॥ মু. শফিকুল ইসলাম ॥
উৎস- পোশাক শিল্প। কিন্তু এই শিল্প আজ এমন এক গভীর সংকটে নিমজ্জিত, যা শুধু অর্থনীতিকে নয়, লাখো মানুষের জীবন-জীবিকাকেও নড়বড়ে করে দিচ্ছে। ছবির তথ্য বলছে- ২২ মাসে ২২৬টি কারখানা বন্ধ, দুই লাখেরও বেশি শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের অব্যাহত সুদহার বৃদ্ধি, এবং খেলাপি ঋণের ভয়াবহ বিস্তার শিল্পটিকে ধসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আরও ভয়াবহ বিষয়- অনেক উদ্যোক্তা ঋণের চাপে দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। এ দৃশ্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক সংকেত।
ধ্বংসের দোরগোড়ায় ২২৬টি কারখানা : ২২ মাসে ২২৬টি কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া শুধু একটি সতর্কবার্তা নয়- এটি সরাসরি শিল্পের ভিত্তিকে নড়ে দেয়া এক ভয়ংকর বাস্তবতা। কাঁচামালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের অস্থিরতা, শুল্ক ব্যবস্থার চাপ, পরিবহন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও রপ্তানি মূল্য প্রায় অপরিবর্তিত থাকা- সব মিলিয়ে উদ্যোক্তারা টিকে থাকতে পারছেন না। এভাবে চললে আরও বড় সংখ্যায় কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
দুই লাখ শ্রমিকের চাকরি হারানো, মানবিক সংকটের বিস্ফোরণ : চাকরি হারানো দুই লাখ শ্রমিক- এ শুধুই সংখ্যা নয়, এ হল দুই লাখ পরিবারে অনিশ্চয়তা, ক্ষুধা, উদ্বেগ ও অস্থিরতার ছায়া। পোশাক খাত নারীর কর্মসংস্থানে বিপ্লব ঘটিয়েছে; কিন্তু একই খাতে আজ সবচেয়ে বেশি চাকরিচ্যুত হচ্ছে নারী শ্রমিকরা। এ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সমাজজুড়ে দারিদ্র্য ও সামাজিক অশান্তি বাড়বে।
জ্বালানি দামের আগুনে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি : গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে একাধিকবার। কিন্তু একবারও পর্যালোচনা করা হয়নি শিল্পখাত সেই দাম বহন করতে সক্ষম কি না। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। যেখানে ভিয়েতনাম, চীন, কম্বোডিয়া স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি দিয়ে উৎপাদন খরচ কমাচ্ছে-সেখানে বাংলাদেশ কেবল ব্যয় বাড়িয়েই যাচ্ছে।
ব্যাংক ঋণের সুদহার, উদ্যোক্তাদের গলায় ফাঁস : ঋণ ছাড়া শিল্প খাত চলতে পারে না। কিন্তু সুদহার যখন ১২% ছুঁয়ে যায়, তখন ব্যবসা মুনাফা দিয়ে সুদ শোধ করাই অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ফল : হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপি, নতুন ঋণ প্রবাহ স্থবির, উদ্যোক্তারা চরম আর্থিক সংকটে নিপতিত, এমনকি কেউ কেউ ব্যবসা রক্ষা করতে না পেরে দেশ ছাড়ছেন- এ ঘটনা অর্থনীতির ওপর আস্থাহীনতার ভয়াবহ প্রমাণ।
বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা হারাচ্ছে বাংলাদেশ : বৈশ্বিক আরএমজি বাজার এখন আগের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি প্রযুক্তিনির্ভর। দ্রুত ডেলিভারি সাশ্রয়ী মূল্য মানসম্মত ডিজাইন কার্বন-নিউট্রাল উৎপাদন এই চারটি মানদ-ে বাংলাদেশ সবচেয়ে পিছিয়ে। সেকেলে উৎপাদন ব্যবস্থা, অদক্ষ শ্রমশক্তি এবং প্রযুক্তিতে দুর্বল বিনিয়োগ আমাদের অর্ডার হারানোর অন্যতম প্রধান কারণ।
উত্তরণের জন্য যা করণীয়- সিদ্ধান্ত এখনই : ১. উৎপাদন ব্যয় কমাতে জরুরি নীতি সংস্কার, গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য শিল্পবান্ধব পর্যায়ে আনতে হবে, কাঁচামালে ভর্তুকি ও শুল্ক রেয়াত দিতে হবে, রপ্তানি খাতে কর সুবিধা দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চিত করতে হবে, এগুলো না হলে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে, কারখানা বন্ধও বাড়তেই থাকবে।
২. ব্যাংক ঋণের সুদহার ৬-৭% এ নামাতে হবে : বিশেষ করে রপ্তানিমুখী খাতে উচ্চ সুদহার অযৌক্তিক। সুদহার কমানো গেলে ব্যবসায়িক স্থিতি ফিরে আসবে, নতুন বিনিয়োগও বাড়বে।
৩. শ্রমিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে হবে অবিলম্বে : ন্যায্য মজুরি, সময়মতো বেতন পরিশোধ, উন্নত কর্মপরিবেশ, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন, শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবেÑএটি ভুলে গেলে চলবে না।
৪. আধুনিক প্রযুক্তিতে রূপান্তর জরুরি : অটোমেশন, নকশা উন্নয়ন কেন্দ্র, ই-কমার্স ভিত্তিক রপ্তানি প্ল্যাটফর্ম, স্মার্ট উৎপাদন লাইনে বিনিয়োগ, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে প্রযুক্তি ব্যবহারের বিকল্প নেই।
৫. রপ্তানি বাজারের বহুমুখীকরণ : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রাজিল, সৌদি আরব, কাতার ও আফ্রিকান দেশগুলোকে লক্ষ্য করে নতুন বাজার তৈরি করতে হবে।
৬. উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা : ব্যবসা ব্যর্থ হলে উদ্যোক্তা যেন দেশ ছাড়তে বাধ্য না হন- সেই আইনি ও আর্থিক সুরক্ষা তৈরির সময় এখনই।
উপসংহার : বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ পোশাক খাতেই বাঁধা পোশাক খাতে রক্তক্ষরণ থামানো মানে শুধু একটি শিল্পকে বাঁচানো নয়- এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার নিরাপত্তা, নারীর কর্মসংস্থান, কর্মজীবী শ্রেণীর স্থিতি এবং সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে বাঁচানো। শিল্পটি আজ মারাত্মক সংকটে। তবে সঠিক সিদ্ধান্ত ও সাহসী নীতি গ্রহণ করা গেলে- এ খাত আবারও শক্তিশালী হয়ে দাঁড়াতে পারে। এখন প্রশ্ন- রাষ্ট্র, শিল্পপতি ও শ্রমিকÑতিন পক্ষ কি একযোগে সেই উদ্যোগ নেবে? সময় কিন্তু খুব বেশি নেই। পোশাক শিল্প বাঁচানো এখন আর বিকল্প নয়, এটি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন- অর্থনৈতিক টিকে থাকার সর্বশেষ শর্ত।