“ভারতে ‘ভালো মুসলিম’ হওয়ার বোঝা” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন মুদ্রিত হয়েছে পত্রিকান্তরে। ২৪ জানুয়ারি মুদ্রিত প্রতিবেদনটি আসলে ‘স্ক্রল ডট ইন’-এর একটি বিশ্লেষণ। বিশ্লেষণে বলা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে মুসলিম নাগরিকদের হেনস্তা ও নির্যাতনের মাত্রা। সেখানকার মুসলমানদের প্রায়ই বলা হয়, ভারতে থাকতে হলে তাদের ‘ব্যতিক্রম’ হতে হবে। সে ব্যতিক্রম অর্জন বা অবদানের ক্ষেত্রে নয়; বরং রাজনৈতিক নীরবতার ক্ষেত্রে। নীরবতার মাধ্যমে তাদের বারবার প্রমাণ করতে হবে, তারা বিশ্বের অন্য মুসলিমদের চেয়ে আলাদা। দেশের কাছে তাদের দাবি-দাওয়া কম হবে, তারা সর্বক্ষেত্রে কম দৃশ্যমান হবে, রাষ্ট্রে তাদের অধিকারও থাকবে কম। উল্লেখ্য, ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ভারতীয় মুসলমানরা গণতান্ত্রিক জীবন, নির্বাচনি রাজনীতি এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় উৎসাহের সাথে অংশগ্রহণ করেছে। কিন্তু বর্তমানে একটি সূক্ষ্ম ও ক্ষয়িষ্ণু প্রক্রিয়া সামনে চলে এসেছে। ভারতীয় মুসলমানদের জন্য বৈধভাবে রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের সুযোগ ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে আসছে। মুসলমানদের নিরাপদ জীবন-যাপনের জন্য শুধু আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা নয়, বরং রাজনৈতিকভাবেও তাদের নীরব থাকতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে ধারণা তৈরি হচ্ছে, রাজনৈতিকভাবে মুসলমানদের কণ্ঠস্বর কখনোই বলিষ্ঠ হতে পারবে না।
রাজনৈতিক তাত্ত্বিক মাহমুদ সামদানি তার ‘গুড মুসলিম, ব্যাড মুসলিম’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, আধুনিক ক্ষমতা প্রায়ই মুসলমানদের বিভক্ত করে দেয়। এদের মধ্যে অরাজনৈতিক ব্যক্তিরা গ্রহণযোগ্য এবং নিজস্ব দাবি-দাওয়ার ভিত্তিতে আওয়াজ তোলা ব্যক্তিরা সন্দেহভাজন। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হিলাল আহমেদ দেখিয়েছেন, ভারতে মুসলমানদের স্বাভাবিক নাগরিক হিসেবে না দেখে দেশের জন্য সমস্যা বা বোঝা হিসেবে দেখা হচ্ছে। রজানীতিতে তাদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আসার বদলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা হয়। মুসলমানদের রাজনীতিকে স্বার্থের ভিত্তিতে অংশগ্রহণের পরিবর্তে ব্যাখ্যাতীত অসংগতি হিসেবে বেশি বিবেচনা করা হয়। এ ধরনের ফ্রেমিংয়ের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। মুসলমানরো যখন কোন দাবিতে সংঘবদ্ধ হন, তা সংবিধানের আলোকে কমই বিবেচনা করা হয়। এর বদলে তাদের উদ্দেশ্য ও আনুগত্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলা হয়। স্বাভাবিক আন্দোলন, বিক্ষোভ ও সমাবেশকে মুসলমানদের ক্ষেত্রে ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করা হয়।
ভারতে মুসলমানদের ক্ষেত্রে ‘ব্যতিক্রমবাদ’ বিষয়টি এখন গুরুতর প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। বৈষম্যমূলক এই দৃষ্টিভঙ্গি মুসলমানদের সাংবিধানিক ও সাধারণ নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। ভয়ানক ব্যাপার হলো, গণমাধ্যমের মধ্য দিয়ে এই অস্বাভাবিক বিষয়টিকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। মুসলমানরা যখন কোথাও ভুক্তভোগী হন, তখন তাদের ‘সংখ্যালঘু’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়না। তারা যখন সংঘবদ্ধ হন, তখন তাদের ‘সাম্প্রদায়িক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যখন তারা বিক্ষোভ করেন, তখন তাদের ‘ক্রুদ্ধ’, ‘মৌলবাদী’ বা ‘উসকানিদাতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয় গণমাধ্যমে। আর যখন তারা চুপ থাকেন, তখন তাদের ‘সহনশীল’, ‘বিচক্ষণ’ বা ‘ঐক্যপন্থী’ হিসেবে প্রশংসা করা হয়। এমন বাস্তবতায় ভারতের মুসলমানরা ‘ভালো মুসলিম’ হওয়ার এক বৈষম্যমূলক চ্যালেঞ্জের মধ্যে জীবন-যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। ভারতের সংবিধানের ‘বৈচিত্র্যের ঐক্য’ নামে যে বার্তা রয়েছে তা নরেন্দ্র মোদির শাসনে পালিত হচ্ছে না। বরং মুসলমানদের এখন ‘ব্যতিক্রম’ হতে বলা হচ্ছে-যেখানে তারা সাংবিধানিক ও সাধারণ নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন। কোনো সভ্য ও গণতান্ত্রিক দেশে এমন আচরণ কি চলতে পারে? ভারত এখন কেমন দেশ, তাদের রাষ্ট্রীয় নীতি বা কেমন-সে বিষয়টি মোদি সরকার স্পষ্ট করতে পারেন। তাহলে অন্যদের সুবিধা হয়, ভারত সম্পর্কে নীতি ও কৌশল অবলম্বনে।