প্রফেসর আর. কে. শাব্বীর আহমদ

সুখ একটি কাক্সিক্ষত বিষয়। প্রকৃত সুখ কী এবং তা কোথায়, কীভাবে পাওয়া যায় এ প্রশ্ন সুপ্রাচীনকালের। সুখের চাহিদার, রূপ-প্রকৃতির শেষ নেই। সুখ বুঝতে কেউ আশ্রয় নিয়েছে দর্শনের, কেউ বিজ্ঞানের। কেউ বস্তুবাদের লালসাপূর্ণ ভোগ-বিলাসিতার মধ্যে সুখের সন্ধান করেছে।

আবার কেউ তার স্রষ্টার মাঝে নিজেকে সমর্পণ করে দেওয়ার মধ্যেই নিজের সুখকে খুঁজেছে। কিছু মানুষ নগদ প্রাপ্তির পার্থিব সুখকে না পাওয়ার বেদনায় হতাশায় ভোগে। মানুষের দ্বিধাগ্রস্ত মন সুখের সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘুরছে। অনেকে কর্পোরেট দুনিয়ায় খ্যাতি অর্জনকে সুখী হওয়ার মোক্ষম উপায় মনে করে। যার খ্যাতি নেই, সে সুখী নয়। এই খ্যাতি অর্জনের নেশায় মানুষ বিবেকশূন্য হয়ে পড়ে।

নিকট অতীতের চাঞ্চল্যকর তথ্যে জানা যায়, হলিউডের এক অভিনেত্রী অভিনয় জগতে খ্যাতির মোহে অন্ধ হয়ে পর পুরুষদের উপভোগের বস্তু হয়েছে। নিজের চরিত্রের সর্বস্ব হারিয়ে এক পর্যায়ে খ্যাতির উচ্চ মার্গে পৌঁছে যায়। ভেবেছিল এতেই বুঝি প্রকৃত সুখ। খ্যাতি আর সুখ লাভের আশায় চরিত্রহীন পুরুষদের বিছানার সামগ্রী হয়েছে। কিন্তু যখন তার বিবেক নাড়া দিল, তখন বুঝতে পারলো এটা আসলে সুখ নয়, সুখের মরীচিকা। নিজের চারিত্রিক অস্তিত্বকে বিলীন করা। পর পুরুষের যৌন কামনার শিকার হওয়া। তখন সে সোচ্চার হলো, প্রতিবাদ জানিয়ে টুইটারে লিখল : ‘If you have been sexually hararesd or assaulted, write `me too’ as a reply to this tweet’ দেখা গেল সেই টুইটারের প্রতি উত্তরে হাজার হাজার টুইট আসতে লাগলো। খ্যাতি লাভের বলিউড আর হলিউডের হাজার হাজার অভিনেত্রী সেই টুইটের সাথে সমস্বরে ‘গব ঞড়ড়’ লিখে প্রতিবাদ জানালো। তারাও তাদের সেই খ্যাতি নামক সুখের ক্ষেত্রে কোনো না কোনোভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

যে খ্যাতি আর সুখের জন্য নায়িকাগুলো নিজেদের চরিত্র বিকিয়ে দিয়েছিল, তারা তখন ঠিকই বুঝেছিল চোখ ধাঁধানো এই কর্পোরেট দুনিয়া মূলত একটি নরককুণ্ড।

কখনো কখনো মিডিয়ায় উপস্থাপিত সুখী মানুষের কিছু করুণ পরিণতির গল্প আমরা শুনতে পাই। যেমন, লিনকিন পার্কের সেই বিখ্যাত গায়কের কথা-দুর্বার খ্যাতিতে উচ্চকিত ছিল যার ক্যারিয়ার। কী সীমাহীন প্রাপ্তি তার! অর্থ-বিত্ত, গ্লামারে ঝলমলে ছিলো তার জীবন! তবু কেন তাকে আত্মহননের পথ বেছে নিতে হলো?

পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত কমেডি শো ‘মিরাক্কেল’ এর উপস্থাপক মীর সর্বনাশা আত্মহত্যা করতে চেয়েছেন বারংবার। কী অদ্ভুত সুখ! বস্তুবাদী দুনিয়া আমাদের যা দিয়ে সুখী করতে চায় এরা তো তার সবই পেয়েছে, তবু কেন এরা সুখী নয়। এদের জীবনের কোথাও যেন ভীষণ অসুখ এদের অসুখী করে তোলে।

বলিউডের এক উঠতি নায়িকা জীবনের শুরুতেই তাক লাগিয়ে দিয়েছিল অভিনয় জগতে। তার খ্যাতি, বিত্ত-বৈভবের কোনো অভাব ছিল না কর্পোরেট দুনিয়ায়। তবুও তিনি কেন জানি কোথাও তিলটুকু শান্তি খুঁজে পাচ্ছেন না। সবকিছু থেকেও তার মনে হয় আসলে তার কিছুই নেই। শূন্য খাঁ খাঁ! লিনকিন পার্কের সেই গায়ক, মিরাক্কেল মীর, নিজের চারিত্রিক সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে খ্যাতি লাভ করা সেই হলিউড, বলিউডের নায়িকারা কী আসলেই সুখী, তারা কী প্রকৃতই তৃপ্ত, পরিতৃপ্ত?

সত্যি কথা হলো, সুখের আসল তত্ত্ব হচ্ছে-সন্তুষ্টি, অল্পে তুষ্টি, আত্মতৃপ্তিবোধ। মানুষ যখন কোনো কিছু পেয়ে সন্তুষ্ট হয় না, তৃপ্ত হয় না তখন তার মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করে। যা পেয়েছে তার চেয়ে বেশি পাওয়ার নেশা তাকে সবসময় তাড়া করে বেড়ায়। ঘুমের মধ্যেও সে থাকে অস্থির। ঘুম ভাঙলেই তার খ্যাতি লাভের পেছনে দৌড়াতে মন চায়। সুখ তাহলে কোথায়?

শুধু অর্থবিত্ত আর খ্যাতিই যদি সুখের মূল হতো, তাহলে ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ পৃথিবীর সেরা ৫ জন সুখী মানুষের একজন। যিনি সবচেয়ে কম বয়সে বিলিওনিয়ার হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি কি আসলেই সুখী! কারণ তার যা অর্জিত হয়েছে তাতে সে সন্তুষ্ট নয়, আরো অনেক অর্জনের রোগ তার মধ্যে জেঁকে বসে আছে। এই যে আরো চাই, আরো পাওয়ার যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, এ মানসিকতাই মানুষকে নৈতিকভাবে বিকলাঙ্গ করে দেয়। লোভ আর লালসার অতলতায় ডুবে গিয়ে ভালো মন্দের বিচার বিবেকের সক্ষমতা সে হারিয়ে ফেলে।

কর্পোরেট দুনিয়ায় সুখের মরীচিকায় ছুটতে গিয়ে হতাশায় ডুবে যাওয়া এমন অনেক মানুষের করুণ গল্পের ইয়ত্তা নেই। এই গল্পগুলো থেকে শিক্ষণীয় হলো, সুখ মূলত শারীরিকে নয়, আত্মিক জগতে। আত্মার প্রশান্তিই হল প্রকৃত সুখ। দেহের খোরাক খাদ্য সংগ্রহের মতো আমরা যদি আত্মার খোরাক সংগ্রহ করতে না পারি তাহলে আমাদের স্বেচ্ছাচারী জীবনের সুখগুলো শুধু করুণ পরিণতিই বয়ে আনবে।

আত্মার খোরাক হচ্ছে আল্লাহর স্মরণ, আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পিত করা, আল্লাহর বিধানের আনুগত্যে আল্লাহর উপর নির্ভরশীল হওয়া। যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনিই সৃষ্টির সুখের জন্য নানা উপায়-উপকরণ উপহার দিয়েছেন। সে উপহার আল্লাহর সন্তোষের মাধ্যমেই লাভ করা যায়। উলঙ্গপনা, বেহায়াপনায় চরিত্র বিকিয়ে সুখ লাভ করা যায় না।

সুখের কুরআনিক ভাষা- ‘সাকিনা’, ‘নফসে মুতমাইন্না’। অর্থাৎ অন্তরের প্রশান্তি। আল্লাহর কাছে সমর্পিত, আনুগত্যশীল মানুষরাই অন্তরের প্রশান্তি লাভ করে।

কুরআনে যেখানে যেখানে সাকিনা শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, সেখানে আমরা ভয়াবহ বিপদ, মুসিবত কিংবা দুর্ভোগের চিত্র দেখতে পাই। সাথে সাথে দেখতে পাই আল্লাহর উপর ভরসা, তার কাছে নিবেদিত বান্দার আত্মত্যাগ। কুরআন এ আত্মত্যাগকে বুঝিয়েছে প্রকৃত সুখ, আত্মার প্রশান্তি।

রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের নিদারুণ সমর্পিত কাহিনিতে কী ভয়াবহতা ছিল। কাফির কুরাইশদের অকথ্য গালাগাল, নির্মম নির্যাতনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুকে সাথে নিয়ে নিজ জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরতের জন্য বের হতে বাধ্য হন। পেছনে কুরাইশদের প্রাণপণ ধাওয়া।

দুর্গম পথ পাড়ি দিতে দিতে এক সময় রাসূল সা. এবং আবু বকর রাদিয়াল্লাহু একটা গুহার মধ্যে আশ্রয় নেন। কুরাইশ বাহিনী একেবারে কাছাকাছি চলে এসেছে। তারা যদি তাদের পায়ের দিকে তাকাতো তাহলেই রাসুল সা. ও আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে দেখতে পেতেন। এমন চরম পরিস্থিতিতে ঘাবড়ে গেলেন রাসূলের সাথী আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু। তাঁকে চিন্তিত দেখে নবী সা. বলেন, চিন্তা করো না আল্লাহ তা’আলা আমাদের সাথেই আছেন।

এমন নাজুক পরিস্থিতিতে আবু বকর রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু যেখানে অস্থির অশান্ত, সেখানে নবী সা. পরম নির্ভরতায় নির্ভিক চিত্তে বললেন, ‘চিন্তা করো না আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।’ আল্লাহর উপর এই যে নির্ভরতা, এই যে তাওয়াক্কুল জীবনের বাঁচা-মরা ও রিজিকের ব্যাপারে- কুরআন এটাকে অন্তরের প্রশান্তি হিসেবে অভিহিত করেছে।

আল্লাহ তা’আলা এই ঘটনা প্রসঙ্গে কুরআনে ঘোষণা করেন, “যখন তারা পাহাড়ের একটি গুহায় অবস্থান করছিল সে (মুহাম্মদ) তার সঙ্গীকে বললো, তুমি চিন্তা করো না, আল্লাহ আমাদের সাথেই আছেন। অতঃপর আল্লাহ তাদের অন্তরে শান্তি ঢেলে দিলেন।” -সূরা আত তাওবা, আয়াত : ৪০

রাসুলে কারীম সা. আল্লাহর ওপর ভরসা করেছেন, এর বদৌলতে আল্লাহ তা’আলা তাঁর হৃদয়ে বইয়ে দিয়েছেন প্রশান্তির ঝর্ণাধারা। এমন প্রশান্তির শক্তিমত্তার সামনে দুনিয়ার কোনো প্রকার ঝঞ্ঝা-দুর্যোগ অতি তুচ্ছ, অতি ভঙ্গুর। জীবনের এমন দুর্যোগ-দুর্ভোগ মুহূর্তগুলোতে নিজেকে মহান মালিক আল্লাহর কাছে সমর্পিত করে দেওয়ার মাঝেই রয়েছে প্রকত সুখ ও প্রশান্তির অমীয় স্বাদ। আল্লাহর সন্তোষ ছাড়া পার্থিব সুখ-সম্পদের পেছনে দৌড়ানো মরীচিকার পেছনে দৌড়ানোর শামিল।

বস্তুবাদী ভোগজগৎ যদি সুখের ঠিকানা হতো, তাহলে কেনো প্রতিনিয়ত আমাদের কানে আর্তচিৎকার আর চাপা কান্নার সুর ভেসে আসে? কেনো দুনিয়ার বেশ সুখী মানুষগুলো আত্মহননের পথ বেছে নেয়? বস্তুবাদী দুনিয়ার চোখ ঝলসানো আনন্দ-জলসায় সুখ নেই। আছে শুধু ধোঁকা আর আত্মপ্রবঞ্চনা।

সুখের বস্তুনিষ্ঠ ও বিজ্ঞানসম্মত সমাধান পাওয়া যায় রাসূল সা-এর বাণীতে : ‘মানুষের শরীরে এমন একটি মাংসপিণ্ড আছে, যেটি সুস্থ থাকলে মানুষের সারা শরীর সুস্থ থাকে। আর যেটি অসুস্থ হলে মানুষের পুরো শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে। আর তা হলো অন্তর। ‘ -সহিহ বুখারী : ৫২, সহিহ মুসলিম : ১৫৯৯

ভালো মানুষীর অভিনয় মুক্ত, আত্মপ্রবঞ্চনা ও পাপমুক্ত হৃদয়ের মানুষটাই প্রকৃত সুখী।

Yes’ magazine একবার একটি সেমিনারে সুখী হওয়ার বিজ্ঞানভিত্তিক উপায় নিয়ে বিভিন্ন দেশের দার্শনিকের গবেষণামূলক কিছু কারণ চিহ্নিত করেছিল। তার মধ্যে একটা হলো, অন্যের সঙ্গে তুলনা এড়িয়ে চলা। অন্য একজন দিন দিন ধনী হচ্ছে, প্রভাবশালী হচ্ছে। আমি হতে পারছি না কেন! এ রকম মানসিকতা এড়িয়ে চললে মানুষ সুখী হতে পারে।

আজকের দার্শনিকরা সুখী হওয়ার জন্য যে কারণ নিয়ে চিন্তা করছেন, আল-কুরআনে আল্লাহ তা’আলা পনেরশ’ বছর আগে ঠিক সে আত্মতৃপ্তির দিকেই ইঙ্গিত করেছেন সুস্পষ্টভাবে। আল্লাহতালার ঘোষণা : “হে রাসুল কখনোই সেসব বস্তুর দিকে তাকাবেন না, যা আমি তাদের (দুনিয়া লোভীদের) উপভোগের জন্য দিয়েছি, এ সব দিয়ে আমি তাদের পরীক্ষা করি। বস্তুত, আপনার রবের (প্রতিপালকের) দেওয়া নির্দিষ্ট রিযিকই হলো সবচেয়ে উত্তম ও চিরস্থায়ী ব্যবস্থাপনা।” -সূরা তোয়া-হা, আয়াত : ১৩১

সম্পদের মোহে বিবেকহীন অন্ধ প্রতিযোগিতাই অসুখী হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ। যে কথা আল্লাহ তা’আলা আল-কুরআনের সূরা আত তাকাসুরের এক ও দুই নং আয়াতে বলেছেন : “একের চাইতে অপরে বেশি বেশি পাওয়ার প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এমনকি এ প্রতিযোগিতায় তোমরা কবর (মৃত্যু) পর্যন্ত পৌঁছে যাও।”

মানুষের মৃত্যু এসে যায় তারপরও তারা সম্পদের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে চলতেই চায়, তাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হয় না। এ অসচেতনতা ও অতৃপ্তিই মানুষকে সুখ থেকে বঞ্চিত করে। এটি একটি অসুস্থ প্রতিযোগিতা। এটি মানুষকে আল্লাহর সঠিক পথ থেকে, আল্লাহর উপর নির্ভরশীলতা থেকে দূরে ঠেলে দেয়। আমরা আল্লাহর দেওয়া রিযিকের ওপর সন্তুষ্ট থাকতে পারি না। এ অসন্তুষ্টি আমাদের অশান্তি বা অসুখের মূল কারণ।

Yes’ magazine এর পরের গবেষণায় বলা হয়েছে, সুখী হওয়ার জন্য আরেকটি উপায় হলো, ‘Smile even when you don’. feel like it’ অর্থাৎ আপনি হাসুন, এমনকি মনে যখন দুঃখ ভর করে, তখনো।

যারা সব সময় প্রাণ খুলে হাসতে পারে তাদের প্রচণ্ড আশাবাদী মানুষ হিসেবে মনে হয়। তাদের মনে সব সময় একটা আশার বাতি জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকে।

এ প্রসঙ্গে রাসুল সা: বলেছেন, “কোনো ভাল কাজকে ছোট মনে করো না, এমনকি যদি সেটা তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে কথা বলাও হয়।” -সহিহ মুসলিম : ২৬২৬

জারির ইবনু আবদিল্লাহ আল-বাজালি রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বলেছেন, “যেদিন থেকে আমি ইসলামে প্রবেশ করি সেদিন থেকে এমন কোনো দিন রাসূল সা-এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়নি, যখন তার মুখে হাসি ছিল না।” -সহিহ বুখারী : ৩০৩৫, সহীহ মুসলিম : ২০৪৭৫

মানুষের হৃদয়ের গভীরে যদি কোনো একটা বড়ো ভরসার স্থল বা নির্ভরতার উৎস না থাকে তাহলে সে মানুষ নির্মম হতাশায় নিমজ্জিত হবে। আমরা ইতিহাস থেকে জেনেছি, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে প্রচণ্ড বাধা ও প্রতিকূলতার কাহীনি। তাঁর ও সাহাবাদের জীবনে সীমাহীন বাধা-বিপত্তি, দুর্যোগ, নির্যাতন নেমে এসেছিল। তারপরও রাসূল সা. সব সময় আশাবাদী একজন মানুষ ছিলেন। তিনি কখনোই হতাশায় ভোগেননি। তাঁর জীবন ছিল সব সময় হাসিখুশি ও কর্মচঞ্চলতায় ভরপুর।

Yes’ magazine এর গবেষণায় আরেকটি বিশেষ দিক ছিল, সব সময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা ও অসহায়কে সহায়তা করা। অর্থবিত্তের পেছনে পেরেশান না হওয়াকেও তারা সুখী হওয়ার একটি নিয়ামক হিসেবে উল্লেখ করেছে। তারা বলেছে, Put money low on your list of properties’

ইসলামী দর্শনণেও কৃতজ্ঞ হওয়ার ব্যাপারে ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একজন মুমিনের পুরো জীবনটাই কৃতজ্ঞতার বন্ধনে সুস্থিত। সুখে দুঃখে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে একজন মুমিন বলে, ‘আলহামদুলিল্লাহ’- সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা’আলার জন্য। এ কথা বলে সে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়। এ প্রসঙ্গে রাসূল সা. বলেছেন,’ মুমিনের সব ব্যাপারটাই আশ্চর্যের। তার সকল বিষয়ই কল্যাণকর। সে যখন সুখে থাকে, তখন সে তার রবের প্রতি কৃতজ্ঞ হয় এবং এটা তার জন্য উত্তম। আবার সে যখন কঠিন দুঃখ কষ্টের ভেতরে পড়ে, তখন সে সবর করে এবং তার রবের কৃতজ্ঞতা জানায়। এটাও তার জন্য উত্তম। ‘ -সহিহ মুসলিম : ২৯৯৯

মুমিন জীবনের প্রতিটি অধ্যায় তার রবের কৃতজ্ঞতায় পরিপূর্ণ থাকে। আখিরাতের অনন্ত জীবনের সুখের জন্য দুনিয়ার জীবনে মহান আল্লাহ তা’আলার আনুগত্য এবং তার সন্তোষের পথে জীবনটা পার করে দেওয়াতেই মুমিনের সত্যিকারের সুখ।

এ রঙিন দুনিয়ায় ইট পাথরের অট্টালিকার কুঠুরিতে সুখ নেই। সুখ নেই বস্তুবাদী, ভোগবাদীদের বড় হওয়া আর সেলিব্রেটির মানসিকতার মাঝে। এসব নিছক চোরাবালি, নেশার মতো। মরণফাঁদের কিনারায় পা ফসকে গেলে যেমন তলিয়ে যেতে হয় অতল সমুদ্রের অতল তলে। এ সীমাহীন চাওয়া-পাওয়ার দুনিয়া ঠিক তেমনি। পা ফসকে গেলেই মহাবিপদ।

আল্লাহ তাআলার ভাষায় : “এই দুনিয়ার জীবন নিছক খেল তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়।” -সূরা আল আন’আম, আয়াত : ৩২

আমাদের রব আল্লাহ তা’আলা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, দুনিয়া হল শুধু খেল তামাশার একটি ক্ষণভঙ্গুর ক্ষেত্র। একটা ধোঁয়াশা, একটা অন্ধকার কূপের ফাঁদ।

যারা আল্লাহদ্রোহী, আল্লাহর আনুগত্যহীনতায় পাপচারিতা, ভোগবাদিতা ও স্বেচ্ছাচারী জীবনে ডুবে যায়, তাদের পরিণতি জাহান্নাম। এ জাহান্নামকে আল্লাহতা’আলা এটি ফাঁদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

আল্লাহ তাআলার ভাষায় : “নিশ্চয়ই জাহান্নাম একটি ফাঁদবিশেষ। যা আল্লাহদ্রোহীদের আবাসস্থল। সেখানে তারা যুগের পর যুগ পড়ে থাকবে। সেখানে তারা উত্তপ্ত পানি ও রক্তাক্ত ক্ষতের ক্ষরণ ছাড়া কোনো রকম ঠাণ্ডা ও পানযোগ্য জিনিসের স্বাদ পাবে না।” -সূরা আন নাবা, আয়াত : ২১-২৫

কী ভয়াবহ পরিণতির সম্মুখীন হবে সীমাহীন অতৃপ্তির ভোগবাদীরা। ভোগবাদীরা দুনিয়ায় সুখ বলে যা ধারণা করে, তা শুধুই মরীচিকা।

প্রকৃতসুখ নিশ্চিত আছে আল্লাহ তা’আলার আনুগত্য ও জীবন সম্পদ উৎসর্গ করে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায়। এ কঠিন ও অপ্রিয় সত্য যে বুদ্ধিমান মুমিনরা বুঝতে পেরেছে তারাই পেয়েছে সত্যিকারের সুখের ঠিকানা। তাদের মনোরাজ্যে অল্পে তুষ্টি আর কৃতজ্ঞতার অশ্রুতে ভেসে আসে সুখের ফোয়ারা। তারা সুখ পায় গভীর রজনীতে প্রিয় মাওলার কাছে দো’জাহানের কল্যাণে সিজদাবনত আকুল প্রার্থনায়।

লেখক : গবেষক, প্রাবন্ধিক, কবি ও গীতিকার।