিত মাসের (আশহুরে হুরুমের) একটি। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বারো মাসের মধ্যে চারটি মাসকে ‘আশহুরে হুরুম’ তথা সম্মানিত মাস হিসেবে ঘোষণা করেছেন। পবিত্র কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারোটি আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টির দিন থেকে। সুতরাং তোমরা এই মাসসমূহে নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না।’ (সূরা আত-তাওবা, আয়াত নং-৩৪)।
এই চারটি সম্মানিত মাসের একটি হল রজব। আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘বারো মাসে বছর। তার মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। তিনটি ধারাবাহিক : জিলকদ, জিলহজ, মহররম আর চতুর্থটি হল রজব, যা জুমাদাল উখরা ও শাবান মাসের মধ্যবর্তী মাস।’ (সহিহ বুখারি)।
প্রসিদ্ধ মতানুসারে এ মাসেই সংঘঠিত হয়েছে ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম তাৎপর্যবহ ঘটনা ‘মিরাজ’ তথা মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঊর্ধ্বজগৎ পরিভ্রমণ। নবুওয়াত লাভের একাদশ বছরের রজব মাসের ২৬ তারিখ দিবাগত রাতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের বিশেষ মেহমান হিসেবে আরশে আজিমে পরিভ্রমণ করেন তিনি। সেখানে অবলোকন করেন সৃষ্টিজগতের অপার রহস্যময় অনেক বিষয়। এসব কারণে মুসলিম উম্মাহর কাছে এ মাসের গুরুত্ব আরও অনেক বেশি।
রজব মাসের আরো একটি বৈশিষ্ট্য হলো, এ মাস আসে পবিত্র মাহে রমযানের আগমনী বার্তা নিয়ে। তাই এই রজব মাস থেকেই রসুল কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমযান মাসের প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ মাসকে খুবই গুরুত্ব দিতেন। রজবের চাঁদ দেখা গেলেই তিনি কিছু বিশেষ আমল শুরু করতেন। এ মাস শুরু হলে তিনি এই দোয়া পড়তেন, ‘আল্লাহুম্মা বারিকলানা ফি রজাবা ওয়া শাবানা, ওয়া বাল্লিগনা রমাদান।’ অর্থাৎ, ‘হে আল্লাহ! আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসকে বরকতময় করে দিন। আর আমাদের রমযান মাস পর্যন্ত পৌঁছে দিন।’ (সুনানে নাসায়ি ও মুসনাদে আহমাদ)।
পবিত্র হাদিস শরিফে রজবের প্রথম রাতে দোয়া কবুল হওয়ার সুসংবাদ বর্ণিত হয়েছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘পাঁচটি রাত এমন আছে, যেগুলোতে বান্দার দোয়া আল্লাহ তাআলা ফিরিয়ে দেন না, অর্থাৎ অবশ্যই কবুল করেন। রাতগুলো হলো-জুমার রাত, রজবের প্রথম রাত, শাবানের ১৫ তারিখের রাত, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার রাত।’ (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক)।
মূলত রজব ও শাবান মাস হলো রমযান মাসের প্রস্তুতির মাস। এ প্রস্তুতি শারীরিক, মানসিক, আর্থিকসহ সামগ্রিকভাবে নিতে হয়। রমযান মাসে যেহেতু ইবাদতের সময়সূচি পরিবর্তন হবে, তাই সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে হবে এবং রমযান মাসের শেষ দশকে অতীব গুরুত্বপূর্ণ আমল ইতিকাফ রয়েছে, তাই আগে থেকেই তার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।
রজব ও শাবান মাসের নেক আমল ও পাপ বর্জনের মাধ্যমে রমযানের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। তওবা ও ইস্তিগফার করতে হবে। মোহমুক্তি ও পাপ পরিহার করার সক্ষমতা অর্জন করার চেষ্টা করতে হবে।
এ মাসে দান-খয়রাতের পরিমাণ বাড়াতে হবে। রমযানে গরিব মানুষ যেন ভালোভাবে সাহরি ও ইফতার করতে পারে, তা-ও নিশ্চিত করতে হবে। এসব বিষয়ে পরিকল্পনা রজব ও শাবান মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল।
তবে এ কথা অবশ্যই স্মরণ রাখা উচিত, আমল করতে গিয়ে যেন কোনো প্রকার কুসংস্কারে জড়িয়ে না পড়ি। রজব মাসে আলাদা নির্দিষ্ট নামায বা রোজা নেই, যা একমাত্র রজব মাসে আদায় করতে হয়। নফল নামায এবং নফল রোজা নিষিদ্ধ সময় ব্যতীত বছরের যেকোনো সময় আদায় করা যায়। আর রজব যেহেতু সম্মানের মাসের অন্তর্ভুক্ত, এ সময় আমল করলে অধিক সওয়াবের আশা করা যায়, তাই অধিক পরিমাণে নফল নামায ও রোজা পালনে সচেষ্ট থাকবে।
তবে রজবের বিশেষ রোজা হিসেবে ফজিলতপূর্ণ মনে করে রোজা রাখা সুন্নত নয়। বিশেষত, রজবের রোজাকে সুন্নত ও মুস্তাহাব মনে করে নফল রোজা রাখা ঠিক নয়। আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে, ২৭ রজবে রোজা রাখা অনেক ফজিলত। এমনকি অনেকের মধ্যে এ বিশ্বাস রয়েছে যে, এই একটি রোজার ফজিলত এক হাজার রোজার সমান। এ জন্য তাকে হাজারি রোজা বলে অভিহিত করা হয়। অথচ এ রোজার ব্যাপারে সহিহ ও গ্রহণযোগ্য কোনো বর্ণনা নেই। আল্লামা ইবনুল জাওজি, হাফেজ জাহাবি, তাহের পাটনি, আবদুল হাই লখনবি (রহ.) প্রমুখ প্রখ্যাত মুহাদ্দিস এ রোজার ফজিলতকে ভিত্তিহীন ও বানোয়াট হিসেবে অভিহিত করেছেন। (কিতাবুল মাওদুয়াত, ইবনুল জাওজি, তালখিসুল মাওদুয়াত, তাজকিরাতুল মাওজুয়াত)।
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে রজব মাসের ফজিলত অর্জনের তওফিক দান করুন এবং সুন্নাহভিত্তিক আমল করে কুসংস্কার থেকে বেঁচে থাকার তওফিক দান করুন। আমিন!
লেখক : আলেম, প্রাবন্ধিক ও কলেজ শিক্ষক।