বাড়াবাড়ি জিনিসটা কোনো ক্ষেত্রেই ভালো নয়, ভালোর ক্ষেত্রেও ভালো নয়। তবে মন্দ ক্ষেত্রেই বাড়াবাড়ির দৃশটা প্রকট বর্তমান সভ্যতায় এবং বিশ্বব্যবস্থায়। তেমন এক বাড়াবাড়ির মঞ্চে সম্প্রতি অভিনয় করলেন আমাদের প্রতিবেশী দেশের এক প্রধানমন্ত্রীপ্রবর। ২৫ ফেব্রুয়ারি বুধবার ইসরাইলের আইনসভা নেসেটে এক ভাষণ দিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভাষণে ইসরাইলকে সর্বাবস্থায় সমর্থনের ঘোষণা দেন তিনি। দুই দিনের সফরে ইসরাইল গেছেন মোদি। তেল আবিবের কাছে বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। নেসেটে প্রবেশের সময় ইসরাইলি আইন প্রণেতারা মোদিকে উচ্চকণ্ঠে স্বাগত জানান। মোদির ভাষণের সময় নেসেট সদস্যরা বেশ মনোযোগ দিয়ে তার বক্তব্য শোনেন।
এত উষ্ণতা, এত উচ্চকণ্ঠ এবং এত স্বাগত কেন? কি-ই বা বলা হলো, আর কি-ই বা শোনা হলো? ভাষণে মোদি বললেন, পশ্চিমাদের বাইরে ইসরাইলের নির্ভর করার মতো নতুন মিত্র তৈরির সুযোগ রয়েছে এবং ভারত সে ক্ষেত্রে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি ১৪০ কোটি ভারতীয়ের শুভেচ্ছা ও বন্ধুত্ব, সম্মান ও অংশীদারিত্বের বার্তা নিয়ে এসেছি। ভারতে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলে হামাসসহ ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠনগুলোর অভিযানের নিন্দা করেন মোদি। তিনি বলেন, ‘আমি ভারতের জনগণের পক্ষ থেকে ৭ অক্টোবর হামাসের বর্বর সন্ত্রাসী হামলায় নিহত প্রতিটি জীবন ও বিপর্যস্ত প্রতিটি পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। আমরা আপনাদের ব্যথা অনুভব করছি, বেদনাকে ধারণ করছি। ভারত ইসরাইলের পাশে এ মুহূর্তে জোরালো সমর্থন নিয়ে দাঁড়িয়েছে এবং সবসময়ই’। নাটকের পান্ডুলিপি হিসেবে এমন বক্তব্য মন্দ নয়, কিন্তু একটি দেশের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য এমন একপেশে কেমন করে হয়। মোদি তার ভারণে গাজায় নিষ্ঠুর আগ্রাসন এবং নারী ও শিশুর দুর্দশার বিষয় সম্পূর্ণ এড়িয়ে যান। উল্লেখ্য, দীর্ঘ দুই বছরের ইসরাইলি আগ্রাসনে গাজায় ৭২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়। আরো বড় প্রশ্ন হলো, যুদ্ধাপরাধী একটি রাষ্ট্রের প্রতি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর এমন নির্লজ্জ ও অন্ধ সমর্থন কতটা যৌক্তিক ও মানবিক? এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, মোদির আগে ভারতের আর কোনো প্রধানমন্ত্রী ইসরাইল সফর করেননি এবং এমন অনৈতিক সমর্থনও জানাননি। এসব কারণে মোদির ভারত আজ যতটা না গণতান্ত্রিক, তার চাইতে বেশি উগ্র সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। এটা ভারতের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর জন্য এক বড় ব্যর্থতা।
‘বেলফোর ঘোষণাপত্র’ সম্পর্কে কি মোদি সরকার অবগত নয়? ১৯১৭ সালের ২ নবেম্বর জারি করা বেলফোর ঘোষণাপত্রটি ছিল বেশ সংক্ষিপ্ত ও ধ্বংসাত্মক। মাত্র ৬৭ শব্দের একটি ঘোষণাপত্রের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে যে সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল, তার সুরাহা আজও হয়নি। বরং বেলফোর ঘোষণাপত্রের কারণে ভূমিপুত্র ফিলিস্তিনিরা আজ এক উদ্বাস্তু জাতিতে পরিণত হয়েছে। আর উড়ে এসে ইহুদীরা জুড়ে বসলো ফিলিস্তিনে। বেলফোর ঘোষণা ছিল ফিলিস্তিনে ‘ইহুদিদের জন্য একটি জাতীয় আবাস’ প্রতিষ্ঠায় ১৯১৭ সালের যুক্তরাজ্যের করা একটি প্রতিশ্রুতি। তৎকালীন বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোর এক চিঠিতে বৃটিশ-ইহুদি নেতা লিওনেল ওয়াল্টার রথসচাইল্ডকে ওই প্রতিশ্রুতি দেন। ফিলিস্তিন সে সময় অটোমান তথা উসমানীয় সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। ইহুদিরা তখন সেখানে মোট জনসংখ্যার মাত্র ৯ শতাংশ ছিল। এ প্রসঙ্গে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও ইতিহাসবিদ অ্যাভি শ্লায়াম বলেন, বেলফোর ঘোষণায় বৃটিশ সরকারের জন্য গৌরবের কিছু নেই। এই ঘোষণা ছিল লজ্জাকর ও দুঃখজনক পদক্ষেপ। বৃটিশ সরকারের তাই লজ্জায় মাথা নত করা উচিত। নির্মম পরিহাস হলো, লজ্জার ফসল ইসরাইলে গিয়ে মোদি আজ শুধু ড্রামা নয়, মেলোড্রমা করছেন। বাহরে মোদি!