দেশতো খোঁয়াড় নয় যে, সেখানে শুধু এক প্রজাতির কিছু প্রাণী বাস করবে। দেশ যদি মানুষের হয়, স্বাধীন হয়- তবে তো সেখানে নানা ধর্ম, বর্ণ ও ভাষার নাগরিকদের বসবাসটাই স্বাভাবিক। আর স্বাধীন দেশেরতো সংবিধান থাকবে, আইন-কানুন থাকবে এবং সবার থাকবে মানবাধিকার। সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে কোনো গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় বঞ্চিত ও নিপীড়িত হওয়ার কথা নয় স্বাধীনদেশে, বরং নিজের ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে সম্মানজনকভাবেই বাঁচার কথা সেখানে। এমন বক্তব্যের সাথে কারো দ্বিমত পোষণের সুযোগ নেই। বক্তব্য-বিবৃতি ও কথামালায় আমরা এমন চিত্রই লক্ষ্য করে থাকি। কিন্তু বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশের দাবিদার ভারতে এখন কেমন চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে? পত্র-পত্রিকায় এ নিয়ে প্রতিবেদন মুদ্রিত হয়েছে।
ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) আমলে আধুনিক ভারতের ইতিহাস বিনির্মাণের নতুন কোপ পড়েছে মোগল সম্রাট আকবর ও মহীশুরের শাসক টিপু সুলতানের ওপর। ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং’ (এনসিইআরটি) অনুমোদিত স্কুলশিক্ষার নতুন পাঠ্যপুস্তক থেকে আকবর ও টিপু সুলতানের জন্য ব্যবহৃত বহুল প্রচলিত বিশেষণ ‘গ্রেট’ বাতিল করা হয়েছে। ওই দু’জন এখন থেকে আর ‘মহান’ নন। এভাবে ইতিহাসের কাটাছেড়া বোধহয় চলতেই থাকবে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ ও বিজেপির যৌথ প্রচেষ্টায় গত ১১ বছর ধরে সংখ্যালঘু মুসলমানদের খাটো করে দেখাবার প্রচেষ্টা তো অব্যাহত ছিলো। উল্লেখ্য, নরেন্দ্র মোদি ভারতের ক্ষমতায় বসেন ২০১৪ সালে। ক্ষমতাসীন হওয়ার পাঁচ মাসের মধ্যে তৎকালীন মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী স্মৃতি ইরানির সাথে টানা সাতঘন্টা বৈঠক করেছিলেন সংঘ পরিবারের নেতারা। দিল্লির মধ্যপ্রদেশ ভবনে স্মৃতি ইরানির সঙ্গে সে বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন সুরেশ সোনি, দত্তাত্রেয় হোসাবোলের মতো শীর্ষ সংঘ কর্তা ও শিক্ষা ক্ষেত্রের সাথে যুক্ত নেতারা। সেই বৈঠকেই স্মৃতি ইরানিকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়, কেন তারা শিক্ষা ক্ষেত্রে আমূল সংস্কার চান। তারা জাগিয়ে তুলতে চান ভারতের সনাতন মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি।
স্কুলের পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন এনে ভারতীয়ত্বের ওপর জোর দিতে চান। বদল ঘটাতে চান প্রচলিত ইতিহাস চেতনায়। স্মৃতি ইরানির হাত ধরে শিক্ষা ক্ষেত্রে পরিবর্তনের যে হাওয়া বইতে শুরু করেছিল, তা আজও অব্যাহত রয়েছে। প্রথম প্রথম কিছু প্রতিরোধ এসেছিল, কিন্তু মোদির সাম্রাজ্য যত প্রসারিত হয়েছে, সেসব প্রতিরোধও তত শক্তি হারিয়েছে। এদিকে বিজেপি ও সংঘ পরিবারের আদর্শ অনুযায়ী ধর্মের আধারে সামাজিক বিভাজন চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে বদলানো শুরু হয় মোগল নামাঙ্কিত জনপদ ও স্থাপনার নাম। মোগল সরাই রেলস্টেশনের নাম বদলে রাখ হয় হিন্দুত্ববাদী চিন্তাবিদ দীনদয়াল উপাধ্যায়ের নামে। এলাহাবাদ শহরের নাম বদলে রাখা হয় প্রয়াগরাজ। আওরঙ্গবাদ হয় শম্ভুজিনগর। ফৈজাবাদ জেলার নাম হয়ে যায় অযোধ্যা। হায়দরাবাদের নাম বদলে ‘ভাগ্যনগর’ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। ভারতের প্রায় সর্বত্র বহু এলাকা, জনপদ, রাস্তা, রেলস্টেশন ও স্থাপনার নাম বদলে গেছে।
সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন এসেছে মোগল আমল বা মুসলিম ইতিহাসের সাথে জড়িত বিষয়ে। দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি ভবনের ‘মোগাল গার্ডেন্স’ ও অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারেনি, নতুন নাম হয়েছে ‘অমৃত উদ্যান’। এভাবে মুসলিমনদের ইতিহাস-ঐতিহ্য মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে মোদি সরকার। এমন তৎপরতায় হিন্দুত্ববাদের সংকীর্ণতা ও উগ্রতা প্রকাশ পেলেও তাতে মুসলিম শাসকদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস বিলুপ্ত হবে না। ইতিহাস গ্রন্থে তা প্রোজ্জ্বল হয়ে থাকবে। আমরা জানি, ভারত বহু ধর্ম-বর্ণ ও ভাষার একটি দেশ। ভারতের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী কেমন করে মুসলিম ও মোগাল শাসকদের দীর্ঘ শাসন ও অবদানের কথা অস্বীকার করবে? শাসক হিসেবে মোদী সরকারের উচিত হবে সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষকে নিয়ে এক সমৃদ্ধ সমাজ ও দেশ গড়ার চেষ্টা করা। সাম্প্রদায়িক ও বিভক্তির চেতনায় ঘৃণার রাজনীতি দিয়ে তো দেশ গড়া সম্ভব নয়। বিষয়টি মোদি সরকার উপলব্ধি করলেই মঙ্গল।