রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায় পদ্মা নদীতে বাসডুবির ঘটনায় ২৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে আটজন পুরুষ, ১১ জন নারী এবং সাতজন শিশু। নিহতদের মধ্যে ১৮ জনই রাজবাড়ী জেলার বাসিন্দা। বাকিরা কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, দিনাজপুর, গোপালগঞ্জ এবং ঢাকার বাসিন্দা। এ ঘটনায় এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ছয়জন। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এ খবরে উদ্বিগ্ন না হয়ে উপায় নেই। ঈদুল ফিতরের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরার সময় এ বিষাদময় ঘটনা ঘটলো। এতগুলো প্রাণ ঝরে যাওয়ার এ খবরে শোক জানাবার ভাষা নেই। এ মৃত্যু কারোই কাম্য নয়। আমরা নিহতদের রূহের মাগফেরাত কামনা করি, শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোকে জানাই সমবেদনা। আমাদের প্রশ্ন এই মৃত্যুর দায় কার? ঈদের পরপরই এ দুঃখজনক ঘটনা সারা জাতিকে ব্যথিত করেছে। এভাবে ফেরিঘাটে অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু মানুষকে শোকগ্রস্ত ও আহত না করে পারে না।

খবরে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান, বুধবার বিকেল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ফেরিতে ওঠার আগে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি সরাসরি পানিতে পড়ে ডুবে যায়। প্রায় ৬০ ফুট গভীরে ডুবে যায় বাসটি। দীর্ঘ সময় অভিযান চালিয়ে রাত ১২টা ৩৮ মিনিটে বাসটি উদ্ধার করা হয়। বাসটিতে আনুমানিক ৪০ জন যাত্রী ছিলেন। রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে বাসডুবির ঘটনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) অর্থনীতি বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আহনাফ তাহমিদ খান রাইয়ানের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্ঘটনার সময় একই বাসে রাইয়ানের মা, বড় বোন ও ভাগ্নেও যাত্রী ছিলেন। এর আগে বুধবার তার মায়ের লাশ উদ্ধার করা হয় এবং গুরুতর আহত অবস্থায় বড় বোন ডা: সাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সাভারের পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্রের (সিআরপি) সিনিয়র অকুপেশনাল থেরাপিস্ট আয়েশা আক্তার সোমা এবং তার ৮ মাস বয়সের ছেলে আরসানের লাশ পদ্মা নদীর পৃথক স্থান থেকে ডুবুরি দল উদ্ধার করেছে। এছাড়া বিভিন্ন জেলার যাত্রী রয়েছে মৃতদের তালিকায়।

ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, উদ্ধারকারী দল ও স্থানীয়দের সহায়তায় আটজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও পাঁচজন নারী। তবে হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসক দুই নারীকে মৃত ঘোষণা করেন। উদ্ধার অভিযানে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ও ১০ জন ডুবুরি অংশ নেন। পাশাপাশি সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিআইডব্লিউটিএ, কোস্টগার্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের সদস্যরাও যৌথভাবে উদ্ধারকাজে অংশগ্রহণ করেন। এবারের ঈদের যাত্রাপথ যেন মৃত্যু উপত্যকা। কেউ ঈদ উদ্যাপনে বাড়ি যেতে, আবার কেউ কর্মস্থলে ফিরতে প্রাণ হারিয়েছেন। ঈদের আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে বিষাদে। ঈদের আগে ও পরে সড়ক, রেল ও নৌপথে বড় কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এবারের ঈদ যাত্রায় বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ৩৪২টি দুর্ঘটনায় ২৭৪ জন নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২২ সালে ৪৪৩ জন; ২০২৩ সালে ৩২৮ জন; ২০২৪ সালে ৪৩৭ জন এবং ২০২৫ সালের ঈদযাত্রায় বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ৩২২ জন নিহত হয়েছেন।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য বলছে, গত চার বছরে আটটি ঈদে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩ হাজার ৬৭ জন। আহত হয়েছেন ৬ হাজার ৯৯৬ জন। বাংলাদশে সড়ক দুর্ঘটনা মৃত্যুর একটি বড় কারণ। পরিসংখ্যান বলছে, শুধু গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে ৫১৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৩২ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ১ হাজার ৬৮ জন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৬ জন নারী ও ৬২ জন শিশু রয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের ৪০ দশমিক ২৭ শতাংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। ঈদ যাত্রায় দুর্ঘটনা বেড়ে যায়। আমরা মনে করি সড়কে এই মৃত্যু রোধ করতে এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার কথা ভাবতে হবে। দৌলতদিয়ার ঘটনাটির বিষয়ে তদন্ত কমিটি হয়েছে। আমরা আশা করি তদন্ত কমিটি প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে প্রতিবেদন দেবে। আর এতে যে বা যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।