বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ অধ্যায় শেষ হলো বেগম খালেদা জিয়ার প্রস্থানে। এ অধ্যায় শুধু একজন নেত্রীর জীবনকথা নয়, এটি একটি জাতির গণতন্ত্রের জন্য টানা তিন দশকের সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। আশির দশকে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে রাজনীতিতে তার আবির্ভাব কোনো ব্যক্তিগত উচ্চাকাক্সক্ষার ফল ছিল না; বরং ছিল রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়, রাজনৈতিক শূন্যতা এবং গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের অভাব থেকে জন্ম নেওয়া এক ঐতিহাসিক প্রয়োজন। সে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি ছিলেন এক অবিচল গণতান্ত্রিক সংগ্রামী, যিনি ক্ষমতার লড়াইয়ের মাঝেও বারবার স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার দ্বন্দ্ব একটি আলাদা যুগ তৈরি করেছে। কিন্তু এ দ্বন্দ্বকে সমান দোষের পাল্লায় মাপলে বাস্তবতা বিকৃত হয়। খালেদা জিয়া যেমন রাজনৈতিক কৌশলে কঠোর থাকলেও কখনো জিঘাংসা ও প্রতিহিংসার চর্চা করেননি। অন্যদিকে, শেখ হাসিনার শাসনামল বিরোধী কণ্ঠ দমন, একদলীয় প্রবণতা, নির্বাচন ব্যবস্থার ভাঙন, গুম-খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অভিযোগের মতো অসংখ্য অভিযোগে অভিযুক্ত। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আপসহীনতার সমালোচনা থাকলেও, তার আমলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করার এমন পদ্ধতিগত চিত্র দেখা যায়নিÑ এটি ইতিহাসের নিরপেক্ষ পাঠে সহজেই পরিষ্কার হয়ে যায়। শেখ হাসিনার সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব কেবল দু’ব্যক্তির ক্ষমতার লড়াই ছিল না; বরং ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং গণতন্ত্রের অর্থ নিয়ে দুটি ভিন্ন ধারার প্রতিযোগিতা। পুরুষতান্ত্রিক ও কর্তৃত্বনির্ভর সমাজব্যবস্থায় দু’মুসলিম নারীর এ আধিপত্য বাংলাদেশের রাজনীতিকে একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে, অন্যদিকে তেমনি দীর্ঘস্থায়ী বিভাজনের বীজও বপন করেছে।

স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে খালেদা জিয়া ছিলেন অবিচল। গ্রেপ্তার, অসুস্থতা কিংবা রাজনৈতিক নিঃসঙ্গতা তাকে পিছিয়ে দেয়নি। ১৯৯১ সালে তিনি যখন প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন দেশ এক দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর গণতন্ত্রের পথে ফিরে আসার চেষ্টা করছিল। তার নেতৃত্বেই সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়, সংবাদমাধ্যম পায় তুলনামূলক স্বাধীনতা, অর্থনীতি ধীরে ধীরে মুক্ত বাজার ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হয়। ২০০১-০৬ মেয়াদে জিডিপি প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি, পোশাক শিল্পের বিস্তার এবং নারী শিক্ষায় অগ্রগতি তার শাসনামলের বাস্তব অর্জন।

তার রাজনৈতিক জীবনের সমালোচনাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। নির্বাচন বর্জন, সংসদে একটানা অনুপস্থিতি, সহকর্মীদের দুর্নীতির লাগাম টানতে না পারা কিংবা দলীয় রাজনীতির সংকীর্ণতা-এসব তার উত্তরাধিকারকে জটিল করেছে। কিন্তু এ সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি কখনো একদলীয় শাসনের পথে হাঁটেননি, বিরোধী কণ্ঠকে রাষ্ট্রীয় শক্তি দিয়ে নিশ্চিহ্ন করার সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি তার আমলে। ব্যক্তিগত জীবনের দুঃখগাথা তার রাজনৈতিক দৃঢ়তাকে আরও স্পষ্ট করে। স্বামীর হত্যাকা-, সন্তানদের ট্র‍্যাজেডি, দীর্ঘ কারাবাস ও অসুস্থতা-সব মিলিয়ে তার জীবন ছিল এক কঠিন পরীক্ষা। তবু ১/১১ পরবর্তী সামরিক-সমর্থিত সময়েও দেশ ছেড়ে না গিয়ে তিনি বিএনপিকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করেছেন। এটি ছিল শুধু দলের প্রতি নয়, দেশের রাজনীতির ধারাবাহিকতার প্রতিও তার অঙ্গীকার।

২০২৪ সালের আগস্টে জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তার সংযমী আহ্বানÑপ্রতিশোধ নয়, শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক উত্তরণÑতার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে পরিণত বার্তাগুলোর একটি। যখন তার বিরুদ্ধে বছরের পর বছর নিপীড়ন চালানো শক্তির পতন ঘটেছে, তখনও তিনি প্রতিহিংসার পথে না গিয়ে স্থিতিশীলতার কথা বলেছেন- যা বর্তমান রাজনীতিতে বিরল। আজ তার অনুপস্থিতিতে বিএনপির সামনে যেমন উত্তরাধিকারের প্রশ্ন, তেমনি দেশের সামনে বড় প্রশ্ন- বাংলাদেশ কি অবশেষে ব্যক্তিকেন্দ্রিক দ্বন্দ্বের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র গড়ে তুলতে পারবে? খালেদা জিয়ার সংগ্রাম তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন নির্বাচন হবে গ্রহণযোগ্য, বিরোধী দল থাকবে স্বাধীন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আর কখনো দমনযন্ত্রে রূপ নেবে না। গণতন্ত্রের পথে তার দীর্ঘ যাত্রা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়-ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান স্থায়ী। সেই প্রতিষ্ঠানকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোই হবে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি জাতির প্রকৃত শ্রদ্ধা। গণতন্ত্র সংহত হলেই তার সংগ্রাম সত্যিকার অর্থে ইতিহাসে সার্থকতা পাবে।