দিবা-রাত্রির বিভিন্ন প্রহরে ঘটে যায় নানা ঘটনা। তবে সব ঘটনার মান ও মাত্রা একরকম নয়। কখনো কখনো এমন ঘটনা ঘটে যায়, যা সমাজকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। ‘দুই শিক্ষক ও এক কর্মকর্তার পরিকল্পনায় শিক্ষিকাকে হত্যা’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি সমাজে বড় প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে এমন ঘটনা কেমন করে ঘটে? বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও মনন কি উচ্চতর জ্ঞান ও মূল্যবোধের সহায়ক নয়? কুষ্টিয়ায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ দপ্তরে শিক্ষক আসমা সাদিয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চারজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন নিহতের স্বামী। ঘটনার সময় নিহতের অফিস কক্ষ থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার কর্মচারী ফজলুর রহমানকে ১ নম্বর আসামী করা হয়েছে। এছাড়া আসমার সহকর্মী দুই শিক্ষক ও এক সহকারী রেজিস্ট্রারকে আসামী করা হয়। মামলার আসামী ওই দুই শিক্ষক হলেন সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার ও হাবিবুর রহমান। আসমা সাদিয়ার আগে শ্যাম সুন্দর বিভাগটির সভাপতি ছিলেন। অপর আসামী বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস উম্মুল মোমেনিন আয়েশা সিদ্দিকা হলের সহকারী রেজিস্ট্রার। কিছুদিন আগে সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে তাকে সেখানে বদলি করা হয়।

বুধবার দিবাগত রাতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় মামলা করেন নিহত আসমার স্বামী মু. ইমতিয়াজ সুলতান। এজাহারে তিনি অভিযোগ করেন, ওই দুই শিক্ষক ও এক কর্মকর্তার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও নির্দেশে কর্মচারী খন্দকার ফজলুর রহমান আসমা সাদিয়াকে হত্যা করেন। মামলায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদেরও আসামী করা হয়েছে, তবে সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কুষ্টিয়া পুলিশের মুখপাত্র ও অদিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অবস) ফয়সাল মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘মামলায় চারজন আসামীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আসামীদের ধরতেও আইনি পদক্ষেপ নিতে পুলিশ কাজ করছে।’ বাদী মামলায় উল্লেখ করেন, ২০১৮ সালে ফজলুর রহমান সামাজকল্যাণ বিভাগের বিভাগীয় তহবিল থেকে অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ পান। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আসমা সাদিয়া বিভাগের সভাপতি হন। আগের সভাপতি শ্যাম সুন্দর তার সময়ের বিভাগের আয়-ব্যায়ের হিসাব আসমাকে বুঝিয়ে দেননি। সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার আসমা সাদিয়াকে বলেন, তারা যেভাবে বলবেন এবং কাগজ সামনে ধরবেন সেখানে তাকে শুধু স্বাক্ষর করতে হবে। সে সময় আসমা বিভাগের টাকা অপব্যবহার করা যাবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তখন থেকেই আসমার সঙ্গে বিশ্বজিৎ ও শ্যাম সুন্দরের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ফজলুরসহ তিনজন মিলে বিভাগের অর্থ আত্মসাৎ ও অপব্যবহার করতেন। আসমাকে বিভিন্ন সময় ওরা হেনস্তা করেন। এরপর শিক্ষক হাবিবুর রহমানের সামনে আসমার সাথে অশালীন ও অপমানজনক আচরণ করেন ফজলুর। কিন্তু হাবিবুর রহমান এর কোনো প্রতিবাদ করেননি।

এসব ঘটনা সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন রোকসানা মিলিকে মৌখিকভাবে আসমা অবহিত করেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। এনিয়ে ডিনের নির্দেশে বিভাগে সভাও হয়েছিল। এক পর্যায়ে কয়েক মাস আগে ডিনের নির্দেশে বিভাগীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও বিভাগীয় সভাপতিকে অসহযোগিতা করায় ফজলুরকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শিক্ষক হাবিবুর রহমান। তিনি আসমাকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলেন, ফজলুরকে আবার সমাজকল্যাণ বিভাগে নিয়ে আসবেন। অন্যদিকে বিভাগের অর্থ তছরূপের ঘটনায় বিশ্বজিৎকে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বদলি করা হয়। এরপর আসামীরা সবাই মিলে হত্যার পরিকল্পনা করেন এবং হত্যাকাণ্ড ঘটান। ঘটনা এবং মামলার বিবরণীতে উপলব্ধি করা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মত প্রতিষ্ঠানেও দুর্নীতি, প্রতিহিংসা এবং নীতিহীনতা কতটা প্রবল হয়ে উঠেছে। ফলে হত্যাকাণ্ডের মত নৃশংস ঘটনা ঘটে গেল। সম্ভাবনাময় ও নীতিবান একজন অধ্যাপিকাকে অকালেই বিদায় নিতে হলো পৃথিবী থেকে। এমন ঘটনার সুষ্ঠু ও ন্যায়সঙ্গত তদন্ত প্রয়োজন, যাতে সঙ্গত ও কঠোর শাস্তিপ্রদানের কাজটি দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। এ কাজে যেন কোনো পক্ষের কোনো বাধা না আসে। বাধা আসলে জুলাইয়ের চেতনায় রুখে দাঁড়াতে হবে ছাত্র-শিক্ষক ও নাগরিক সমাজকে।