পরাশক্তির প্রতি মানুষের ঘৃণার মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। পরাশক্তি বড়, শক্তিশালী, এ জন্য ঘৃণা নয়। ঘৃণার কারণ তারা যুদ্ধবাজ, মানুষকে শান্তিতে থাকতে দিতে চায় না। তারা যখন যুদ্ধ লাগায়, তখন শুধু মানুষ নিহত হয় না, দেখা দেয় আরো বহু সংকট। যেমনটা এবার দেখা দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। আমেরিকা ও ইসরাইলের যৌথ হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন স্থাপনায় আক্রমণ চালাচ্ছে এখন ইরান। যুদ্ধের তীব্রতা যত বাড়ছে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসসমৃদ্ধ দেশগুলোয় ততই বাড়ছে পানি নিয়ে শঙ্কা। শুধু তেল শোধনাগার নয়, পানি পরিশোধন কেন্দ্রও এখন হামলার শিকার হচ্ছে। চলতি মাসের শুরুতেই ইরানের ড্রোন হামলায় বাহরাইনের লবণাক্ত পানি পরিশোধন কেন্দ্র ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চলে ‘পানি নিরাপত্তা’ প্রসঙ্গটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে। এসব দেশে গ্যাস ও তেল হয়তো অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু, কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো পানি।

উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যের বেশির ভাগ দেশই দৈনন্দিন কাজের জন্য লবণাক্ত পানি পরিশোধন প্রক্রিয়ার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এ নির্ভরতা একটি বড় বাস্তবতা। এ বাস্তবতায় আঘাত লেগেছে। শুধু জীবন নয়, এর প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতেও। মুডিসের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লবণাক্ত পানি পরিশোধন প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরতাকে এখন ভিন্নভাবে দেখা উচিত। প্রতিবেদনে একে ‘একটি গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে? উপসাগরীয় অঞ্চলে লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণের একমাত্র মাধ্যম পরিশোধন। এর কোনো বিকল্প নেই। এটিই খাবার পানির প্রধান উৎস। মুডিস তার প্রতিবেদনে বলেছে, জিসিসিভুক্ত দেশগুলো তাদের বেশিরভাগ খাবার পানির জন্য লবণাক্ত পানি পরিশোধন প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের পরিশোধিত পানির একটি বড় অংশই আসে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। আর তাদের শত শত প্লান্টের অবস্থানও উপকূল বরাবর। তাই বড় পরিসরে তাৎক্ষণিক বিকল্প খুবই সীমিত তাদের জন্য। বেশ কয়েকটি দেশ লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণের পরই সেখানকার বাসিন্দারা তা দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করতে পারেন। কুয়েত তার প্রায় ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধ পানির জন্য এ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে সৌদী আরব এবং ওমানও একই প্রক্রিয়ার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর পানি পরিশোধন অবকাঠামোর ওপর হামলার হুমকি দিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এ অঞ্চলের সরকার প্রধানরাও সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হলে পানি এবং জ¦ালানি অবকাঠামোর ওপর প্রতিশোধমূলক হামলা হতে পারে। অনেক দেশে মাত্র এক সপ্তাহের বিশুদ্ধ পানি মজুদ আছে। তাই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে দৈনন্দিন কাজ, হাসপাতাল এবং শিল্প খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ঝুঁকি শুধু পানি সরবরাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এ ব্যবস্থাগুলো একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। লবণাক্ত পানি পরিশোধন প্রক্রিয়া চালাতে বিদ্যুতের প্রয়োজন, অন্যদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কারখানাগুলো চালু রাখতে পানির প্রয়োজন। সবমিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো পড়েছে এবং জটিল সংকটে। দৃশ্যত মনে হতে পারে, ইরান যুদ্ধে এ দেশগুলোর তেলশোধনাগার এবং পানিপরিশোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, আসলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনীতি, জীবনযাপন এবং নিরাপত্তা। সেখানকার ভূরাজনীতি এখন আরো বেশি সংকটে পড়লো। ইরানের সাথে সৌদী আরবসহ অন্য দেশগুলোর সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার দিকে এগুচ্ছিলো, অনেকেই আমেরিকার ওপর নির্ভরতা কমাতে চাচ্ছিলো। কিন্তু ইরান যুদ্ধ যেন সবকিছু আবার তছনছ করে দিল। আরব ও ইরান দ্বন্দ্বের মাত্রা আবার উস্কে দিল এ যুদ্ধ। যুদ্ধের আগুনতো লাগালো মার্কিন-ইসরাইল জোট। এ যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পুরো বিশ্ব। তাইতো পরাশক্তির প্রতি ঘৃণার মাত্রা বাড়ছে পুরো বিশ্বে।