১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে দুর্বার গণআন্দোলন চলছিল। ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। এ নির্বাচনে দলটি পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনেই জয়লাভ করে। পক্ষান্তরে পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ১৩৮টি আসনের মধ্যে ৮১টি আসনেই পাকিস্তান পিপল্স পার্টি জয়ী হয়। সামগ্রিকভাবে নিখিল পাকিস্তান ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করায় স্বাভাবিকভাবেই দেশ শাসন তথা সরকার গঠনের অধিকার তাদেরই পাওয়ার কথা এবং এ অধিকার তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারও বটে। কিন্তু জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান পিপল্স পার্টি এবং সামরিক বাহিনী তাদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে দেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দল শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সংখ্যাগরিষ্ঠ আওয়ামী লীগ দলের নিকট পাকিস্তানের ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়াকে অনুরোধ করেন। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর এ অনুরোধ তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। যে সমস্ত রাজনৈতিক নেতা ঐ সময়ে আওয়ামী লীগের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য দাবি জানিয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর অধ্যাপক গোলাম আযম, পিডিপির হামিদুল হক চৌধুরী, নেজামে ইসলাম পার্টির মৌলভী ফরিদ আহমেদ, জাতীয় লীগের অলি আহাদ প্রমুখ। এ ব্যাপারে সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বহুবার বৈঠক হয়েছে কিন্তু তাতে কোন ফল হয়নি। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান প্রথমে ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন কিন্তু ১৯৭১ সালের ১ মার্চ দুপুর ১.০৫ মিনিটে ঐ অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার পরপরই সামরিক শাসনকে আরো কঠোর করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক গভর্নরকে অপসারণ করে তার স্থলে একজন সামরিক প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। সরকারের এ সিদ্ধান্তে সারা প্রদেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। জনগণ তাদের বাড়িঘর ছেড়ে রাস্তায় প্রতিবাদ করতে থাকেন। মার্চ মাসের ৩ তারিখে শেখ মুজিবুর রহমান পল্টন ময়দানে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন। তার ভাষণে তিনি অবিলম্বে সামরিক শাসন প্রত্যাহার করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান এবং সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়া ও জনপ্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য সরকারকে অনুরোধ করেন। পাশাপাশি তিনি অসহযোগ আন্দোলনেরও ডাক দেন। সরকার এ দাবিগুলোর প্রতি কোন প্রকার কর্ণপাত করেননি। বরং রাজনৈতিক নেতাদের সাথে সভা-সমাবেশ ও দর কষাকষির মাধ্যমে কালক্ষেপণ করার পথ বেছে নেন।
২. উপরোক্ত অবস্থায় সারা প্রদেশে অসহযোগ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে, আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটে। ফলে জীবন ও সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হতে থাকে। অবাঙ্গালী বিহারীরা আন্দোলন প্রতিরোধে নেমে আসায় বিক্ষুব্ধ জনতা আরো উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং বিহারী অধ্যুষিত এলাকাগুলো এর ফলে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অসহযোগ আন্দোলনকালে কার্যত সারা প্রদেশে প্রশাসন অচল হয়ে পড়ে এবং অবস্থার এতই অবনতি ঘটে যে দেশে সরকারের অস্তিত্ব আছে সাধারণ মানুষ এর কোন লক্ষণই দেখতে পাচ্ছিলেন না। সারা প্রদেশ আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের একচ্ছত্র কর্তৃত্বে চলে আসে। দেশের সরকারি দপ্তর, অধিদপ্তর, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ তারই নির্দেশে চলতে থাকে। এসব নির্দেশের অধীনে মানুষ সরকারকে কর পরিশোধ করা বন্ধ করে দেয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি অফিস-আদালত বন্ধ ঘোষিত হয়। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে টেলি যোগাযোগ ও আর্থিক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে যে বিষয়টি প্রণিধানযোগ্য তা হচ্ছে সারা প্রদেশ আওয়ামী লীগ ও তার প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের একচ্ছত্র কর্তৃত্বে থাকার পরও তিনি বা তার দল এ সময়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি এবং এ ব্যাপারে দেশের অপরাপর রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে কোন প্রকার পরামর্শও করেননি। কিংবা জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে গণদাবির প্রেক্ষাপটে তাদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার আলোকে পরবর্তী কর্মসূচি কি হওয়া উচিত সে সম্পর্কেও সহযোগী রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিয়ে আলোচনায় বসেননি। সারা প্রদেশে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালেও জেনারেল ইয়াহিয়া খান এবং পিপল্স পাটি নেতা ও তাদের প্রতিনিধিদের সাথে ২৪ মার্চ পর্যন্ত তিনি তার বৈঠক অব্যাহত রাখেন। দেশবাসী আশা করেছিল যে, এসব বৈঠক থেকে একটি চূড়ান্ত ফায়সালা বেরিয়ে আসবে এবং সামরিক শাসকরা শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। এসব বৈঠকে শেখ মুজিবুর রহমান যেসব দাবি-দাওয়া পেশ করেছিলেন তার মধ্যে অন্যতম ছিল সামরিক আইন প্রত্যাহার, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর এবং ২৫ মার্চ পর্যন্ত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতকরণ ইত্যাদি। এর মধ্যে তার দাবি অনুযায়ী জেনারেল ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের পরিকল্পিত অধিবেশন স্থগিত করতে রাজী হন । এ দিন তিনি বৈঠকে স্বীকৃত উভয় পক্ষের সমঝোতার বিষয়গুলো এবং পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও ঘোষণা দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা ও পূর্ব পাকিস্তানের মুখপাত্র শেখ মুজিবুর রহমান এতে সন্তুষ্ট হননি।
তিনি সকল দাবি পূরণের লক্ষ্যে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য ২৭ মার্চ সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করেন। এ অবস্থায় ২৫ ও ২৬ মার্চ মধ্যরাতে অপারেশন সার্চ লাইটের নামে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর সশস্ত্র সেনাবাহিনী ঝাপিয়ে পড়ে এবং এ ধ্বংসাত্মক ও ভয়াবহ আর্মি ক্রাকডাউনের ফলে প্রদেশব্যাপী হাজার হাজার মানুষ নিহত হন। আমি নিজে ২৬ মার্চ কারফিউ বিরতিকালে তাঁতীবাজার, ইসলামপুর, নবাবপুর রোড, কাপ্তান বাজার, রাজারবাগ প্রভৃতি এলাকায় গুলিতে মৃত ও অগ্নিদগ্ধ শত শত লাশ পড়ে থাকতে দেখেছি। সে ছিল এক বীভৎষ দৃশ্য। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এ বর্বরোচিত হামলা এবং গণহত্যা ছিল আকস্মিক এবং এর জন্য কেউই প্রস্তুত ছিলেন না। প্রায় মাসব্যাপী সেনাবাহিনীর সাথে আওয়ামী লীগসহ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলসমূহ বিশেষ করে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম কমিটির (ডেমোক্রেটিক এ্যাকশন কমিটি) সদস্যদের সাথে আলাদা ও ঐক্যবদ্ধ আলোচনা এবং সময়ে সময়ে সামরিক শাসকদের তরফ থেকে প্রদত্ত প্রেসব্রিফিং থেকে যে ধারণা পাওয়া যাচ্ছিল তাতে মনে হচ্ছিল যে এ সমস্যার শিগগিরই একটি রাজনৈতিক সমাধান পাওয়া যাবে। কিন্তু অপারেশন সার্চ লাইট মানুষের এ আশাবাদকে মিথ্যা প্রমাণিত করে। এ সার্চ লাইট অপারেশনের পর সামরিক বাহিনীর অত্যাচার-নিপীড়ন চরমে ওঠে এবং ভীত সন্ত্রস্ত শহরবাসীরা বাড়িঘর ছেড়ে পায়ে হেঁটে কেউ পল্লী এলাকায় তাদের নিজেদের বাড়ি ঘরে, আবার কেউ কেউ সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের পশ্চিম বঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যসহ বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করে। এ আশ্রয় গ্রহণকারীদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল অমুসলমান। এদের কেউ কেউ ভারতে বসবাসকারী তাদের আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নেন। অন্যরা শরণার্থী শিবিরে ওঠে।
উল্লেখ্য যে, ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান আর্মি শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে। আওয়ামী লীগের নির্বাচিত প্রতিনিধি বিশেষ করে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের বেশির ভাগই দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যান। - এ অবস্থায় দেশের মানুষ এক অসহায় অবস্থায় নিপতিত হন। তখনকার পত্রপত্রিকা ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে - প্রচারিত তথ্যানুযায়ী প্রায় ৮৬ লক্ষ লোক পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর নির্যাতন ও তার ভয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। ভারত সরকার প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী এদের মধ্যে ৬৯.৭১ লক্ষ লোক ছিল হিন্দু, ৫.৪১ লক্ষ লোক ছিল মুসলমান; ০.৪৪ লক্ষ ছিল অন্যান্য ধর্মাবলম্বী।
মার্চ মাসের ২৭ তারিখে চট্টগ্রামের কালুর ঘাটে স্থাপিত একটি গোপন রেডিও স্টেশন থেকে মেজর জিয়া কর্তৃক শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে প্রচারিত স্বাধীনতার ঘোষণা আমরা অনেকে শুনেছি। এ ঘোষণাটি প্রথম তিনি নিজের পক্ষ থেকে করেছিলেন। পরে সংশোধন করে শেখ মুজিবের পক্ষ থেকে করেছিলেন। এ ঘোষণায় প্রদেশে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল। এতে অনেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন আবার অনেকেই এটি বিশ্বাস করতে পারেননি। যারা বিশ্বাস করতে পারেননি তাদের যুক্তি ছিল সারা প্রদেশে প্রায় ১ মাসের কাছাকাছি সময় ধরে অসহযোগ আন্দোলন চলেছে এবং এ অসহযোগ আন্দোলনের সময় বলতে গেলে সামগ্রিক প্রশাসনিক কর্তৃত্ব শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ছিল। সরকারি অফিস, আদালত, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমা সবকিছুই তার নির্দেশে চলেছে। তিনি বা তার দল ঐ সময় স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি বরং পাকিস্তানের সংবিধানের খসড়া, ক্ষমতা হস্তান্তরের পদ্ধতি এবং কেন্দ্রীয় প্রাদেশিক সরকারের অধিক্ষেত্র ও সম্পর্ক নিয়ে সামরিক কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করেছেন। আলোচনা ব্যর্থ হলে কি হবে সে সম্পর্কে সহযোগী রাজনৈতিক দল কিংবা তাদের নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা বা সলাপরামর্শও করেননি। তারা যে ধারণা বিশ্বাস পোষণ করতেন তা হচ্ছে স্বয়ং শেখ মুজিবুর রহমান এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতৃবৃন্দই পাকিস্তান আন্দোলনে শরীক ছিলেন। তারা পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক সরকারেও মন্ত্রিত্ব করেছেন।
এ অবস্থায় ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যেই তারা সমস্যার সমাধানের চিন্তা ভাবনা করেছেন। তখন দক্ষিণপন্থী ও ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থনে ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তানকে মুসলমানদের আদর্শিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা, সামরিক শাসকদের জুলুম নির্যাতনের অবসান এবং পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনে এ সব দল আওয়ামী লীগের সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করেছে। তারা আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে সম্মিলিত বিরোধী দলের (কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টি) ব্যানারে লড়াই করেছে এবং ইয়াহিয়ার সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে শরীক ছিল। এ অবস্থায় অপারেশন সার্চ লাইট যেমন তাদের হতবাক করেছে, তেমনি তাদের অনেকেই স্বাধীনতার ঘোষণা বিশ্বাস করতে পারেননি।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের দক্ষিণপন্থী ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক সংকটে ভারতের ভূমিকাকে সর্বদা সন্দেহের চোখে দেখেছে। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধে ভারতের পরাজয়ের পর থেকে এ সংশয়-সন্দেহ ব্যাপক আকার ধারণ করে। এ ক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টিতে আওয়ামী লীগের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়, বিশেষ করে ১৯৬৭ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র উদঘাটিত হবার পর এর মাত্রা আরো জোরালো হয়। পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত কয়েকজন সাক্ষীর বিবরণীতে আওয়ামী লীগ শীর্ষ নেতাদের সম্পৃক্তির এবং ভারতীয় সহযোগিতায় পাকিস্তান ভাঙার তথ্য তাদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছিল। অবশ্য তখন পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে আদালতে প্রদত্ত শেখ মুজিবুর রহমানের এফিডেভিট এ সন্দেহের কিছুটা প্রশমন করলেও ভারতীয় রাজনীতিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী এবং থিংকট্যাংকসমূহের আচরণ, বক্তৃতা, বিবৃতি, প্রবন্ধ, নিবন্ধ প্রভৃতি থেকে এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছিল যে, তারা তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় পাকিস্তানকে ভাঙতে চায় এবং এ কাজে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করতে চায়। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানকে দেশের অপর অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে একটি বিপ্লবী সংগঠনও তারা গঠন করেছিল। তখন এ মর্মে অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিল যে, পূর্ব পাকিস্তানে একটি সশস্ত্র বিদ্রোহ সংগঠনের লক্ষ্যে ভারত অস্ত্র ও আর্থিক সহযোগিতা ছাড়াও দলটিকে এ মর্মে আশ্বাস প্রদান করেছে যে, নির্ধারিত এ সময়ে ভারত পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার জন্যে আকাশ ও সমুদ্র পথ বন্ধ করে দেবে। আওয়ামী লীগ ও তার প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান এ অভিযোগ সব সময় অস্বীকার করেছে।
১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতীয় এয়ার লাইনের একটি বিমান হাইজ্যাককারীরা লাহোরে নিয়ে যায় এবং - সেখানে তা ধ্বংস করে দেয়। এ বিমান হাইজ্যাক ও ধ্বংসের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত তার ভূ-খন্ডের ওপর দিয়ে পাকিস্তানের উভয় অংশের মধ্যে বিমান চলাচল বন্ধ করে দেয়। তখন এ অঞ্চলে এ ধরনের ধারণা-বিশ্বাস জন্ম নেয় যে, পাকিস্তানের ইতিহাসের একটি সঙ্কটময় সময়ে যখন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক আলাপ-আলোচনা এবং দর কষাকষি চলছিল তখন বিমান হাইজ্যাকের ন্যায় একটি ঘটনা ঘটিয়ে বিমান চলাচল বন্ধ করার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য ভারতীয় এজেন্টরাই প্রকৃতপক্ষে কাজ করেছে।
তখন তৎকালীন পাকিস্তানের দক্ষিণপন্থী এবং ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আরেকটি বিশ্বাসও প্রচলিত ছিল। তারা মনে করতেন যে, ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের মূল কারণ ভারত কর্তৃক পাকিস্তানের সৃষ্টিকে মনে-প্রাণে মেনে না নেয়া। বল্লভ ভাই প্যাটেল ও পণ্ডিত জওহর লাল নেহরুর ন্যায় ভারতের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ প্রকাশ্যেই দ্বিখন্ডিত ভারত মাতার পুনরাকেত্রীকরণের অনুকূলে মতামত প্রকাশ করতেন এবং তারা নিশ্চিত ছিলেন পূর্ব বাংলা অবশ্যই ভারতে চলে যাবে। তাদের এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তারা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। তারা মুসলমানদের জন্য সৃষ্ট নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করার জন্য আন্তর্জাতিক নদীর পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল এবং ভারতে বসবাসকারী লক্ষ লক্ষ মুসলমানকে উদ্বাস্তু হিসেবে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে ঠেলে দিয়েছিল। গঙ্গা নদীর উজানে ফারাক্কা পয়েন্টে বাধ তৈরির কাজ ত্বরান্বিত করে ঐ সময় ভারত পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক এবং এ অঞ্চলের প্রায় ৩ কোটি মানুষের জীবন জীবিকা ধ্বংস ও প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং জীব বৈচিত্র নষ্ট করার কাজেও লিপ্ত ছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল। (চলবে)