পশু কেনা হলো, ঈদের জামাত হলো, কুরবানি হলো, গোস্ত বিতরণ হলো, খাওয়া-দাওয়া হলো, আনন্দ-উৎসব হলো। আর একটি বিষয় হলোÑএসব করতে করতে ঈদের ছুটিটাও ফুরিয়ে গেল। আবার শুরু হলো প্রাত্যহিক জীবন, অর্থাৎ রুটিনের জীবন। এই জীবনে প্রবেশ করে কি আমরা ভুলে যাব কুরবানি ঈদের ত্যাগ ও মাহাত্ম্যের কথা? ইতিহাসের কথা? তাইতো বিষয়গুলোর পুনঃপাঠ প্রয়োজন, পুনঃস্মরণ প্রয়োজন।
মুসলিম উম্মাহর মধ্যে কুরবানি ঈদের যে প্রচলন তার সাথে জড়িয়ে আছে গুরুত্বপূর্ণ এক ইতিহাস। সূরা সাফফাত-এর ১০২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “সেই ছেলে যখন পিতার সাথে দৌড়ঝাঁপ করার বয়স পর্যন্ত পৌঁছালো, তখন (একদিন) ইবরাহিম তার পুত্রকে বললেন, হে প্রিয় বৎস! আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, আমি তোমাকে জবাই করছি। এখন তুমি বল, তোমার কী অভিমত? ছেলে বলল, বাবা! আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনাকে যে হুকুম দেওয়া হয়েছে, আপনি তা-ই করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।” এরপর হযরত ইবরাহিম (আ:) পুত্র ইসমাইল (আ:)-এর গলায় ছুরি চালিয়ে দিলেন। পিতা-পুত্রের এমন অভূতপূর্ব আনুগত্য দেখে মহান আল্লাহ ইসমাইল (আ:)-এর বদলে একটি দুম্বা জবাইয়ের ব্যবস্থা করে দিলেন। বেঁচে গেলেন হযরত ইসমাইল (আ:)। এভাবেই ঈমানের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন পিতা-পুত্র দু’জনেই। এ ঘটনা মানবজাতির জন্য অবিস্মরণীয় এক ইতিহাস হয়ে রইলো।
ইতিহাসের এই ঘটনা কম-বেশী আমরা জানি। তাহলে আবার পুনঃপাঠ কেন? পুনঃপাঠের প্রয়োজন রয়েছে। স্বার্থান্ধ বর্তমান সমাজ এবং মানুষের আচরণ পুনঃপাঠের যৌক্তিকতাকে প্রতিষ্ঠিত করে। আমরা জোনি কুরবানি ঈদের মূলবার্তা হলো, মহান আল্লাহর আনুগত্য ও সন্তুষ্টির জন্য প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকতে হবে বান্দাকে। আর কুরবানির ঈদ যে শুধু পশুর গোস্ত ও রক্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তা উপলব্ধি করা যায় সূরা হাজ্জ-এর ৩৭ নম্বর আয়াতে। উক্ত আয়াতে বলা হয়েছে, “পশুর গোস্ত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।” কুরবানি ঈদ প্রসঙ্গে আমরা পবিত্র রুরআন থেকে যে বার্তা পেলাম তা ভেবে দেখার মতো। কুরবানির ঈদ এমন একটি ঈদ, যা ‘পশু কুরবানি’ প্রতীকের মাধ্যমে জীবন সংগ্রামে মহান আল্লাহর আদশে-নিষেধ মানতে গিয়ে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের শিক্ষা দেয়। এছাড়া কুরবানি ঈদের জবাইকৃত পশুর গোস্ত আমরা আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষদের মধ্যে যেভাবে বন্টন করে থাকি, তা সম্পদ ও আনন্দকে সমাজে ভাগ করে দেওয়ার চেতনাকে পুনঃজাগ্রত করে। তাই বলেতে হয়, ঈদুল আযহার ইবাদত, আনন্দ-বিনোদনের সাথে মানুষ হিসেবে মানুষের প্রতি সামাজিক ও মানবিক দায়িত্ব পালনেও আমাদের উদ্বুদ্ধ করে থাকে। আনন্দ-উৎসবের এমন ব্যতিক্রমী ও বহুমাত্রিক উদাহরণ পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি লক্ষ্য করা যাবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো ঈদ-পরবর্তী সময়ে এই চেতনাকে আমরা কতটা ধারণ করতে সমর্থ হচ্ছি? ঈদের চেতনা সারাবছর অব্যাহত থাকুক, এটাই আমাদের কামনা।