হারুন-আর-রশিদ

মানিক মিয়া এভিনিউয়ে ২০ ডিসেম্বর শনিবার জানাযায় গিয়ে হতবাক হয়ে যাই মানুষের বাঁধভাঙা শ্রোতের দৃশ্য দেখে। আমার ৭৬ বছর বয়সে কোনো জানাযায় এতো মানুষ সমাগম হতে দেখিনি। বিদেশী গণমাধ্যমে জানা যায়, বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে এটাই অন্যতম সর্ববৃহৎ জানাযা ছিল। কয়েক লক্ষ্য মানুষ জানাযায় অংশ নিয়েছিল। এটা ছিলো হাদীর প্রতি ১৮ কোটি মানুষের সীমাহীন ভালবাসা। মানিক মিয়া এভিনিউর দেড় বর্গকিলোমিটারের চত্বর ছাড়িয়ে তা ফার্মগেট ও মিরপুর রোডের সোবহান বাগ মসজিদ পযর্ন্ত জনস্রোত প্রসারিত হতে দেখা গেছে এ সময়। দেশে ও বিদেশে তার একাধিক জানাযায় জনসমাগম হওয়ার দুটি মৌলিক কারণ হলো সে দেশ ও জাতির কথা হৃদয় দিয়ে ভাবত, যাকে বলে অকৃত্রিম ভালবাসা। খুব কম বয়সে তার ভেতরে জাতিসত্তার যে চেতনার বীজ অঙ্কুরিত হতে আমরা দেখেছি তা বিস্ময়কর। জীবনের প্রথম ধাপ মাদরাসায় শুরু। সেখানেই তার নৈতিক শিক্ষার ভীত মজবুত হয়। ছাত্রজীবনের শুরু থেকেই হাদী অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। দাখিল, পঞ্চম এবং অষ্টম শ্রেণিতে টেলেন্ট পুলে বৃত্তি পেয়েছেন। ঢাবিতে পড়াশুনা শেষে শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন এবং একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজির শিক্ষক হিসাবে জীবনের ক্যারিয়ার শুরু করেন। হাদী তার নানা- বক্তব্যে তার মৃত্যুর কথা অকপটে বলেছেন। মূলত তার চেতনায় মৃত্যুর ঈঙ্গিত ফুটে ওঠে। তিনি বলেছেন, সত্য বলায় আমি মরে যাব। আমার সন্তানের কি হবে। এই চিন্তাটা তার মাথায় অহরহ প্রেসার ক্রিয়েট করতো। অবশেষে হাদীর মৃত্যুর পর রেমিট্যান্স যোদ্ধারা বলেছে আমরা হাদীর সন্তানসহ তার পরিবারের আর্থিক ব্যয়ভার বহন করবো যা বহুল প্রচারিত একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলতেন, আমি মৃত্যুর এক সেকেন্ড আগেও সত্য কথা বলে যাবো। তিনি আল্লাহর কাছে শহীদী মৃত্যুর প্রত্যাশা করেছিলেন। আর সেটাই হয়েছে। বান্দার সাথে আল্লাহর এই কানেকশন নিয়তের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। বিপ্লবীতে হাদী ছিলেন তার জলন্ত প্রমাণ। দেখুন তার মৃত্যুটাÑÑ ১২ ডিসেম্বর শুক্রবার দুপুরে ঢাকার পুরানো পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে শরীফ ওসমান হাদীকে মাথায় গুলী করে দুর্বৃত্তরা। মহান রবের কি সুন্দর পরিকল্পনা- সুবহানাল্লাহ..! ১২ ডিসেম্বর শুক্রবার গুলীবিদ্ধ, এর পরের শুক্রবার ১৯ ডিসেম্বর শাহাদাৎ বরণ। দিনটি এবং হাদীর নেক মকসুদ মহান রবের দরবারে শহীদী মৃত্যু হিসেবে সাব্যস্ত হয়। হাদী যে আল্লাহর অত্যন্ত প্রিয় বান্দা ছিলেন সেটা পরিষ্কার হয়ে যায় তার দাফন-এর স্থানটির দিকে তাকালে। বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের পাশেই তাকে সমাধিস্থ করা হয়। কত বড় মাপের মানুষ হলে এরকম একটি দামি জায়গায় নিজের শেষ ঠিকানা খুঁজে পায়। মাত্র ৩২ বছর হায়াত পেয়েছে। এই অল্প বয়সে অত্যন্ত ভাগ্যবান বলেই কোটি মানুষের কান্না মিশ্রিত আন্তরিক দুআ পেয়েছেন শরীফ ওসমান হাদী। নিশ্চয়ই আসমানে-এর চাইতেও বড় রাজকীয় অভ্যর্থনার আয়োজন চলছে। বিপ্লবী শরীফ ওসমান হাদী মরেও কেন অমর, সে কথার প্রতিধ্বনি শোনা যায় তার জীবদ্দশায় কর্মযজ্ঞে। খুব স্বল্প সময়ে ‘ইনকিলাব মঞ্চ দিয়ে তার আযাদী সংগ্রাম শুরু’ যা ছিল নির্মোহ এবং ১৮ কোটি মানুষের হৃদয় স্পন্দন। ওসমান হাদীর জীবনের কয়েকটি শেষ বার্তা ১) আমি ওসমান হাদী অন্যায়ের সামনে মাথা নত করি না। ২) শান্ত থাকতে জানি, কিন্তু জেগে উঠলে ঝড় থামে না। ৩) ক্ষমতা আমার অহংকার না, দায়িত্ব..! ৪) সময় আসলে সত্য নিজেই কথা বলে। ৫) ভয় দেখিয়ে আমাকে থামানো যাবে না। ৬) আমি প্রতিশোধে বিশ্বাসী নই, ন্যায়ে বিশ্বাসী। ৭) চুপ থাকা দুর্বলতা নয় এটা প্রস্তুতি। ৮) যেখানে ন্যায় নেই, সেখানে আমার যুদ্ধ। ৯) আধিপত্যবাদী এবং ভারতীয় দালাল ছাড়া সবাই আমার বন্ধু। ১০) আমার দেশকে আমি জীবনের চেয়ে বেশি ভালবাসি-এটা আমার দেশপ্রেম। ১১) প্রার্থী দেখে ভোট দেবেন প্রতীক দেখে নয়। হাদী কেমন মানুষ ছিল এই কয়েকটি কথায় উপলব্ধি করা যায়। হাদীর দারুণভাবে চলে যাওয়া দেখে দারুণ লোভ হচ্ছে আমার, হাজার বছর রাজত্ব করলে এমন চলে যাওয়া সত্যি বিষ্ময়কর। বিশ্বাস করুন এমন একটা মানুষ নাই যে হাদীর জন্য দোয়া না করছে। এই প্রথম কোন দেশপ্রেমিক সাধারণ একজন রাজনীতিবিদের জন্য এমন অসাধারণ প্রতিক্রিয়া বা আহাজারি করে কাঁদতে দেখেছি। সে ভালো না খারাপ আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার দুই চোখের পানি তা প্রমাণ করে। অনেককে বলতে শুনেছি হাদী মরে নাই গোটা বাংলাদেশ মরে গেছে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানুষ বিধায় আন্তর্জাতিক ভাবেও তার পরিবারের কাছে শোক বার্তা পাঠিয়েছে পশ্চিমা জগৎ, এ এক বিশাল প্রাপ্তি। জাতিসংঘের মহাসচিব হাদীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর সুষ্ঠু বিচার তদন্ত করার জন্য সরকারের কাছে বার্তা পাঠিয়েছেন। অধিকন্তু তদন্ত সাপেক্ষে বিশ্ব মানবাধিকার সংগঠন হাদীর খুনের বিচার চেয়েছেন। দূঃখজনক যে বিপ্লব-উত্তর গঠিত বর্তমান সরকার পিলখানা থেকে শাপলা চত্বর এবং জুলাই বিপ্লবে শতশত মানুষের গণহত্যার বিচার করতে পারেনি। বিচার কখনো হবে কিনা তাও প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে থেকে যায়। তাহলে জুলাই, শাপলা এবং পিলখানা তাদের রক্তের কি কোনো দাম নেই? ইনসাফ কি মরে গেছে। সব কয়টি গণহত্যার বিচার জাতি প্রত্যাশা করে। গণহত্যার বিচার না হলে এ দেশে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকা কঠিন। ফ্যাসিস্ট হাসিনা দিল্লীর সহযোগিতায় শাপলাসহ পিলখানা এবং জুলাই ৩৬ হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল। চলে গেলেন আজাদীর সন্তান, রেখে গেলেন দেশ প্রেমিকদের জন্য অসমাপ্ত লড়াই। ‘এক কথার মানুষ’ শহীদ শরীফ ওসমান হাদী একটি মেসেজ দিয়েছিলেন ‘জীবন দেবো জুলাই দেবো না’। ওসমান হাদী কোন দলের ছিলেন না। তিনি ছিলেন এ দেশের ১৮ কোটি মানুষের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ও প্রাণস্পন্দন। হাদী লোভ আর টাকার শিকলে আটকা পড়ে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির গোলামি করেননি। হাদীর স্বপ্ন ছিল একটি ইনসাফের রাষ্ট্র কায়েম হোক ৫৬ হাজার বর্গমাইল বেষ্টিত এই ভূখণ্ডটিতে। জনগণকে শেষ বার্তা দিয়ে গেছেন এই বলে অসমাপ্ত বিপ্লবকে আপনারা সম্পূর্ণ করেন। ইনসাফের বাংলাদেশ গঠন না হওয়া পর্যন্ত আপনারা শান্ত হবেন না। হাদী তার পূর্বসুরিদের আত্মত্যাগের ব্যাপারে বলেছেন, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ যেন ‘শহীদ আবরার ফাহাদ’ নামে হয়। তার একটিই কথা ভারতীয় দালালদের নামে যেন কোনো স্মৃতিফলক বাংলাদেশের জমিনে না থাকে। জুলাই সনদকে উপেক্ষা করে যদি নির্বাচন হয়, আর সেই নির্বাচনে যারা ক্ষমতায় আসবে সেটা হবে ‘বাকশালি সরকার’। সেটা বুঝতে পিএইচডি করা লাগে না। ৮ আসনের একজন নেতা বললেন, তুমি ৮ আসনে কেন দাঁড়িয়েছ। তুমি জাতীয় নির্বাচনের উপযুক্ত নও, আগে কাউন্সিলর হওয়ার চেষ্টা করো। উত্তরে হাদী বলেছিলেন, আমি এই এলাকার ভোটার। তাই সংসদ সদস্য হিসেবে উপযুক্ততা যাচাই করা আমার নাগরিক অধিকার। আমি সংসদ সদস্য নই, জাতিসংঘের মহাসচিব হওয়ার স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন দেখা কি অপরাধ? আরেক নেতা বলেছিলেন প্রস্রাব করে প্রতিপক্ষকে ভাসাইয়া দিব। উত্তরে হাদী বলেছিলেন, ১৬ বছর তো কিছুই করতে পারেননি। তখন কেন ভাসাইয়া দিতে পারলেন না। বৈসম্য বিরোধী কিছু ছাত্রনেতা আবাবিল পাখি হয়ে হাসিনার তখতে তাউস গুঁড়িয়ে দিয়েছিল ৫ই আগস্ট ২০২৪ এ। এসব কথা ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়। তোলপাড় শুরু হয়। গোটা পৃথিবী তা দেখেছে। মনে রাখবেন এবার যদি জুলাই হেরে যায় তাহলে বাংলাদেশ হেরে যাবে। যেভাবে আধিপত্যবাদ বিরোধীদের লাশের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে তাতে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে আমি আবরার ফাহাদ, আমি আবু সাঈদ, আমি মুগ্ধ, আমি ওসমান হাদী, আমরা ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে শহীদ হয়েছি। এবার আপনার পালা। আকাশে বাতাশে এখনো ভেসে বেড়াচ্ছে ‘আবু সাঈদ মুগ্ধ শেষ হয়নি যুদ্ধ, দীপ্ত কণ্ঠে সবাই বলছে ভারতীয় সব টিভির সম্প্রচার বাংলাদেশে বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশের একটি টিভি চ্যানেলও ভারতে নেই। যতদিন ভারতীয় সব টিভির সম্প্রচার বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে ও শহরে চলবে ততদিন অশ্লীলতার প্লাবন ও বিবাহ বিচ্ছেদ বন্ধ হবে না। তাই ভারতীয় সব টিভির সম্প্রচার বন্ধ করতে হবেÑ এটা সময়ের দাবি। কতবড় মনের অধিকারী হলে এতসব কথা স্বল্প সময়ে বলতে পারে একটা মানুষ। আমি নিজেই মাঝেমধ্যে হতবাক হয়ে যাই যখন দেখি আধিপত্যবাদীদের কালচারাল সেন্টার যেমন ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টার, উদিচী, ছায়ানট, নামে বেনামে মিডিয়া, আরো ভারতীয় কবি সাহিত্যিকদের বহু সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে। এ যেন এক কালচারাল কলোনি। কিন্তু বাংলাদেশে নবাব সলিমুল্লা, মাওলানা ভাসানী, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া, দেশের জন্য এসব মহান ব্যক্তিদের অবদান থাকা সত্ত্বেও তাদের নামে কোনো কালচারাল সেন্টার গড়ে তোলা হয়নি। ৫৫ বছর ধরে এই বিজাতীয় তোষণ প্রক্রিয়া আমাদের নিজস্ব ঈমান আকিদা থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে দিয়েছে এবং দেশীয় ঐতিহ্য একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। বিপ্লবী হাদী এসব কথা অতি সাবলীল ভাষায় বলতেন। ওসমান হাদীর নিজের লেখা বিদ্রোহী কবিতায় এসব কথা উঠে এসেছে। উদাহরণ যে নিজেকে পানি দিয়ে ভেজায়, সে কাপড় বদলায়, যে ঘাম দিয়ে ভেজায়, সে ভাগ্য বদলায়, আর যে রক্ত দিয়ে ভেজায়, সে ইতিহাস বদলায়- হাদী তার প্রমাণ।

আজ শহীদ হাদী ১৮ কোটি মানুষকে কাঁদিয়ে মহান রবের সান্নিধ্যে চলে গেছেন। কি আশ্চর্য হাদীর কোন অহংকার ছিল না তার উত্থানের পেছনে। সহজ সরল সোজাসাপটা মানুষ হিসেবে সবার কাছে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছেন। তার কথাগুলো মনে হয় যেন স্বচ্ছ বিবেকের প্রতিধ্বনি। তার প্রতিটি কথাই আমূল নাড়িয়ে দেয় মানুষের হৃদয়কে। মানুষের হৃদয়কে একটি শক্ত ঝাঁকুনি দেয়। একটি শপিং মলে গিয়ে শুনলাম মানুষ বলাবলি করছে শতাব্দীর শ্রষ্ঠ সন্তানকে জাতি হারালো। ভয় হয় প্রতিবাদী কণ্ঠকে যদি এভাবে হত্যা করা হয় তাহলে জাতি হিসেবে আমরা চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়বো এবং তা অতি সহসাই। ভিপি নুর বলেছেন আমার হত্যা চেষ্টার যদি বিচার হতো তাহলে ওসমান হাদীর মৃত্যু হতো না।

সামাজিক গণমাধ্যমে এসেছে জুলাই বিপ্লবকে টুঁটি চেপে হত্যার চেষ্টা চলছে অবিরত। মেরে ফেলা হয়েছে আবু সাঈদ, মুগ্ধ এবং আবরার ফাহাদকে, সর্বশেষ ওসমান হাদীকে। মৃত্যুর ঝুঁকিতে আছে আরো অনেকে।

সর্বশেষে বলবো, একটি সফল বিপ্লব, অনেক বেশি শক্তিশালী, সেহেতু বিপ্লবের সৈনিক শরীফ ওসমান হাদীর অবদান অনেক বেশি। বিপ্লবীরা কখনো মরে না, তারা আজীবন জীবিত থাকে দেশের প্রতিটি মানুষের অন্তরে। বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ এমপি পাওয়া যাবে কিন্তু হাদী একজনই যিনি টাকার কাছে বিক্রি হন নাই। তার চিন্তা শুধু দেশ এবং দেশের মানুষ। ফিরে এসো হে বীর...!! হাদী মরে গিয়ে ঘুমন্ত একটি জাতিকে জাগিয়ে দিয়ে গেছেন তার আদর্শ ও কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে। ধন্য হোক তোমার বিপ্লব।

লেখক : গ্রন্থকার, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Email: [email protected]