ইরান যুদ্ধে ট্রাম্প কি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন? আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন এমন প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইসরাইলের যৌথ হামলার সময় এক মাস হয়ে গেছে। এ হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরানও পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফলে একেক সময়ে একেক ধরনের বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন তিনি। তার এসব মন্তব্য সামনে রেখে বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন ট্রাম্প। লন্ডনভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যাংক পিল হান্ট সতর্ক করেছে, ট্রাম্পের এমন নিয়ন্ত্রণ হারানোয় মন্দার কবলে পড়তে পারে বিশ্ব অর্থনীতি।

এদিকে বৃটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ পিল হান্টের বরাত দিয়ে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বড় অর্থনীতির দেশগুলো ‘মুদ্রাস্ফীতিজনিত’ মন্দার ঝুঁজিতে পড়তে পারে। ফলে বিশ্বঅর্থনীতি মন্দার দিকে ধাবিত হতে পারে। ব্যাংকটি আরো বলেছে, তারা সুদহার বৃদ্ধির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিতে পারছে না। ব্যাংকটি সতর্ক করে বলেছে, এখন এই সংঘাতের দ্রুত অবসান ঘটলেও অন্তত আরো দুই সপ্তাহ বিশ্বঅর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব বজায় থাকবে। বিনিয়োগ ব্যাংকটি বলছে, এখন এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ করা ট্রাম্পের জন্য আরো কঠিন হয়ে পড়েছে। আর যুদ্ধ শেষ হলেও হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মতে, বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি যুদ্ধ শুরুর পর বন্ধ করে দেয় ইরান। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই নৌপথটি পুনরায় না খুলে দিয়েই যুদ্ধ শেষ করার কথা ভাবছেন ট্রাম্প। মঙ্গলবার বৃটেন ও মিত্রদেশগুলোকে ‘নিজেদের তেল নিজেদেরই সংগ্রহ করতে’ বলেছেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে সৃষ্ট জ¦ালানি সংকটের সমাধানও নিজেদের করতে বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

পিল হান্টের প্রধান অর্থনীতিবিদ ক্যালুম পিকারিং বলেছেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন, যা একটি দ্রুত ও একতরফা সমাধানকে আরো কঠিন করে তুলেছে এবং যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার ঝুঁকি বাড়ছে। তিনি আরো বলেন, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ¦ালানি সংকট পশ্চিম থেকে পূর্বে ছড়িয়ে পড়ছে। এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার কিছু অংশে ইতিমধ্যেই জ¦ালানি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এরপর যদি ইউরোপের পালা আসে, তবে এটি বিশ্বব্যাপী মন্দার আশঙ্কাকে আরো বাড়িয়ে দেবে। মঙ্গলবার প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ইরান যুদ্ধের কারণে জ¦ালানির দাম চার দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় মার্চ মাসে ইউরোজোনের মুদ্রাস্ফীতি এক দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে দুই দশমিক পাঁচ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ। এসব কারণে প্রশ্ন জাগে, ইরান যুদ্ধের ফলাফলটা কেমন হচ্ছে? যুদ্ধ তো কোনো ভালো বিষয় নয়; তাই ফলাফল ভালো হবে কেমন করে? তবে এসব যুদ্ধের বিশ্লেষণ একরকম হয় না। ট্রাম্পতো প্রথমে বলেছিলেন, ইরান যুদ্ধের লক্ষ্য রিজিম চেঞ্জ। অনেক নেতাকে হত্যা করলেও রিজিম তো চেঞ্জ হলো না। এখন আবার ট্রাম্পের বোলচাল লক্ষ্য করলে মনে হয়, ইরানের জ¦ালানি সম্পদ দখলই তার লক্ষ্য। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায়, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোর কথা। তাকে তো মাস্তানি কায়দায় দেশ থেকেই তুলে নেওয়া হলো, এরপর নজর দেওয়া হলো দেশটির জ¦ালানি সম্পদের ওপর। এগুলো মোটেও ভালো উদাহরণ নয়। এসবের মাধ্যমে ট্রাম্প বিশ্ববাসীর নিন্দাই কুড়িয়েছেন। খোদ আমেরিকাতেও লাখ লাখ মানুষ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল বের করেছে। বলেছে, ‘নো-কিং’Ñআমরা এমন রাজা চাই না। যুদ্ধ শুরু করলেও যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ নেই এখন ট্রাম্পের হাতে। যুক্তরাষ্ট্রেও জ¦ালানির দাম বেড়েছে, বেড়েছে খাদ্যদ্রব্যের দাম। এর দায় তো ট্রাম্পের কাঁধে বর্তায়। ইরানের বড় ক্ষতি হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ক্ষতিও বাড়ছে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ট্রাম্পের। ক্ষতির এই নায়ক এখন সর্বত্র দানব হিসেবে বিবেচিত এবং অভিশপ্তও বটে।