গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি হলো সত্যনিষ্ঠ তথ্যপ্রবাহ। দায়িত্বশীল গণমাধ্যম রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণের মধ্যে আস্থার সেতুবন্ধন তৈরি করে। কিন্তু যখন সে গণমাধ্যমই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা তথ্য, বিকৃত বর্ণনা ও অপপ্রচার ছড়িয়ে দেয়, তখন তা কেবল সাংবাদিকতার নৈতিকতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে নাÑএকটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতীয় মিডিয়ার ভূমিকা সে উদ্বেগকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
সম্প্রতি ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত ‘পলিসি কনক্লেভ অন মিসইনফরমেশন: চ্যালেঞ্জেস টু গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’ শীর্ষক নীতিসংলাপে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্টভাবে অভিযোগ করেছেনÑভারতের বহু গণমাধ্যম, এমনকি দেশটির সর্বাধিক পঠিত বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকাও বাংলাদেশ সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রকাশে ব্যর্থ হয়েছে এবং মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছে। এ বক্তব্য নিছক কোনো কূটনৈতিক অসন্তোষ নয়; বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে চলমান একটি গভীর সমস্যার প্রতিফলন।
প্রেস সচিবের ভাষায়, গত ১৮ মাসে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে ভারতীয় মিডিয়া ভয়াবহ মাত্রায় মিসইনফরমেশন ও ডিজইনফরমেশন ছড়িয়েছে। প্রতিদিন বাংলাদেশকে নিয়ে মিথ্যা খবর, বিকৃত বিশ্লেষণ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। ‘অফ ইন্ডিয়া’ নামের একটি ওয়েবসাইটের কথা উল্লেখ করে তিনি দেখিয়েছেনÑকীভাবে ঘৃণা ছড়ানোকে নিয়মিত চর্চায় পরিণত করা হয়েছে। আরও উদ্বেগজনক হলো, এ অপপ্রচার কেবল প্রান্তিক বা অখ্যাত প্ল্যাটফর্মেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভারতের বড় বড় দৈনিক পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলও এতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত।
এ অপপ্রচারের মূল লক্ষ্য কীÑসে প্রশ্ন অস্বস্তিকর হলেও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। শফিকুল আলমের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে একটি শান্তিপূর্ণ ক্ষমতার পালাবদল এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের প্রচেষ্টাকে প্রশ্নবিদ্ধ করাই এই অপপ্রচারের অন্যতম উদ্দেশ্য। বাইরে এমন একটি ইমেজ তৈরি করা হচ্ছে যে, গণতন্ত্র এলেও বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা নিরাপদ থাকবে না, রাজনৈতিক দলগুলোর অধিকার খর্ব করা হচ্ছে, কিংবা দেশটি অস্থিতিশীলতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। বাস্তবতার সঙ্গে এসব দাবির মিল না থাকলেও নিরন্তর প্রচারের ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছেÑযা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑমিসইনফরমেশন ও ডিজইনফরমেশন এখন আর কেবল গণমাধ্যমগত সমস্যা নয়; এটি সরাসরি গভর্ন্যান্স ও গণতন্ত্রের জন্য হুমকি। ভুল তথ্য জনগণের মধ্যে অবিশ্বাস সৃষ্টি করে, সামাজিক বিভাজন বাড়ায় এবং রাষ্ট্রের বৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা দুর্বল করে। যখন এ অপপ্রচার সীমান্তের বাইরে থেকে পরিচালিত হয়, তখন তা এক ধরনের ‘তথ্যযুদ্ধ’-এর রূপ নেয়Ñযেখানে লক্ষ্য থাকে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নষ্ট করা। আরও উদ্বেগজনক হলো, এই অপপ্রচারে ভারতের কিছু রাজনৈতিক স্বার্থ ও বাংলাদেশের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বক্তব্য প্রায় একই সুরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছেÑযার কথা প্রেস সচিব সরাসরি উল্লেখ করেছেন। ভারতীয় মিডিয়া ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নিয়মিতভাবে যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তা কেবল অন্তর্বর্তী সরকারকেই নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে। এটি কোনোভাবেই একটি বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল আচরণ হতে পারে না।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের করণীয় কীÑ সে প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, সরকারকে কেবল প্রতিক্রিয়াশীল হলে চলবে না; কৌশলগতভাবে তথ্যভিত্তিক পাল্টা বয়ান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে হবে। দ্বিতীয়ত, দেশের গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল, অনুসন্ধানী ও পেশাদার হতে হবেÑ যাতে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা বা অস্পষ্টতা বাইরের অপপ্রচারের সুযোগ না তৈরি করে। তৃতীয়ত, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভুয়া তথ্য শনাক্ত ও মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি, তবে তা যেন কখনোই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন করার অজুহাতে পরিণত না হয়।
সবচেয়ে বড় কথা, গণতন্ত্রের শক্তি আসে স্বচ্ছতা ও সত্য থেকে। বাংলাদেশ যদি একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে পারে, তবে কোনো অপপ্রচারই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে না। ভারতীয় মিডিয়ার অপপ্রচার আজ কেবল একটি যোগাযোগগত সমস্যা নয়; এটি স্থিতিশীল বাংলাদেশের জন্য একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজÑ সব পক্ষকেই সত্যের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।