দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে, গণমাধ্যমে বড় বড় বিষয় নিয়ে বেশ আলোচনা হয়। আলোচনা হোক, কিন্তু গণমানুষের দুঃখ-দুর্দশা ও দুর্ভোগের বিষয় নিয়েও তো যৌক্তিক আলোচনা প্রয়োজন। গণমানুষের দুর্ভোগের গুরুত্ব কমে গেলে, আমাদের রাজনীতিও হয়ে পড়বে গুরুত্বহীন। প্রসঙ্গত এলজিপি’র অস্বাভাবিক দামের কথা উল্লেখ করতে হয়। দেশের রাজনীতিবিদরা তো এ ব্যাপারে তেমন কিছু বলছেন না। তারা কথা বললে হয়তো এলজিপিতে এমন অরাজকতা হতো না। আমরা জানি, গৃহস্থালিতে রান্নায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার। গত দু’সপ্তাহ ধরে বেড়েই চলেছে এলপিজি’র দাম। ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা; কিন্তু এখন তা বিক্রি হচ্ছে দু’হাজার টাকারও বেশি দামে। একটি জাতীয় দৈনিকে এ বিষয়ে প্রতিবেদন মুদ্রিত হয়েছে। ঢাকার চারটি খুচরা বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা চাহিদা দিলেও এলপিজি’র (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) সরবরাহ নেই। তাই ক্রেতারা চাইলেও দিতে পারছেন না। আর বাড়তি দামে কিনতে হওয়ায় তারাও বিক্রি করছেন বাড়তি দামে। অস্বাভাবিক দাম বাড়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সারাদেশে এলপিজি সিলিন্ডার পরিবেশক সমিতির সভাপতি সেলিম খান। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, অধিকাংশ কোম্পানি সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানির এলপিজি সরবরাহ করা হচ্ছে। ১ হাজার সিলিন্ডারের চাহিদা দিলে ২০০ থেকে ৩০০ সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে। ট্রাক গিয়ে বসে থাকছে, খরচ বাড়ছে। সরকারিভাবে দাম বাড়ানোর আগে বাজারে দাম বাড়ানো ঠিক নয় মন্তব্য করে সেলিম খান বলেন, বাড়তি টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই। খুচরা বিক্রেতারা এটা ঠিক করছেন না।
৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নতুন দাম ঘোষণার কথা রয়েছে। বিইআরসি ও এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপিজি অপারেটর্স অব বাংলাদেশ (লোয়াব) সূত্র বলছে, শীতের সময় বিশ্ববাজারে এলপিজি’র চাহিদা বেড়ে যায়। এতে দাম কিছুটা বাড়তি থাকে। এর সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে এলপিজি আমদানির জাহাজ সংকট। নিয়মিত এলপিজি পরিবহনের ২৯টি জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়েছে। চাইলেই জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে এলপিজি আমদানি কমে গেছে। আমদানি খরচ বাড়ায় কিছু কোম্পানি কিছু বাড়তি দাম রাখতে পারে। তবে এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন হলো, ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা হলেও তা এখন দু’হাজার টাকারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে কেমন করে? পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মুনাফাটা কি অনেক বেশি করা হচ্ছে না?
বিইআরসি’র চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, আমদানিকারকদের আমদানি খরচ বাড়লে তারা তা কমিশনে জমা দেবেন। কাগজে-কলমে বাড়তি খরচের বিষয়টি নিশ্চিত হলে কমিশন নতুন মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেবে। তার আগে বাড়তি দামে বিক্রির সুযোগ নেই। সুযোগ না থাকলেও এলপিজি শুধু বাড়তি দামে নয়, অস্বাভাবিক বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ভোক্তারা। এমন পরিস্থিতিতে নানা কথা বলছেন-আমদানিকারক, ব্যবসায়ী ও খুচরা বিক্রেতারা। বিইআরসিও কথা বলছে। কিন্তু এতে ভোক্তাদের দুর্ভোগ কমেনি। এমন অবস্থায় ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ¦ালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, সরবরাহ না থাকলেও বেশি দামে তো ঠিকই পাওয়া যাচ্ছে। অথচ বেশি দামে বিক্রি আইনত অপরাধ। বিইআরসি সে শাস্তি নিশ্চিত করতে পারছে না। সংস্থাটির প্রতি ভোক্তাদের অনাস্থা তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনসহ সরকারের কোনো দপ্তর বাড়তি দামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না। কোনো সভ্য সমাজে এটা হতে পারে না। এ যখন অবস্থা, তখন আমাদের রাজনীতিবিদরা ভোক্তা অধিকার তথা জনগণের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে চুপ থাকেন কেমন করে? রাজনীতিবিদরা সোচ্চার হলে পরিস্থিতি হয়তো এতটুকু গড়াতো না। ফলে প্রশ্ন জাগে, আমাদের রাজনীতিবিদরা কি শুধু ভোটের রাজনীতিতেই ব্যস্ত থাকবেন?