কোন দেশের আর্থিক সক্ষমতার চিত্র যে সব সূচকের মাধ্যমে প্রতিভাত হয়ে ওঠে তার মধ্যে ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও অন্যতম। অর্জিত জিডিপির অনুপাতে ট্যাক্সের হার যত বৃদ্ধি পাবে দেশটির আর্থিক সক্ষমতা তত বেশি বলে মনে করা যেতে পারে। জিডিপির তুলনায় আদায়কৃত ট্যাক্স পরিমাণ যদি বেশি হয় তাহলে বুঝতে হবে দেশটি তার নিজস্ব উৎস থেকে আহরিত অর্থের মাধ্যমে উন্নয়ন কাজে অর্থ যোগান দিতে সক্ষম। ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও যদি কম হয় তাহলে দেশটিকে উন্নয়ন অর্থায়নের জন্য বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। কোন মর্যাদাবান দেশ কখনোই ঋণনির্ভর উন্নয়ন কাজে বিশ্বাসী হতে পারে না। উন্নয়নের সূচনা লগ্নে বিদেশি ঋণ গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে সব সময়ই চেষ্টা থাকতে হয় কিভাবে ঋণনির্ভরতা অতিক্রম করে নিজস্ব সূত্র থেকে অর্থ সংগ্রহের মাধ্যমে উন্নয়ন ব্যয় এবং অন্যান্য চাহিদা পূরণ করা যায়। কাজটি কঠিন তবে অসাধ্য নয়। বাংলাদেশ দ্রুত উন্নয়নের পথে ধাবিত একটি দেশ। কিন্তু আমাদের উন্নয়ন মূলত বিদেশি ঋণনির্ভর। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে দেশে অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। কিন্তু এসব উন্নয়ন কাজে অর্থায়ন করা হয়েছে বিদেশি ঋণ গ্রহণ করে। ঋণনির্ভর উন্নয়নের ক্ষেত্রে অপচয় বেশি হয় আর পাশাপাশি দেশটি দীর্ঘ মেয়াদে ঋণনির্ভর হয়ে পড়ে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহে ব্যর্থতা এবং ঋণনির্ভর উন্নয়ন কাজের চূড়ান্ত ফল হিসেবে দেশটি দেউলিয়া হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। সার্ক দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কার ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও বাংলাদেশের চেয়েও কম। ফলে দেশটি তাদের উন্নয়ন অর্থায়নের জন্য বিদেশ থেকে প্রচুর ঋণ গ্রহণ করেছে। এক পর্যায়ে শ্রীলঙ্কা গৃহীত বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে আন্তর্জাতিকভাবে ঋণ খেলাপি দেশে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থতার পাশাপাশি যেভাবে বিদেশি ঋণ গ্রহণ করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে তাতে আগামীতে শ্রীলঙ্কার মতো ঋণ খেলাপি দেশে পরিণত হবার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের গৃহীত বিদেশি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। একদিকে বিদেশি ঋণের স্থিতি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি এবং অন্যদিকে ট্যাক্স-জিডিপির নিম্নমুখী প্রবণতা দেশের অর্থনীতির জন্য অশনি সঙ্কেত দিচ্ছে। দেড় দশক আগেও বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ছিল ১০ শতাংশে উপরে। এখন তা ৬ দশমিক ৭৩ শতাংশে নেমে আসেছে। দক্ষিণ এশিয়ান দেশগুলোর ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও গড়ে ১২ শতাংশ। আর উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ১৫ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন বলে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা মত প্রকাশ করেছে। নানাভাবে চেষ্টা করেও সরকার ট্যাক্স আদায়ের পরিমাণ বাড়াতে পারছে না। বিদেশি ঋণের পরিমাণ যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে আগামী কয়েক বছর পর নতুন করে ঋণ গ্রহণ করে পুরনো ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। একটি দেশের জন্য এ অবস্থা কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না।

ট্যাক্স ফাঁকি দেয়া বাংলাদেশের মানুষের একটি সহজাত প্রবণতা। আর এ কাজে সহায়তা করেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক শ্রেণির অসৎ কর্মকর্তা। বাংলাদেশে ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার (টিআইএন) ধারীদের দুই-তৃতীয়াংশই নিয়মিত রিটার্ন দাখিল করেন না। ট্যাক্স আদায়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হলে প্রথমেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। এ প্রতিষ্ঠানে যারা কর্মরত আছেন তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তির হিসাব নেয়া যেতে পারে। অন্তর্বর্তীকালিন সরকার আমলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা তাদের চেয়ারম্যানের পদত্যাগসহ বেশ কিছু দাবি নিয়ে সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করেছিল। যখন আন্দোলনকারি কয়েকজন নেতাকে অন্যত্র বদলি এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেয়া হয় তখন তারা রাতারাতি আন্দোলন বন্ধ ঘোষণা করেন। অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের নিকট উপস্থিত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

বাংলাদেশে উচ্চ হারে কর ধার্য করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। উচ্চ হারে কর ধার্য করা হলে কর ফাঁকি দেবার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়ে। তাই উচ্চ হারে কর ধার্য করার পরিবর্তে কর হার কমিয়ে করের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারিত করা যেতে পারে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে কর্মরত কর্মকর্তাদের প্রতি বছর কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া যেতে পারে। যারা লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারবেন তাদের পুরস্কৃত করার পাশাপাশি যারা ব্যর্থ হবে তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা যেতে পারে। আগামীতে জাতীয় উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে হলে ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও বৃদ্ধির কোন বিকল্প নেই। কারণ আমরা দীর্ঘ দিন বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করে বাঁচতে পারি না।