নির্বাচন গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। জনগণ ভোটের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধি বেছে নেয় এবং সে প্রতিনিধিদের মাধ্যমেই রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালিত হয়। তাই নির্বাচন কতটা অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হচ্ছে, তার ওপর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার শক্তি অনেকাংশে নির্ভর করে। আর একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার বিকল্প নেই। নির্বাচন কমিশন যদি সরকারের প্রভাবমুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে না পারে, তাহলে কাগজে-কলমে যত সুন্দর আইন ও বিধিবিধানই থাকুক, বাস্তবে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা কঠিন।

অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো শুধু ভোটের দিন নির্বাচন কমিশনের উপস্থিতি থাকলেই নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না। নির্বাচনের আগে মাঠ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের আচরণ, প্রচারের সমান সুযোগ এবং ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়ার পরিবেশ সবকিছুই কমিশনের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির আওতায় থাকতে হবে। কমিশনকে যদি কোনো পক্ষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে কাজ করতে হয়, তাহলে তার সাংবিধানিক স্বাধীনতা কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ও আইনগত ক্ষমতাও রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সে ক্ষমতা প্রয়োগের সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক স্বাধীনতা কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে, সেটিই বড় প্রশ্ন। স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভূমিকা, নিরপেক্ষতা ও সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে সম্প্রতি একটি নিয়োগকে কেন্দ্র করে।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, সম্প্রতি সরকারি বিভিন্ন করপোরেশন ও সংস্থায় ১২ জন বিএনপি নেতাকে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব পেয়েছেন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাস কমিটির সদস্য মো. শামসুল আলম। তবে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে তাকে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ দেওয়ায় রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিরোধী দলগুলো এই নিয়োগে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সরকার বলছে, এ ধরনের নিয়োগের আইনগত এখতিয়ার তাদের রয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে তাকে নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়ায় নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার শঙ্কা থাকতে পারে।

তারা মনে করেন, কেউ পেশাগত জীবনে বঞ্চনার শিকার হলে বিধি মোতাবেক ভূতপূর্ব পদোন্নতি দিয়ে বা পাওনা সুবিধা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অবসরের পর প্রত্যক্ষ দলীয় রাজনীতিতে জড়ানো ৬৭ বছর বয়সি একজন ব্যক্তিকে পুনরায় সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনা অগ্রহণযোগ্য।

আমরা মনে করি, বিশ্লেষকরা সঠিক কথাই বলেছেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে এ নিয়োগ দেওয়া সমীচীন নয় বলে আমরা মনে করি। এই নিয়োগ তাই কারোরই কাম্য হতে পারে না। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় স্থানীয় নির্বাচনকে অনেক সময় কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হলেও বাস্তবে এর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। কারণ স্থানীয় সরকারই সাধারণ মানুষের সবচেয়ে কাছের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের জনপ্রতিনিধিরাই নাগরিকদের দৈনন্দিন নানা সেবা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য না হলে তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

আসন্ন স্থানীয় নির্বাচন হতে পারে বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে নতুন আস্থা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে নির্বাচন কমিশনকে সত্যিকার অর্থেই স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ দিতে হবে। ইসি সচিবালয়ে রাজনৈতিকভাবে পদায়ন তাই কোনক্রমেই কাম্য নয়। আমরা সরকারের কাছে বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানাই।