বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ, বৈচিত্র্যময় ও ঘটনাবহুল অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল। বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তির প্রস্থান নয়; এটি একটি সময়ের সমাপ্তি, একটি ধারার অবসান এবং একটি প্রজন্মের রাজনৈতিক অবদানের চূড়ান্ত উপসংহার আর সর্বোপরি বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভের পতন। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা ও শারীরিক দুর্বলতার সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে ৮০ বছর বয়সে বেগম জিয়ার ইন্তিকাল বাংলাদেশের রাজনীতিকে এনে দিল এক শূন্যতা, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন দল-মতনির্বিশেষে সম্মানিত এক ব্যক্তিত্ব-একজন এমন নেতা, যাঁকে নিয়ে সর্বসাধারণের মধ্যে ছিল গভীর শ্রদ্ধা ও আবেগ।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক হত্যাকা-ের পর বিএনপি যখন গভীর সংকটে নিমজ্জিত, তখনই খুবই রাজনীতির কঠিন মঞ্চে প্রবেশ করেন খালেদা জিয়া। বয়স তখন চল্লিশের নিচে। কোনো দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ বা প্রস্তুতি ছাড়াই তিনি দায়িত্ব নেন একটি বিপর্যস্ত দলের। একজন গৃহবধূ থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের আসনে পৌঁছানোর এ যাত্রা ছিল কঠিন। তবু ১৯৮২ সালে দলে যোগ দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান, পরে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং শেষে চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা বিএনপিকে শুধু সংগঠিতই করেনি, তাঁকে এনে দেয় ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি। নয় বছরের টানা আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্বেই ৭-দলীয় ঐক্যজোট গড়ে ওঠে, যার পরিণতিতে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান সফল হয়। সে আন্দোলনের ভেতর দিয়েই খালেদা জিয়া হয়ে ওঠেন জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় এক চরিত্র।
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সূচনা করে। সে আন্দোলনে ৭-দলীয় ঐক্যজোটের নেতৃত্ব দিয়ে খালেদা জিয়া যে অবদান রাখেন, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৯১ সালে কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাস রচনা করেন। মুসলিমপ্রধান একটি দেশে নারীর এ উত্থান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। পরবর্তী সময়ে আরও দু’দফা প্রধানমন্ত্রিত্ব করেছেন। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর শাসনামলে সংসদীয় গণতন্ত্র, বহুদলীয় রাজনীতি, প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন ও আঞ্চলিক ও বৈদেশিক কূটনীতিতে সক্রিয়তার ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক দিক দৃশ্যমান হয়। বিশেষ করে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনে তাঁর অবস্থান পরিবর্তন ও জনদাবিকে স্বীকৃতি দেওয়া রাজনৈতিক প্রজ্ঞার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে আছে।
তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল কেবল ক্ষমতার নয়, বরং সংগ্রাম, সংকট ও সহিষ্ণুতার এক দীর্ঘ পাঠ। ২০০৭ সালের এক-এগারোর পর পরিবারসহ গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, গৃহ থেকে উচ্ছেদ, দীর্ঘ অবরুদ্ধ জীবন, সন্তান হারানোর বেদনা-এ সবকিছুর মাঝেও তিনি দেশ ছাড়েননি, মাথা নত করেননি। ‘দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই’-এ উচ্চারণ কেবল আবেগ নয়, তাঁর রাজনৈতিক দর্শনেরও প্রকাশ। জোটের রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। ৭-দলীয়, ৪-দলীয়, ১৮-দলীয় থেকে ২০-দলীয়-এ ধারাবাহিক জোট-নির্মাণ প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না, বরং প্রয়োজনের মুহূর্তে সমঝোতা ও সংলাপের পথও খোলা রেখেছিলেন। নানা সময়ের জাতীয় সংকটে সংলাপের টেবিলে বসার সিদ্ধান্ত সে রাজনৈতিক পরিপক্বতারই পরিচয়।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত তাঁর সহনশীলতা ও দৃঢ়তা। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি আরও ভিন্ন এক খালেদা জিয়া হয়ে উঠেছিলেন-প্রতিশোধের নয়, বরং ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজের আহ্বান জানানো এক নেত্রী। তরুণদের উদ্দেশে দেওয়া তাঁর বক্তব্য ছিল ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য এক নৈতিক দিকনির্দেশনা। তার শেষ বক্তব্যগুলোর বার্তা যেন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক অনন্য পরিণতি, যার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সংঘাতের পথ পেরিয়ে তিনি ঐক্যের প্রতীকে পরিণত হন।
বেগম খালেদা জিয়া শুধু বিএনপির চেয়ারপারসন নন; তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর জীবন রাজনীতির ছাত্রদের জন্য এক বিরল পাঠ-কীভাবে গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্রনায়ক হওয়া যায়, কীভাবে পরাজয় ও নির্যাতনের ভেতর দিয়েও নিজের অবস্থান ধরে রাখা যায় এবং কীভাবে শেষ পর্যন্ত ঐক্যের প্রতীকে রূপ নেওয়া যায়। তাঁর ইন্তিকালে জাতি হারাল এক সংগ্রামী নারী নেত্রীকে, যিনি ইতিহাসের পাতায় চিরকাল বেঁচে থাকবেন-কখনো আপসহীন আন্দোলনের নেত্রী হিসেবে, কখনো ক্ষমতার শীর্ষে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে, আবার কখনো নিপীড়নের মুখেও অবিচল এক সাহসী নারীর প্রতিচ্ছবি হয়ে। আল্লাহ তাআলা তাঁর ভালো কাজগুলো কবুল করে তাকে জান্নাতবাসী করুন। আমিন।