আসিফ আরসালান

পবিত্র রমযান মাস শেষ হয়েছে। ঈদের লম্বা ছুটিও শেষ হলো। কিন্তু রমযান মাস-এর পবিত্র ঈদ ও রাজনীতিবিদদের কর্মতৎপরতায় বিশেষ করে নির্বাচনী তৎরপতায় প্রাণচঞ্চল ছিল। প্রধান ৩ টি দল, অর্থাৎ বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপির নেতৃবৃন্দ এবার তাদের নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে ঈদ করেছেন। অনেক নেতা তাদের নির্বাচনী এলাকায় রং বেরঙয়ের পোস্টার ছেপেছেন। পোস্টারে এলাকার জনগণকে ঈদের শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে। এদেশের মানুষ রাজনীতি সচেতন। তারা ঠিকই বুঝেছেন যে, এগুলো হলো ইলেকশন ক্যাম্পেইনের সূচনা।

এক শ্রেণীর পলিটিশিয়ান তো ইলেকশন ক্যাম্পেইন শুরু করেছেন। কিন্তু চিত্রের অপর পিঠ নির্বাচন করার মতো এখনো ততখানি মসৃণ নয়। অনেকে ধরেই নিয়েছিলেন যে, নির্বাচন হবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে। কিন্তু গত স্বাধীনতা দিবসের বাণীতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবার নির্বাচনের সম্ভাব্য দু’টি সময় বলেছেন। একটি হলো, আগামী ডিসেম্বর। আরেকটি হলো, আগামী বছরের জুন। অন্য কথায়, প্রথমটি হলে নির্বাচনের আর আছে মাত্র ৯ মাস বাঁকি। আর দ্বিতীয়টি হলে ১৫ মাস। কিন্তু এদিকে সংস্কার তো একচুলও অগ্রসর হয়নি। রাজনৈতিক দল এবং নেতাদের কাছে পাঠানো স্প্রেডশিট আমি ভাল করে স্ট্যাডি করলাম। ঐ শিটে অনেকগুলো ছক আছে। রাজনৈতিক দল বা নেতাকে ঐ ছক মোতাবেক উত্তর দিতে হবে।

এ মুহূর্তে সরকারের ৬ টি বিভাগের ওপর সংস্কার করতে হবে। অন্তত স্প্রেডশিট দেখে তাই মনে হলো। এখন যে ৩৮টি দলকে স্প্রেডশিট দেওয়া হয়েছে তাদের সকলের সাথে ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে বসতে হবে। এভাবে ৬টি কমিশনের সুপারিশের ওপর ৩৮৬২২৮টি বৈঠক করতে হবে। এটি রীতিমত একটি হারকুলিয়ান টাস্ক। এসব ম্যারাথন বৈঠক শেষ করে তারপর ঐকমত্য কমিশনকে রিপোর্ট প্রণয়ন করতে হবে। এ রিপোর্টে ৬টি কমিশনের সুপারিশের ওপর প্রদত্ত ৩৮টি রাজনৈতিক দলের মতামতের সারাংশ বিধৃত থাকবে। প্রধান উপদেষ্টা যা বলছেন অথবা তার প্রেস উইং থেকে যা বলা হচ্ছে তাতে ধারণা করা যায় যে, এ সংক্ষিপ্তসারটিই হতে যাচ্ছে সে বহুল আলোাচিত জুলাই চার্টার বা জুলাই সনদ। এই জুলাই সনদ প্রণীত এবং গৃহীত হওয়ার পরেই আসবে নির্বাচনের সুস্পষ্ট দিনক্ষণ। পার্লামেন্টারি প্র্যাকটিস মোতাবেক নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ ইউনূস সরকার ঘোষণা করবেন না। ঘোষণা করবেন নির্বাচন কমিশন।

আমার সৌভাগ্য হয়েছিল বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের Fill up করা স্প্রেডশিট দেখার। কারো সাথে কারো মিল নেই। সকলেই তাদের নিজ নিজ রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরেছেন। আমি জানি না, এত হরেক রকমের মতামতের মধ্যে কমন মিটিং গ্রাউন্ড কোথায় পাবেন ড. ইউনূস? সে জন্যই আমি মনেকরি যে, জুলাই সনদ প্রণয়ন করা খুব ডিফিকাল্ট টাস্ক।

এরমধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে কতগুলো ডেভেলপমেন্ট হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, সামাজিক মাধ্যমে ড. ইউনূসের সপক্ষে সমর্থনের প্লাবন। হাজার হাজার মানুষ ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়ে আবেদন করেছেন যে, ড. ইউনূস যেন দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আরো ৫ বছর ক্ষমতায় থাকুন। এগুলো ছাড়াও বিশেষ কতগুলো ব্যাপারে সেনাবাহিনীকেও জড়ানো হয়েছে। আমি সেনাবাহিনীর প্রসঙ্গটি দূরে রাখতে চাই।

যারা ড. ইউনূসকে আরো ৩ বছর বা ৫ বছরের জন্য ক্ষমতায় দেখতে চান তাদের অনুভূতিকে বা মতামতকে আমি পূর্ণ শ্রদ্ধা জানাই। তারা ড. ইউনূসকে আরো ৩ বা ৫ বছরের জন্য যেসব কারণে ক্ষমতায় দেখতে চান সেগুলো আমি একটু পরে উল্লেখ করছি। সাথে সাথে এ প্রশ্নটিও রাখতে চাই যে ড. ইউনূসকে ৩ বা ৫ বছর ক্ষমতায় রাখতে চাইলেও সেটি করা কি সম্ভব? কারণ ড. ইউনূস অসংখ্যবার বলেছেন যে, তিনি কোনো রাজনীতি করবেন না বা ইলেকশনে দাঁড়াবেন না। কিছু সংস্কার করে তিনি তার পুরাতন পেশায় ফিরে যেতে চান। এজন্য ইলেকশনের সম্ভাব্য দুটি সময়ও তিনি উল্লেখ করেছেন যেগুলো আমি একটু আগেই উল্লেখ করেছি।

॥ দুই ॥

যেসব কারণে ড. ইউনূসের মেয়াদ দীর্ঘায়িত করার দাবি উঠেছে সেগুলো সংক্ষেপে নিম্নরূপ: (১) তার সরকার আন্তর্জাতিক গুম বিরোধী সনদে স্বাক্ষর করেছে। এর ফলে আয়নাঘরসহ সমস্ত গুম ও খুনের অপরাধে যারা অপরাধী তাদের বিচার করা সম্ভব হবে। (২) সমগ্র রমযান মাসে এক সেকেন্ডের জন্যও বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়নি। (৩) বিগত ৫৪ বছর ধরে প্রতিটি রমযানের আগে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি পেতো। এবার তার স্পষ্ট ব্যতিক্রম ঘটিয়ে কোনো জিনিসের দাম বাড়েনি। (৪) শুধু তাই নয়, মরিচ, পিঁয়াজ, ডিমসহ অনেক পণ্যসামগ্রীর দাম কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশের ঐতিহ্য হলো, একবার কোনো জিনিসের দাম বাড়লে সেটি আর কস্মিন কালেও কমে না। (৫) ব্যাংকিং খাত সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অন্তত ৭টি ব্যাংকে অবধারিতভাবে লাল বাতি জ¦লতো। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সুযোগ্য ও সুদক্ষ পরিচালনায় ঐ ৭ টি ব্যাংকসহ সমগ্র ব্যাংকিং খাত নিশ্চিতভাবে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। (৬) বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ নিয়ে শেখ হাসিনার আমলের শেষ দিকে ভয়াবহ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। যে দ্রুত গতিতে রিজার্ভ কমে যাচ্ছিল তারফলে বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু এখন বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ দিনের পর দিন তেজি হচ্ছে। বিগত মার্চ মাস অর্থাৎ মাত্র ১ মাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে ৩ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ৩০০ কোটি ডলার। (৭) রেমিট্যান্ট প্রবাহ এখন সাম্প্রতিককালের রেকর্ড ভঙ্গ করে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। (৮) আওয়ামী লীগের নিযুক্ত কুইক রেন্টাল এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বন্ধু ধনকুবের আদানি হুমকি দিয়েছিলেন যে, তাদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ করা না হলে তারা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেবেন। সুখের বিষয়, সমস্ত বকেয়া আংশিকভাবে পরিশোধ করা হয়েছে। কারো আর কোনো নালিশ নেই। তাই বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক। (৯) অতীতে বর্ডার কিলিং ছিল বছরে গড়ে ৫০০ মানুষ। অর্থাৎ মাসে গড়ে ৪২ জন। কিন্তু ড. ইউনূসের সময় অর্থাৎ বিগত ৮ মাসে বর্ডার কিলিং গড়ে প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ১০ জন। (১০) গণঅভ্যুত্থান উত্তর ইউনূস সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো ভারতের গোলামীর জিঞ্জির থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো। (১১) মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতাসহ মৌলিক মানবাধিকার ইউনূসের ৮ মাসে যেভাবে দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাসে বিগত ৫৪ বছরে তা পাওয়া যায়নি। (১২) বিগত ৮ মাসে ইউনূস সরকার অন্তত ২৭০ টি আন্দোলন মোকাবেলা করেছেন। কিন্তু কোনো আন্দোলন দমনের জন্য একটি গুলিও ছুঁড়তে হয়নি বা শেখ হাসিনার মতো আর্মার্ড পারসোনাল ক্যারিয়ার বা এপিসি এবং জলকামান ব্যবহার করতে হয়নি। (১৩) শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতেন ২০০ থেকে ২৫০ প্রতিনিধি দলের এক বিশাল বহর নিয়ে। বহর নিয়ে তিনি কমসে কম ১৫ দিন থাকতেন। ড. ইউনূস সেখানে গিয়েছিলেন মাত্র ৭ জন প্রতিনিধি নিয়ে এবং থেকেছিলেন মাত্র ৫ দিন। (১৪) জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে নিয়ে তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১ লক্ষ রোহিঙ্গার সাথে ইফতার করেছেন। এছাড়া বেইজিংয়ে তিনি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে বৈঠক করেছেন। দু’বিশ্ব নেতার সাথে আলোচনার পর তার বিশ্বাস জন্মেছে যে, আগামী ঈদুল ফিতর রোহিঙ্গারা স্বদেশে পালন করতে পারবে, ইনশাআল্লাহ। (১৫) ইউনূস সরকারের আরেকটি বিস্ময়কর সাফল্য হলো জাতিসংঘ কর্তৃক বাংলাদেশের জুলাই বা বর্ষা বিপ্লবে ১ হাজার ৪০০ ছাত্র জনতাকে হত্যার জন্য সরাসরি কমান্ড স্ট্রাকচারকে দায়ী করা। অর্থাৎ গণহত্যার জন্য সরাসরি শেখ হাসিনাকে দায়ী করা। (১৬) এছাড়াও গণহত্যার বিচার ইউনূস সরকার ইতোমধ্যেই শুরু করে দিয়েছে।

॥ তিন ॥

সাফল্যের খাতায় আরো অনেক বিষয় আছে। কিন্তু তালিকা আর দীর্ঘ করতে চাই না। এখন ফিরে যাচ্ছি মূল প্রশ্নে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব না হয়েও এ মুহূর্তে তিনি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তি। কিন্তু যারা তার মেয়াদ দীর্ঘায়িত করতে চান তারা কোন পথে সেটি করবেন? তিনি নিজেই তো ক্ষমতা বা দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার জন্য উদগ্রীব। আগেই বলেছি যে, তিনি পলিটিক্সও করবেন না, ইলেকশনেও দাঁড়াবেন না। তাহলে কিভাবে তিনি আরো ৩ বা ৫ বছরের জন্য থাকবেন? একটা হতে পারতো গণভোটের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতায় রাখা। কিন্তু সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে গণভোট বাতিল করা হয়েছে। হাইকোর্টের সর্বশেষ রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং গণভোট ফেরত আসলেও সুপ্রিম কোর্টে এ সংক্রান্ত একটি রিভিউ পিটিশন পেন্ডিং রয়েছে।

যদি ধরে নেওয়া হয়, সুপ্রিম কোর্টও হাইকোর্টের রায়কে বহাল রাখলো তাহলে তো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরে আসে। তখন নির্বাচন হবে সে সময় গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। তখন তো ড. ইউনূসের ইন্টারিম সরকারকে সরে যেতে হবে। কারণ ড. ইউনূসের সরকার কেয়ারটেকার সরকার নয়। এটি পুরোপুরি একটি আইনগত সরকার। যারা বলেন, এ সরকার নির্বাচিত নয়, তারা এর মাধ্যমে কী বলতে চান সেটি বোঝা মুশকিল। আমি আবার বলছি, এ সরকার নির্বাচিত না হতে পারে, কিন্তু এটি সম্পূর্ণ বৈধ সরকার। ইংরেজিতে একটি কথা আছে। সেটি হলো, he awful majesty of the people. ইউনূসের সরকার হলো জনগণের সেই Awful majesty এর সরকার।

এখন জনগণের ক্ষমতার সর্বোচ্চ ম্যান্ডেট পেয়েও ড. ইউনূস যদি নিজে ক্ষমতায় থাকতে না চান তাহলে তো কারো বলার কিছু নাই। তবে জনগণের প্রত্যাশা, নির্বাচন নির্বাচন করে সংস্কার যেন চাপা পড়ে না যায়।

Email: [email protected]