আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোট হবে একই দিনে ১২ ফেব্রুয়ারি। চারটি বিষয়ের ওপর একটি প্রশ্নে হবে গণভোট। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে আগামী সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে (পিআর পদ্ধতি) ১০০ সদস্য নিয়ে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ অনুমোদন করা হয়। পরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এ আদেশ জারি করেন। এর মধ্য দিয়ে জুলাই সনদ আইনি ভিত্তি পেল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের প্রস্তাব তৈরির লক্ষ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রায় ৯ মাস ধরে যে কাজ করেছে, নভেম্বর জাতির উদ্দেশে ভাষণে গণভোটের ঘোষণা দেয়ার সময় সে কথা তুলে ধরেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ঐকমত্য কমিশন প্রণীত জুলাই সনদে সংবিধানবিষয়ক ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। এটি একটি ঐতিহাসিক অর্জন।

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দীর্ঘ আলোচনায় ৬টি সংস্কার কমিশনের ৮৪টি প্রস্তাব নিয়ে তৈরি হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ। এর মধ্যে ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান-সংক্রান্ত। এর মধ্যে বেশ কিছু প্রস্তাবে বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের ভিন্নমত আছে।

স্বৈরাচারী আমলে তিনটি নির্বাচনে জনগণ কার্যত ভোট দিতে পারেনি। ফলে জাতীয় নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর জনআকাক্সক্ষা অনুযায়ী গণভোটেরও গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু সংসদ নির্বাচনের কার্যক্রমের প্রচারের জোয়ারে গণভোটের বিষয়টি যেন গুরুত্বহীন হতে চলেছে। কয়েকটি দল ও জোট এ ব্যাপারে হ্যাঁ ভোটের প্রচারণা চালালেও অনেক দল এ ব্যাপারে তেমন সরব নয়। ফ্যাসিবাদের দিনগুলোতে ফেরত যেতে না চাইলে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে দাঁড়ানো কর্তব্য বলে সবাই মনে করেন।

আশার কথা, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনূস তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আমরা তাকে এ জন্য ধন্যবাদ জানাই। পত্রিকান্তরে “গণভোটে ‘হ্যাঁ’ সিল দেওয়ার আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার’ শিরোনামে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ সিল দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। সোমবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভিডিও-বার্তায় এ আহ্বান জানান তিনি। সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) এ বার্তা সম্প্রচার করে। বার্তায় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, নতুন বাংলাদেশ গড়ার চাবি এখন আপনার হাতে। ‘হ্যাঁ’-তে সিল দিলে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে যাবে। ‘হ্যাঁ’-তে আপনি নিজে সিল দিন। আপনার পরিচিত সবাইকে সিল দিতে উদ্বুদ্ধ করুন এবং তাদের ভোট কেন্দ্রে নিয়ে আসুন। দেশ পাল্টে দিন। ইনশাআল্লাহ আমরা সবাই মিলে দেশ গড়ার এই সুযোগ নেবো।

ভিডিও বার্তায় তিনি আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান জাতির ইতিহাসে এক অসাধারণ অর্জন। এটি অপ্রত্যাশিতভাবে জাতির জীবনে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ এনে দিয়েছে। এই লক্ষ্যে আমরা এর মধ্যে বেশ কিছু সংস্কার করেছি। আরও গভীর ও সুদূরপ্রসারী সংস্কারের জন্য দেশের সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই সনদ প্রণয়ন করেছে। এ জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য আপনাদের সম্মতি প্রয়োজন।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে জানিয়ে তিনি বলেন, “গণভোটে আপনি ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে বৈষম্য, শোষণ আর নিপীড়ন থেকে মুক্ত হবে বাংলাদেশ। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট মানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন গঠনে সরকার ও বিরোধী দল একসঙ্গে কাজ করবে। সরকার ইচ্ছামত সংবিধান পরিবর্তন করতে পারবে না। গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের জন্য জনগণের সম্মতি নিতে হবে। এতে আরও বলা আছে, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদের গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সভাপতিরা নির্বাচিত হবেন। একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করবে। সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়বে। ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় পার্লামেন্টে একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। আপনার মৌলিক অধিকার আরও সুরক্ষিত হবে।

আমরা মনে করি সংসদ নির্বাচনের প্রচারণার পাশাপাশি সকল রাজনৈতিক দলের গণভোটে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচারণা জোরদার করা উচি। কারণ কোন দলই আর ৫ আগস্ট পূর্ববর্তী অবস্থায় ফেরত যেতে রাজি নয়। বিভিন্ন দলের প্রধানগণ ইতিমধ্যেই সেই ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা মনে করি হ্যাঁ অর্থাৎ রাজনৈতিক সংস্কারকে জয়যুক্ত করার আর কোন বিকল্প নেই।