১৬ ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস পালিত হলো এ বছর ২০২৪ এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর নতুন এক চেতনায়। গত বছর স্বৈরাচারমুক্ত পরিবেশে প্রথম বিজয় দিবস পালিত হয়েছে। এ বছর এ দিনটির প্রাক্কালে ঘটে এক ন্যক্কারজনক ঘটনা। জুলাই যোদ্ধা ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান হাদী স্বৈরাচারের ক্রীড়নকদের হাতে গুলীবিদ্ধ হন গত শুক্রবার। এ ঘটনায় সারাদেশের মানুষ একদিকে আতঙ্কিত ও অন্যদিকে প্রতিবাদে মুখর হয়েছে। দলমত নির্বিশেষে সকলেই ২৪ এর বিপ্লবের বীর যোদ্ধা হাদীর ওপর হামলার ঘটনায় আবারো একটি যায়গায় মিলিত হয়েছেন যে, স্বৈরাচারকে পুরোপুরি পরাস্ত করতে ঐক্য ছাড়া আমাদের কোন গতি নেই।
১৬ ডিসেম্বর এক অবিস্মরণীয় বীরত্বগাথা, গৌরবময় দিন। পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন ভূখণ্ড গড়ার প্রত্যয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এ দেশের মুক্তিকামী মানুষ। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সব লাঞ্ছনা, শোষণ ও বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে ১৯৭১ সালের এ দিনে কাক্সিক্ষত বিজয় অর্জন করে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের।
সবার মধ্যে এক বুক আশা ছিল সব লাঞ্ছনা, শোষণ, বঞ্চনার অবসান ঘটবে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এ দেশের মুক্তিকামী মানুষের ওপর জেঁকে বসেছে স্বৈরশাসকরা। অধিকার আদায়ের জন্য কথা বলতে গিয়েও কখনো কখনো এ দেশের মানুষকে গুম-খুনের শিকার হতে হয়েছে। একাত্তরের মূল চেতনার বিভ্রাট ঘটিয়ে মানবাধিকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাকস্বাধীনতা রুদ্ধ করা হয়েছে।
দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের আওয়ামী দুঃশাসনে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আরেকবার রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে পতন ঘটে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার। সে দিন থেকে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতা হরণের অভিশাপ থেকে বেরিয়ে এসে মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা আরেকবার বুকভরে শ্বাস গ্রহণ করে জানান দেয়-এ দেশের মানুষ কখনোই পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হতে জানে না। পরাধীনতার জিঞ্জির ভেঙে মানুষের এখন একটাই চাওয়া-সত্যিকারের বৈষম্যমুক্ত দেশ। এ মহান বিজয় দিবস ঘিরেও দেশের মানুষের মধ্যে প্রবলভাবে আরেকটি চাওয়া দৃঢ় হয়েছে তা হলো- আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে দীর্ঘদিনের আকাক্সিক্ষত ভোট প্রদানের মাধ্যমে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হোক।
মানুষ কেন ফুঁসে উঠেছিল? দীর্ঘ ১৬ বছরের আওয়ামী দুঃশাসনে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিল। দেশে গণতন্ত্র ছিল না, নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছিল, ব্যাংক থেকে বিপুল টাকা পাচার, অর্থ ব্যবস্থা ধ্বংস করে কার্যত দেশ অচল হয়ে যাচ্ছিল। ছাত্ররা কোটা বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে জুনে নতুন করে আন্দোলনের সূচনা করলে তা ব্যাপক জন সমর্থন লাভ করে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আরেকবার রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটে স্বৈরশাসকের।
সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরশাসনও হতে পারে। সেটাই ঘটেছিল আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনামলে। দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল (১৮০৬-১৮৭৩) বলেছেন, নির্বাচিত সরকার শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রকল্প বাস্তবায়ন করে বিধায় একসময় এই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী-ই সংখ্যালঘুদের অত্যাচার করার পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে। সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরশাসন এটাই বোঝায় যে, এমনকি নির্বাচিত সরকারের হস্তক্ষেপও ব্যক্তিস্বাধীনতার ক্ষেত্রে ক্ষতিকর প্রভাব রাখতে পারে।
২০২৪-এর জুলাইয়ে আন্দোলন প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। শহীদ হয় কোমলমতি ছাত্র থেকে শ্রমিক দোকানদার রিকশাচালক। এ সংখ্যা দেড় হাজারের বেশি। আহত ২৫ থেকে ৩০ হাজার। যারা এখনো সুস্থ হতে পারেনি অনেকে। একটি স্বাধীন দেশে দাবি দাওয়ার জন্য এভাবে প্রাণ হরণ করবে প্রশাসন, এটা কারো প্রত্যাশা ছিল না। ফলে তা সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয় এবং তা বাস্তবায়িত হয়। ৫ আগস্ট এভাবে হয়ে ওঠে দেশের জন্য আরেকটি বিজয় দিবস।
এরপর আসে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার। তারা দেশের অর্থনীতিকে সারিয়ে তোলার উদ্যোগ নেন। জনগণের আরাধ্য রাষ্ট্র সংস্কার তথা জুলাই সনদের আলোকে সাংবিধানিক কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নেন, শুরু হয় গণহত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের বিচার, যা এখনো চলমান। আর অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের লক্ষ্যে সাধারণ নির্বাচন আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তাই এবারের বিজয় দিবসের বার্তাটি মানুষের কাছে পরিস্কার। আর তা হলো জাতি আর পুরনো কায়দায়, পুরনো দিনগুলোতে ফিরে যেতে চায় না, যেখানে অধিকারহারা ছিল সাধারণ মানুষ।
আমরা ৫৪ টি বিজয় দিবস পার হয়ে এলেও এ বিজয় সত্যিকারের বিজয় হিসেবে প্রতিভাত হয়নি। ২০২৪ সালের ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানের পর এ দিবসটির তাৎপর্য নতুন অবয়বে দেখা দিয়েছে। স্বাধীনতার সাথে থাকে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। সে প্রশ্নটির আপাত মিমাংসা হয়েছে। বিগত ১৬ বছর আওয়ামী লীগের শাসনামলে এ সার্বভেমৗমত্ব লংঘিত হয়েছে। বর্তমানে দেশ জাতি জনগণ ও অন্তর্বর্তী সরকার কোন প্রতিবেশি দেশের একচ্ছত্র তাঁবেদারী না করার নীতিতে অটল রয়েছে। আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতেও সে পরির্তনের ধারা সূচিত হয়েছে। তাই অভ্যুত্থান পরবর্তী আরেকটি বিজয় দিবস হিসেবে দিনটি তাৎপর্যবহ। অন্তর্বর্তী সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও সে তাৎপর্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, সরকার একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিজয় দিবস উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তিনি বলেন, ‘আমরা চাই এ নির্বাচন হোক সত্যিকার অর্থে উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক, শান্তিপূর্ণ এবং সর্বোপরি সুষ্ঠু। প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, পরাজিত ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসীদের অপচেষ্টা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ করে দেয়া হবে। তিনি বলেন, ভয় দেখিয়ে, সন্ত্রাস ঘটিয়ে বা রক্ত ঝরিয়ে এ দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না’।
দেশবাসীর প্রতি সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, অপপ্রচার বা গুজবে কান দেবেন না। ফ্যাসিস্ট টেরোরিস্টরা, যারা অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চায়, আমরা অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের মোকাবেলা করব। তাদের ফাঁদে পা দেবো না। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখযোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদীর ওপর সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় জড়িত কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, সরকার এ ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে এবং ঘটনার সাথে জড়িতদের প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা গেছে। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, ‘আমি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করতে চাই- যারা এ ষড়যন্ত্রে জড়িত, তারা যেখানেই থাকুক না কেন, তাদের কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না’। গভীর বেদনার সাথে তিনি বলেন, ‘এ আনন্দের দিনে গভীর বেদনার সাথে জানাচ্ছি- হাদীর ওপর সম্প্রতি যে হামলার ঘটনা ঘটেছে, তা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়- এটি বাংলাদেশের অস্তিত্বের ওপর আঘাত, আমাদের গণতান্ত্রিক পথচলার ওপর আঘাত’। ভাষণে তিনি উল্লেখ করেন, হাদীর চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়েছে। এ সময় তিনি তার দ্রুত সুস্থতার জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোও দিয়েছে অনুরূপ বার্তা। এ ঐক্যের স্থানটি ধরে রাখাই হবে এবারের বিজয় দিবসের মূল চেতনা। নেতৃবৃন্দ বলেছেন, পুরনো ব্যবস্থার রাজনীতি ছুড়ে ফেলে দিয়ে নতুন ব্যবস্থার রাজনীতিতে আগামীর বাংলাদেশ পরিচালিত হবে। যে রাজনীতি হবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে, খুনের বিরুদ্ধে, ধর্ষণের বিরুদ্ধে, মামলাবাজদের বিরুদ্ধে, দুর্নীতি-অন্যায়-অনাচারের বিরুদ্ধে। তারা বলেছেন, আমরা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের জন্য যে সংগ্রাম করেছি, লড়াই করেছি এবং করছি তা আমরা অবশ্যই চালিয়ে যাবো। বিভাজনের রাজনীতি ফিরে আসুক এটা চান না অনেক রাজনীতিক। তারা বলেছেন, এত বছর পরও আমরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ও বিপক্ষের রাজনীতির মুখোমুখি হচ্ছি। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা আশা করেছিলাম, এ বিভাজনের রাজনীতি বাংলাদেশ থেকে চিরতরে বিদায় নেবে। সে ধারা থেকে বের হয়ে আসাই হচ্ছে এবারের বিজয় দিবসের চেতনা। আমরা ১৯৭১ এর শহীদদের স্মরণ করবো তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জানাব। কিন্তু ২০২৪ এর বিজয় দিবসের চেতনাকে বুকে ধারণ করে অগ্রসর হবো।
সামনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট। রাষ্ট্র সংস্কারে এ গণভোট তাৎপর্যবহ, গণভোটে সাধারণ মানুষ হ্যাঁ এর পক্ষে মতামত প্রদান করে পরিবর্তনের পক্ষে তাদের অবস্থান জানান দেবেন। আজ ১৫ টি বছর ধরে ভোট দিয়ে সরকার গঠনের যে ব্যবস্থাটি আমরা হারিয়ে ফেলেছিলাম, আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে সে সুযোগটা ভোটাররা লাভ করবেন।
তাই প্রধান উপদেষ্টা যথার্থভাবেই বলেছেন, এবারের নির্বাচন ও গণভোট বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথরেখা নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আমরা কোন ধরনের রাষ্ট্র প্রত্যাশা করি তা নির্ভর করবে গণভোটের ফলাফলের ওপর। এ ভোটের মাধ্যমে ঠিক হবে নতুন বাংলাদেশের চরিত্র, কাঠামো ও অগ্রযাত্রার গতিপথ।
এ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও পবিত্রতা রক্ষার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা অপরিসীম। তারা নির্বাচনে একে-অপরকে প্রতিযোগী হয়ে উঠবেন, শত্রু নয়। নির্বাচনের মাঠে একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে দেশের মানুষ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আরো আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। ২০২৪ এর অভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়া দলগুলোর মধ্যে পতিত স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ঐক্যই হচ্ছে এবারের বিজয় দিবসের আসল চেতনা।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।