ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আগামীতে যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্বাচন। এ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতীয়মান হবে বাংলাদেশ কি উদার গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় পদার্পন করবে নাকি আবারো স্বৈরাচারের অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে? বাংলাদেশের ইতিহাসে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত কোন নির্বাচনই সর্বাঙ্গ সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য হয়নি। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রতিটি নির্বাচনই কোন না কোনভাবে বিতর্কিত হয়েছে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোই অপেক্ষাকৃত ছিল বিতর্কমুক্ত এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু ২০০৮ সালে সেনা শাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনও ছিল বিতর্কিত। সে সময় সেনা শাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় নিয়ে আসার জন্য নানা কৌশল গ্রহণ করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সার্বিকভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে কোন দলীয় সরকারের অধীনেই সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। এরশাদ বিরোধি আন্দোলন চলাকালে জামায়াতে ইসলামি বাংলাদেশ প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি উত্থাপন করে। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল বিএনপি সরকারে বিরুদ্ধে আন্দোলনকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি উত্থাপন করে। তারাই ধারাবাহিকতায় তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে।
২০০৮ সালে সেনা শাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হয়ে আওয়ামী লীগ বিচারিক আদালতে ব্যবহার করে বিতর্কিত রায়ের মাধ্যমে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। পরবর্তীতে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। আদালত তত্ত্ববধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল সংক্রান্ত কোর্টের রায় বাতিল করে দিয়েছে। বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে। পরবর্তীতে জাতীয় নির্বাচনসমূহ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে। ফলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবার ক্ষেত্রে কোন আইন প্রতিবন্ধকতা থাকছে না। অন্তর্বর্তী সরকার একটি অনির্বাচিত সরকার এবং তাদের কোন রাজনৈতিক অভিলাষ না থাকাই সঙ্গত। অন্তর্বর্তী সরকার কতটা পক্ষপাতবিহীন এবং নির্মোহভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে তা দেখার জন্য জাতি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
যে কোন নির্বাচন সুষ্ঠু এবং সর্বাত্মক গ্রহণযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক পর্যায় থেকে লেভেল ‘প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করতে হয়। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখনো ‘প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরির কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক দলগুলো অভিযোগ করছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ‘প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ এখনো গ্রহণ করতে পারেননি। বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষপাতিত্ব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নির্বাচন সুষ্ঠু এবং সুন্দর করার জন্য দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে স্বাভাবিক অবস্থায় রাখা খুবই জরুরি। কিন্তু সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে দৃশমান কোন সাফল্য এখনো দেখাতে পারছে না। ইতিমধ্যেই বেশ কিছু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড সংঘঠিত হয়েছে। নির্বাচনের আগে কোন কোন মহল থেকে টার্গেট কিলিং করার হতে পারে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকলে ভোটারগণ নির্বিঘ্নে ভোট কেন্দ্রে গমন ও ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে না। প্রতি বারই দেখা যায় নির্বাচনের আগে টাকার খেলা শুরু হয়। এটা নির্বাচনকে বিতর্কিত করতে পারে।
নির্বাচনের সময় প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে কেউ যাতে সীমাতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবারই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সরকারি কর্মকর্তা, যারা নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে থাকেন তারা নির্বাচনে সম্ভাব্য বিজয়ী দলের প্রতি অনুগত থেকে তাদের নানাভাবে সহায়তা করে থাকেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরে যেসব কর্মকর্তা বিভিন্ন ব্যানারে দলীয় রাজনীতি চর্চা করে থাকেন তাদের নির্বাচনী দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখতে হবে। বিগত সরকারের আমলে প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার হিসেবে দলীয় সমর্থকদের নিয়োগ দেয়া হতো। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যাতে সে ঘটনার পুনরাবৃত্তি না গটে তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার যদি জাতির আকাক্সক্ষা মোতাবেক সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে পারে তাহলে তারা ইতিহাসে স্থান করে নেবে। আর যদি ব্যর্থ হয় তাহলে জাতি তাদের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করবে এবং জাতি আবারো অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।