এবারের রমযান ও ঈদ অনেকটা স্বস্তিদায়ক পরিবেশেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। রমযান আসলেই বাজারে আগুন লাগার অপসংস্কৃতি থেকে অনেকটাই বেড়িয়ে আসা গেছে। তাই বাজার নিয়ে সাধারণ মানুষের খুব একটা পেরেশানি ছিলো না। কারণ, পুরো রমযানে বাজার পরিস্থিতি অন্যবারের তুলনায় বেশ স্বস্তিদায়কই ছিল। ঈদযাত্রা নিয়ে ভোগান্তি ও বর্ধিত ভাড়ার তাণ্ডব তেমন একটা দেখা যায়নি। তাই স্বৈরাচার, আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদ মুক্ত পরিবেশে এবারের ঈদ ছিলো বেশ আনন্দমুখর ও সাবলীল।
ঈদ পরবর্তী বাজার পরিস্থিতি অনেকটা ইতিবাচক বৃত্তেই রয়ে গেছে। কারণ, ঈদের পর মূল্য পরিস্থিতিতে খুব একটা হেরফের হয়নি বরং আগের মতোই রয়েছে নিত্যপণ্যের দাম। গোস্তের বাজারে মুরগির দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ৩০ টাকা কমলেও আগের দামে বিক্রি হচ্ছে গরু ও খাসির গোস্ত। ঈদের পরদিন সব বাজারের অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ ছিল। তবে ধীরে ধীরে সকল দোকান-পাট ও বিপণি কেন্দ্রগুলো খুলতে শুরু করেছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি কম। তাই অধিকাংশ বিক্রেতাও অলস সময় পার করছেন। বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাজারে ক্রেতার চাহিদা খুবই সীমিত। তাই বেশির ভাগ পণ্যের সরবরাহ কিছুটা কম। মূলত, মূল্য পরিস্থিতিতে কোন নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি বরং সবকিছুই চলছে ইতিবাচক বৃত্তেই।
রাজধানীর বাজার সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, রমযানে পটল বিক্রি হয়েছে ১০০ টাকায়, এখন বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকায়। ঢ্যাঁড়স ও বরবটির ঈদের আগে ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৫০ টাকায়। এছাড়া কাঁচা মরিচ ৮০ থেকে ১২০ টাকা, শিম ৫০ থেকে ৬০, টমেটো ৪০ থেকে ৫০, বেগুন ৭০ থেকে ৮০ ও পেঁপে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতিটি লাউয়ের দাম ৬০ থেকে ৭০ টাকা। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে আকারভেদে প্রতি হালি লেবু বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং প্রতি কেজি শসা ৬০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। ঈদের আগে রোজার সময় লেবুর দাম হালিতে ১০ টাকা ও শসার দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেশি ছিল। তবে টমেটোর দাম কেজিপ্রতি বেড়েছে ২০ টাকা। সরেজমিন সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, ঈদের পরদিন সব বাজারেই অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ ছিল। তবে এখন খুলতে শুরু করেছে। ক্রেতাদের বেশির ভাগই জানাচ্ছেন, তাঁরা খুব জরুরি প্রয়োজনে বাজারে এসেছেন। অনেকে ঈদের ছুটিতে আত্মীয়স্বজনের বাসায় দাওয়াত করে খাওয়ান। তাই সে উপলক্ষে অনেকে বাজার করতে আসছেন। তবে ক্রেতাদের মধ্যে কোন উদ্বেগ-উৎকন্ঠা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না বরং তারা আগের তুলনায় কিছুটা স্বস্তিতেই রয়েছেন বলেই মনে হচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, বাজারে গরু ও খাসির দাম আগের মতোই রয়েছে। গতকাল পর্যন্ত আগের দামে মুরগি বিক্রি হলেও কেজিতে ১০ থেকে ৩০ টাকা কমেছে। ব্রয়লার মুরগি ২১০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সোনালি মুরগির কেজিতে দাম হাঁকা হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা। অর্থাৎ সোনালি মুরগির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকার কমেছে। অন্যদিকে গরুর গোস্তের দামও অপরিবর্তিত রয়েছে। গতকাল প্রতি কেজি গরুর গোস্ত ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। ঈদের আগের দিনও এ দামেই গরুর গোস্ত বিক্রি হয়েছিল। তবে বাজারে গরু ও খাসির মাংসের ক্রেতা উপস্থিতি বেশ কম। রাজধানীর মাংস বিক্রেতারা বলছেন, ঈদের আগের ১০ দিন দু’টি করে গরু বিক্রি করলেও এখন তা কমে এসেছে। কোন ভাবেই ২৫/৩০ কেজির বেশী বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। মুরগী ব্যবসায়িরা জানাচ্ছেন, ক্রেতা কম থাকায় বাজারে সরবরাহ কমেছে। কিছু মুরগির দোকান খুললেও অধিকাংশ এখনো বন্ধ রয়েছে। ঈদের আগে রমযানের প্রতিদিন ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মুরগি বিক্রি করলেও আজকে এখন পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে ৭০টি। মাছের বাজারে ক্রেতার আনাগোনা মাংসের বাজারের তুলনায় অনেকটাই কম। বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহ কম, তাই দাম কিছুটা বাড়তি। নদীর বিভিন্ন প্রজাতির মাছ কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেড়েছে। আর সাধারণ চাষের মাছের দাম বেড়েছে ৩০ থেকে ৫০ টাকা।
প্রায় ১৬ বছরের স্বৈরাচারি ও ফ্যাসীবাদী আমলে বাজারের ওপর কারো কোন নিয়ন্ত্রণ ছিলো না। মূলত বাজার নিয়ন্ত্রণ করতো একশ্রেণির অতি মুনাফাখোর অসাধু ব্যবসায়ি ও সরকার সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেট। আর বাজারের এসব স্বঘোষিত রথী-মহারথীরা রমযান ও ঈদ আসলেই অতিমাত্রায় তৎপর হয়ে ওঠেন। কৃত্রিমভাবে মূল্যবৃদ্ধি করে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করা হয়।
কিন্তু এবার অন্তর্বর্তী সরকারের সতর্ক পদক্ষেপের কারণে সে অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। রমযান মাস ও ঈদে এবার বাজার পরিস্থিতি ছিলো অন্যবারের তুলনায় স্বস্তিদায়ক ও ইতিবাচক। কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছাড়া সে ইতিবাচক ধারা এখনো অব্যাহতই রয়েছে। আমরা আশা করবো সরকার মূল্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতিশীল রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।